বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

অচেনা ঠিকানায় শেষ বিকেলের চিঠি




গল্পধারা বুধবার 🔰

বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত - 
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন 

সম্পাদক - আকাশ আহমেদ

প্রকাশঃ ১৩ই মে ২০২৬ (বুধবার)

প্রচ্ছদ ডিজাইনঃ সর্বানী দাশ



------------------------------------------------------------------------------------



 
ধারাবাহিক গল্প: 

অচেনা ঠিকানায় শেষ বিকেলের চিঠি

লেখিকা: সাদিয়া চৌধুরী রুনা 

পর্ব – ১


​ঢাকার ব্যস্ত শহরের এক কোণে ছোট একটা ঘর। শমসের সাহেব একাই থাকেন। দীর্ঘ পঁচিশ বছর ডাকবিভাগে চাকরি করার পর এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। সারাজীবন মানুষের হাজারো সুখ-দুঃখের চিঠি বিলি করেছেন, কিন্তু তার নিজের ঠিকানায় কখনও কোনো চিঠি আসেনি। 

আজ বিকেলের আকাশটা একটু বেশিই মেঘলা। শমসের সাহেব বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন, হঠাৎ নিচতলার দারোয়ান এসে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে গেল।

​হলদেটে হয়ে যাওয়া খাম - 
ওপরের নামটা আবছা হয়ে গেছে - 
কিন্তু ঠিকানাটা স্পষ্ট - 
শমসের সাহেবেরই ঘর। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রেরকের জায়গায় কোনো নাম নেই, শুধু লেখা আছে - 'সেই বিকেলের সাক্ষী।'

​কাঁপা হাতে খামটা খুললেন তিনি। ভেতরে কোনো কাগজ নেই, আছে শুধু একটা পুরনো মরচে ধরা চাবি আর একটা বকুল ফুলের শুকনো মালা। মালাটা হাতে নিতেই যেন পঁচিশ বছর আগের এক তীব্র ঘ্রাণ তার নাকে আছড়ে পড়ল। 

শমসের সাহেবের হাত কাঁপতে শুরু করল। 
তিনি বিড়বিড় করে বললেন -
"তবে কি ও ফিরে এসেছে? নাকি এটা কোনো দুঃস্বপ্ন?"

​ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ল কেউ। এই অসময়ে তো কেউ আসার কথা নয়। বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে দরজা খুলতেই শমসের সাহেব দেখলেন, সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। পরনে নীল শাড়ি, ঠিক যেমনটা পঁচিশ বছর আগে সেই মেয়েটি পরত।

​মেয়েটি শান্ত স্বরে বলল -
"চাবিটা কি পেয়েছেন? ওটা দিয়েই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় লুকানো দরজাটা খুলতে হবে।"

​শমসের সাহেব কথা হারিয়ে ফেললেন। 
কে এই মেয়ে? 
আর কোন দরজার কথা বলছে সে? 

যার কথা তিনি পৃথিবীর কাউকে জানাননি, এমনকি নিজের ছায়াকেও না!



চলবে.....


-----------------------------------------------------------------------------

লেখিকা: সাদিয়া চৌধুরী রুনা 

সাদিয়া চৌধুরী রুনা (পিতা: আবদুস সোবহান) একজন স্বপ্নবাজ লেখিকা। পড়াশোনা করেছেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে। ফেসবুকের পরিচিত মুখ সাদিয়া নিয়মিত লেখালেখি করছেন এবং তাঁর কবিতা ইতিপূর্বেই বেশ কিছু যৌথ কাব্যগ্রন্থে স্থান করে নিয়েছে।

আমি একটা গল্প... কলমে -সন্দীপ সাঁতরা




চা খাবে? আজ একটু আগেই বসেছি
অবাক! কাজ ফেলে বসা তোমার স্বভাবে নেই তো।
আজ মে দিবস, তাই নিজেকেই একটু সময় দিলাম।
নিজের সাথে কথা বলছো?
হ্যাঁ, সারাদিন তো অন্যের স্বপ্ন গড়ি।
নিজের স্বপ্ন কেমন?
ধুলোমাখা, তবু ভাঙেনি এখনো।
ক্লান্তি লাগে না?
লাগে, কিন্তু থামলে যেন হার মেনে নেওয়া হয়।
কেউ কি শোনে তোমার কথা?
আজ তুমি শুনছো, এটুকুই বড় কথা।
 তাহলে আজকের দিনটা কেমন লাগছে?
 মনে হচ্ছে, আমি শুধু শ্রমিক নই....
আমি একটা গল্প।


লেখক -সন্দীপ সাঁতরা


রবিঠাকুর... - রেজাউল করীম

 



তুমি কি সত্যিই মানুষ ছিলে, রবিঠাকুর?
নাকি জোড়াসাঁকোর উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা
একটা বিশাল বটগাছ—
যার শিকড়ে ঝুলে থাকত
বাংলা ভাষার সমস্ত দুপুর।

আমি যখন খুব ক্লান্ত হই,
দেখি—
মানুষেরা ছেঁড়া পোস্টারের মতো
নিজেদের মুখ বদলায়।

শুধু তুমি
পুরোনো রেডিওর ভিতর থেকে
বৃষ্টির শব্দ হয়ে ভেসে আসো।

তোমার দাঁড়িতে নিশ্চয়ই লুকিয়ে ছিল
শীতের সকালের কুয়াশা,
নইলে এত শান্তি কোথা থেকে এলো?

এখন চারদিকে শুধু
অ্যালুমিনিয়ামের শব্দ,
কাঁচের ভিতরে আটকে থাকা নিঃসঙ্গতা,
আর বিজ্ঞাপনের নীল দাঁত।
তুমি যখন লিখেছিলে—
মানুষের ভিতরেই ঈশ্বরের বাস,
হয়তো কোনো ভাঙা নৌকার মাঝি
দূরে বসে কাঁদছিল।

তুমি সেই কান্নাকে
শঙ্খের ভিতর পুরে
গান বানিয়ে দিলে।
আমরা এখন গান ভুলে গেছি, রবিঠাকুর।

এখনকার প্রেম
মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে থাকা
অর্ধেক চাঁদ।

এখনকার মানুষ
নিজের ছায়াকেও সন্দেহ করে।
তবু মাঝরাতে
কারা যেন তোমার কবিতার জানালায় এসে
ধূপকাঠির মতো জ্বলে ওঠে।

আজও গ্রামের বুড়ি ঠাকুমারা
ধান শুকোতে শুকোতে
অজান্তেই তোমার সুর গেয়ে ওঠেন।
তোমার নাম যেন
একটা গোপন নদী—
যার জল কেউ চোখে দেখে না,
তবু তৃষ্ণা পেলে
সবাই সেখানে যায়।

তোমাকে আমি কখনো শুধু কবি ভাবিনি।
তুমি বরং একটা বিশাল রেলস্টেশন,
যেখানে দুঃখ এসে বসে থাকে
শেষ ট্রেন মিস করা যাত্রীর মতো।

আর আনন্দ—
তোমার পকেটে রাখা
একটা লাল কাঁচের মার্বেল।
এখন সভ্যতা
নিজের শরীর নিজেই খেয়ে ফেলছে।
বাচ্চাদের চোখে আর জোনাকি নেই,
আছে অনলাইন ক্লাসের ক্লান্ত আলো।

মাঠগুলো ধীরে ধীরে
সিমেন্টের জ্বর হয়ে যাচ্ছে।
তখন তোমার কথা খুব মনে পড়ে।

মনে হয়—
কেউ যদি আবার শালবনের ভিতর দাঁড়িয়ে বলত,
“মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।”
কেউ যদি আবার
পৃথিবীর কপালে হাত রেখে
জ্বর মাপত ভালোবাসার।

রবিঠাকুর,
তুমি কি এখনও
শান্তিনিকেতনের কোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে
চুপচাপ বসে আছো?

তোমার চারপাশে উড়ছে হলুদ পাতা,
আর দূরে কোনো বালক
খাতার শেষ পাতায় লিখছে—
“বাংলা ভাষা মানে
একটা জানালা,
যেখানে দাঁড়ালে আজও
রবীন্দ্রনাথের বাতাস এসে লাগে।”



লেখক - রেজাউল করীম 


মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

মা — একটা না-বলা বিদায় ।। কলমে - সেখ মঈনুল হক

 
লেখক - সেখ মঈনুল হক 



মা —
তোমাকে ডাকার মতো সহজ শব্দ পৃথিবীতে আর নেই,
তবুও সবচেয়ে কঠিন এই একটাই ডাক —
যখন তুমি সামনে থাকো না …

আমি এখনো মাঝে মাঝে চুপ করে বসে থাকি,
ভাবি —
হঠাৎ যদি তুমি এসে বলো,
“কি রে, এত চুপচাপ কেন ?”
আমি হয়তো হেসে বলবো —
“কিছু না …”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়বো
তোমার সেই একটুখানি স্নেহের ছোঁয়ায়।

মা —
তোমার আলমারিটা এখনো ঠিক আগের মতোই আছে,
শাড়ির ভাঁজে লেগে আছে তোমার গন্ধ,
আমি মাঝে মাঝে ওগুলোতে মুখ লুকিয়ে কাঁদি —
কেউ দেখে না, কেউ জানে না,
শুধু তোমার স্মৃতিটা নীরবে আমার পাশে বসে থাকে।

তুমি জানো মা,
এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করে না —
“খেয়েছিস ?”
এই ছোট্ট প্রশ্নটার অভাব
একটা বিশাল শূন্যতার মতো
আমার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।

আমি অসুস্থ হলে
এখন আর কেউ কপালে হাত রাখে না,
কেউ বলে না — “চিন্তা করিস না, আমি আছি।”
তখন বুঝি —
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা
আসলে ছিল তোমার কোলে।

মা —
আমি বড় হয়ে গেছি,
কিন্তু তোমাকে হারানোর মতো বড়
কখনোই হতে পারিনি।

তোমার সাথে শেষ কথা বলার দিনটা
এখনো বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে —
আমি তাড়াহুড়োয় ছিলাম,
তুমি হয়তো আরও একটু কথা বলতে চেয়েছিলে …
আমি বলেছিলাম — “পরে কথা বলবো …”
সেই “পরে” আর কোনোদিন আসেনি মা …

আজ যখন রাত গভীর হয়,
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি —
ভাবি,
তুমি কি কোনো তারা হয়ে
আমার দিকে তাকিয়ে আছো ?

মা —
যদি পারো,
একবার স্বপ্নে এসো —
একবার শুধু বলো — “আমি ভালো আছি …”
আমি আর কিছু চাইবো না …

কারণ,
তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবীটা
একটা ভিড়ভরা একাকীত্ব —
যেখানে হাজার মানুষ থাকলেও
একটা “মা”র অভাব
সবকিছুকে শূন্য করে দেয়।

শেষে শুধু একটা কথা —
আমি এখনো তোমাকে ডাকি…
নিঃশব্দে, অশ্রুতে, একাকীত্বে—
“মা …”

কিন্তু সেই ডাকের উত্তর
আর কোনোদিন ফিরে আসে না …

স্রষ্টার মুর্তি ... - উজ্জ্বল কান্তি দাশ

 
লেখক - উজ্জ্বল কান্তি দাশ


সবিনয় নিবেদন বলিনি কখনো
প্রার্থনা করিনি যার কাছে অনুমতি, 
সে'ই তো আমার গর্ভধারিণী, 
স্রষ্টার প্রকৃত মুর্তি। 
হাজারো ব্যথায় চোখ মুদে যখন
দেখি আমার মায়ের মুখ, 
বুক হতে সরে,কষ্টের পাথর
দূর হয়ে যায় সকল দুখ। 
নিজের দুঃখ আড়াল করে
হাসতে পারে ক'জন? 
সে কেবলই মা,মায়ের মতো জগৎ মাঝে
আছে বলো আর কোন্ জন?
মায়ের ত্যাগ ভালোবাসার ঋণ
শোধ কি কখনো হবে? 
মায়ের জন্য প্রাণ বাজি রাখো
চির অক্ষয় হবে তবে। 
সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে
কত মা'ই তো হারায় প্রাণ, 
কোটি জনমেও পারবে কি দিতে
সেই মায়ের প্রতিদান? 
সন্তানেরে লালন পালনে
আসে না মায়ের ক্লান্তি, 
সন্তানের সুখ দেখেই মায়ের
মনে লাগে বড় শান্তি। 
মা আছে তাই এত সুন্দর
আনন্দময় বিশ্ব, 
মা না থাকলে ধু ধু হাহাকার
সব থেকেও নিঃস্ব। 
মা'ই সবার পরম আরাধ্য
মা'ই হলো স্রষ্টা, 
মা'ই সবার প্রথম গুরু
জীবন পথের দ্রষ্টা। 
মা ডাকে যে শক্তি সুধা
ডাকো বারংবার, 
মা হারালে ঝাড়বাতিতেও
জীবন অন্ধকার। 
মা জগতের সত্যিকারের
অমূল্য এক রত্ন, 
সময় থাকতে নিজের মায়ের
করিস'রে ভাই যত্ন।

আগামী দিনের কথা ভেবে - শিশির হুদা

 


আগামী দিনের কথা ভেবে আজ 
বুনি আশার বীজ, 
অতীতের সব ধূসর স্মৃতি 
হোক না আজ মিস।

ফেলে আসা পথে পড়ে থাক 
যত ব্যর্থতা আর গ্লানি, 
আগামী আসুক নিয়ে এক 
নতুন ভোরের হাতছানি।

হয়তো সে পথে থাকবে না 
কোনো জীর্ণতার হাহাকার, 
ভেঙে যাবে সব নিস্তব্ধতা
ঘুচবে অন্ধকার।

 মানুষের সাথে মানুষের
 হবে নতুন সেতুবন্ধ, 
বাতাসে ভাসবে ভ্রাতৃত্ব
 আর ভালোবাসার গন্ধ।

শ্রমের ঘামে সিক্ত মাটি 
সোনা ফালাবে কাল, 
শক্ত হাতে ধরব
 মোরা ভবিষ্যতের হাল। 

আজকের এই লড়াই যত
কালকের জয়গান—
 আগামী দিনের তরেই 
হোক আমাদের অভিযান।

স্বপ্নগুলো ডানা মেলুক 
নীল আকাশের গায়, 
ভয়কে জয় করে যেন
 চলা যায় মহিমায়। 

আগামীকাল হাসবে আবার
 স্নিগ্ধ শুভ্র হাসি, 
সেই সুদিনের প্রতীক্ষাতে 
আমি আজো ভালোবাসি।


লেখক -শিশির হুদা 


গল্প : ভাঙ্গা সাইকেল... কলমে- সুবর্ণা দাশ

 


শোভাদেবী বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রোজ পাশের বাড়ির ভদ্রলোক দিবাকর বাবুর চালচলন খেয়াল করেন। আর ভাবেন কি অদ্ভুত জীবন মানুষের। দিবাকর বাবুর দোতলা বাড়ি, দু'খানা গাড়ি, কি নেই ? সব আছে কিন্তু নিজের নয়, আবার ধরতে গেলে নিজেরও বলা যায়। 

কেননা এই গাড়ি, বাড়ি' তো তার ছেলেদের। ছেলের মানে'তো তার নিজের তাই না? কিন্তু এতে সাচ্ছন্দ বোধ করতে পারেন না দিবাকর বাবু, কেমন জানি একটা হীনমন্যতা কাজ করে। এই বাড়ি গাড়ি তার নিজের বলতে কোথায় যেন বাধে তার হৃদয়ে। কারণ এতো তার নিজের রোজগারের নয়, ছেলেদের। 

দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেন দিবাকর বাবু। 

এসব দেখে শোভাদেবীর মনে পড়ে অনেক বছর আগের সেই দিবাকর বাবুকে। যাকে তার কোন এক দাদা তাঁর ব্যবহৃত একটা সাইকেল দিয়ে বলেছিলেন -

"ধর দিবাকর এই সাইকেলটা আজ থেকে তোর। তুই এটা নিয়ে যা খুশি করতে পারিস। তোর প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারিস। এটার মালিক এখন তুই।"

খুশি মনে দিবাকর বাবু সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরেন। 
বউকে এসে বলে দেখ রমেন'দা এই ভাঙ্গাচোরা সাইকেল খানা আমাকে দিল। 
রমেন'দার এত টাকা, প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও আমাকে একটা পুরনো সাইকেল দিল! 

বউ দিবাকর বাবুকে বলে  -

"তুমি কেন এত রাগ করছ? হোকনা পুরনো, তবুও তো রমেন'দা দিলেন! তোমার মতো তুমি ব্যবহার করার জন্য। 

পরেরদিন থেকে দিবাকর বাবু সাইকেলে করে দোকানে যেতেন, হাটবাজার করতেন। দিবাকরের একটা কি যেন ব্যবসা ছিল, মানুষের বাড়ি গিয়ে জিনিস পৌঁছে দেওয়া, সব এই সাইকেলে চড়ে করতেন। কিন্তু সবাইকে বলে বেড়াতেন -

- ঐ বড়লোক দাদা তাঁর এত টাকা তবুও এই ভাঙ্গাচোরা একটা সাইকেল আমাকে দিল! 

শোভাদেবী সে দিনও মনে মনে হেসে ছিলেন, আজও তিনি হাসছেন দিবাকর বাবুর এই অজ্ঞতা, এই অদ্ভুত কান্ড দেখে! 

সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল দিবাকর বাবুর, একটু লং ড্রাইভে যাবে, কিন্তু সংকোচের কারণে কিছুতেই ছেলেদের বলতে পারলেন না ,মনের এই ছোট্ট আকাঙ্ক্ষার কথা। 

আজ মনে মনে রমেন'দার কথা ভাবে, পুরনো হলেও সেই সাইকেলটির সম্পূর্ণ মালিক ছিলাম আমি।নির্দ্বিধায় যেখনে খুশি, যখন খুশি সাইকেলে চড়ে বেড়িয়ে যেতে পারতাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করেন দিবাকর বাবু।

বেলকনি থেকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন শোভাদেবী। 

কি আজব মানুষের মন! 
কি বিচিত্র এই জীবন! 
সব আছে কিন্তু নিজের বলতে কিছুই নেই!


লেখিকা - সুবর্ণা দাশ


বাবার মতো আমিও আজ... কলমে: মুন্নাফ সেখ



নবম শ্রেণিতে পড়তাম যখন বাবার ছায়ায় গিয়ে,
মেদিনীপুর পাড়ি দিলাম আসবাব সাথে নিয়ে।
সেই ট্রাকেতে ঠাসা ছিল আলমারি আর খাট,
বাবার সাথেই চিনেছিলাম জীবন যুদ্ধের মাঠ।
স্কুল শিক্ষকের বাসভবনে সব সাজাতে হবে,
কাষ্ঠ-শিল্পের সুবাস মাখা দিনটি ছিল তবে।

সাথে ছিল শ্রমজীবী আর অনেক কাজের লোক,
বাবার চোখে ছিল তখন শান্ত-গম্ভীর চোখ।
সকাল বেলা বিলিয়ে দিতেন সবার হাতে টাকা,
রাখতেন না মিস্ত্রিদের কারোর জঠর ফাঁকা।
তৃপ্তি ভরে প্রাতরাশ তারা করত কেনা রোজ,
বাবা কিন্তু নিতেন না সেই আহারটুকুর খোঁজ।

উদ্যমী ঐ দলে মিশে আমিও খেতাম বেশ,
নিজের বাটি নিমিষেই আমি করতাম যে শেষ।
বাবাকে যখন ডাকত সবাই, বাবা বলতেন হেসে—
"অনেক আগেই খেয়েছি আমি উদর ভরে এসে।"
পিতার হাতে শোভা পেত স্রেফ এক পেয়ালা চা,
ওতেই নাকি জুড়িয়ে যেত সকল ক্লান্তি-তৃষ্ণা।

ক্লান্ত জনে অবাক হয়ে শুধাতো যখন কথা,
বাবা কেবল আড়াল করতেন পেটের নীরব ব্যথা।
নাস্তা কেনার অর্থ দিয়ে নিজে থাকতেন উপোস,
কারোর ওপর করতেন না বাবা কোনোই আফসোস।
অবুঝ তখন বুঝিনি তো পিতার আসল রূপ,
অভাবের সেই জ্বালা সয়ে থাকতেন তিনি নিশ্চুপ।

কালচক্রের আবর্তনে বদলে গেছে দিন,
শৈশব আজ ধূসর হলো, নেই সে সময় রঙিন।
আজকে আমি বড় হয়েছি, বাবা হয়েছি নিজে,
অভাব দেখে চোখের কোণটি মাঝেমধ্যে ভিজে।
উপার্জন করতে গিয়ে বুঝি বাবার অসীম দাম,
রক্ত পানি করে কেমন ঝরাতে হয় ঘাম।

আপন মুখে অন্ন দিতে কুণ্ঠা জাগে মনে,
সন্তানের ঐ হাসির মূল্য গুনছি প্রতিক্ষণে।
মাঝেমধ্যে কাজের চাপে উদর থাকে খালি,
গৃহে ফিরে হাসিমুখে মিথ্যে কথা বলি।
সন্তানের ঐ তৃপ্তির তরে অভুক্ত আজ থাকি,
যেমন করে দিয়েছিলেন আমার বাবাও ফাঁকি।

পিতৃত্বের অর্থ হলো নিজের সুখকে ত্যাগ,
অভাবের ঐ দিনগুলোতেও সংবরণ করা রাগ।
বাবার সেই চা-চক্রের মানে বুঝেছি আজ গিয়ে,
সন্তান যেন শান্তিতে রয় নিজের আহার দিয়ে।
পিতার সেই ‘সাদা মিথ্যে’ আজ আমারও হয় সঙ্গী,
সবার মাঝে বজায় রাখি বীরের ধৈর্য-ভঙ্গি।

জঠর-জ্বালার হাহাকার কেউ পায় না কভু টের,
বাবারাই সব সইতে পারে পাহাড়-প্রমাণ ঢের।
আমার বাবা লড়ত যেমন, লড়ছি আমি তেমন,
বাবার পরশ অলক্ষ্যেতে আগলে রাখে এমন।
কোনো তনয় বুঝতে পারে না পিতার কত কষ্ট,
বাবার ত্যাগেই জীবনটা হয় সুন্দর এবং স্পষ্ট।

নিজের কষ্ট সংগোপনে খাবার তুলে দেওয়া,
বাবার মতো হতে পারা এক মহৎ পাওয়া।
মেদিনীপুরের সেই স্মৃতি আজ আমায় মনে করায়,
বাবার অসীম ভালোবাসা কেমন করে হারায়।
শত দুঃখ সয়েও যারা দেখায় সুখের আলো,
ভুবনের সব বাবারা তাই থাকুক অনেক ভালো।

লেখক -মুন্নাফ সেখ


ধার্মিক... - সালাম মালিতা

লেখক -সালাম মালিতা 



ধর্মের মুখোশ তোমার মুখে
ধার্মিক তুমি নও,
স্বার্থ হাসিল দিনে-রাতে 
হিংসার কথা কও।

পোশাক পরে ধার্মিক সাজো
নোংরা অন্তর বাগ,
টাকার লাগি ধর্ম ব্যবসা
সমাজ ধ্বংসের নাগ।

মুখে ভক্তি হৃদয় কালো
বাসনা হয় কাম,
ভক্তের শরীর ভোগের পরে 
করে তেঁনার নাম।

তুমি আমি ভিন্ন সবাই 
মেকি ধার্মিক কয়,
নিজের ঘরে প্রদীপ জ্বেলে 
অন্যের দেখায় ভয়।

জাতের নামে বজ্জাতিটা
করে প্রতি ক্ষণ, 
জোয়ান বুড়ো সবাই শিকার 
নির্দয় এদের মন।

ভবের ঘরে চুরি করে 
শুধুই ধার্মিক সাজ,
বিবেক মারে যখন-তখন 
পায় না কভু লাজ।

পাপ পুণ্যের'ই হিসাব-নিকাশ 
ধরার মাঝে তাই,
নেবার বেলায় ভীষণ আপন
দেবার বেলায় নাই। 

জাতিগত নীলচে বিষে
ধর্মান্ধতার দোষ, 
আসুন ফেটে পড়ি সবে
দেখাই বিবেক রোষ।

ভেঙে ফেলি বিভেদ প্রাচীর
বাঁচাই মানব জাত,
দীনের বুকে জড়িয়ে নিই
জোগাই মুখে ভাত।

ধার্মিক সাজা বন্ধ করলে
মানবধর্মের জয়,
স্রষ্টার সৃষ্টি ভালোবাসলে 
সান্নিধ্য তার হয়!

প্রস্থান! - রকিবুল ইসলাম



বাদল যখন এলে অবশেষে!
প্রিয়া না আসে।
প্রেয়সী মোর গভীর অনুরাগে,
আসে অভিমান নিয়ে।
প্রস্থানে সে যায় কাঁদিয়ে,
বেদনা উপহার দিয়ে।
দু'নয়ন মোর কেঁদে চলে, 
বরষার মত অঝোরে।
বৃষ্টির ফোঁটা ঠাঁই খোঁজে,
খালে-বিলে,সাগরে।
ঠাঁই নাই মোর যে,
কোথাও আর আহারে!
তুমি তো সাগরে মিশে,
আছো বেশ ভবে।
দিবা রাতি মোর কাঁটে,
মিথ্যে স্বপ্ন দেখে।
প্রস্থান মোর ধরাধাম হতে, 
হবে বুঝি এভাবে।


লেখক -রকিবুল ইসলাম


রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

মা... - সালাম মালিতা





" মা "
শুধু একটি শব্দ নয়
বরং আত্মত্যাগের নিখাঁদ উৎস, 
যে দশমাস দশদিন কষ্ট সহ্য করে 
নিজের জীবনের বিনিময়েও-
সৃষ্টিকর্তার কাছে সন্তান চেয়ে নেয়!

" মা "
শুধু একটা সম্পর্ক নয়
বরং অপরিবর্তিত এক নাম,
যে পৃথিবীর যেকোনো মূল্যে
সন্তানের মঙ্গলের জন্য-
সকল কষ্ট হাসিমুখে মেনে নেয়!

" মা "
শুধু একটা মানুষ নয়
বরং সাহসের এক আকর,
যে বাতাসের মত পাশে থেকে 
মমতার আঁচলে বেঁধে রেখে বলে-
' ভয় পাসনে..আমি তো আছি!'

" মা "
শুধু একটা প্রাণী নয়
বরং পৃথিবীর আবাদকারী,
যে সুজলা-সুফলা ধরণীতে 
কৃষক, ডাক্তার, বিজ্ঞানী জন্ম দিয়ে 
সভ্য পৃথিবী গড়েছে! 

" মা " 
শুধু একজনের নাম নয়
বরং মানুষ গড়ার কারিগর,
যে নিজে অশিক্ষিত হয়েও
সন্তানের জীবনবোধের
সঠিক শিক্ষা দেয় প্রতি মুহূর্তে !

" মা " 
শুধু একজনকে বোঝায় না
বরং বিশ্বাসের অপর নাম,
যে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে
নিজের জীবনের বিনিময়েও-
সন্তানের সুখ চেয়ে নেয়!

" মা " 
শুধু একটা গর্ভধারিণী নয়
বরং অমৃত আশীষের ভাণ্ডার, 
যে মৃত্যুর পরও-
সবসময়ই পাশে থাকে। 

" মা " 
শুধু একটা মামুলি ইনসান নয়
বরং সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, 
যে প্রতিটা বিশ্বাসে...
প্রতিটা সুকর্মে...
প্রতিটা বিপদের সময়...
প্রতিটা সৃজনশীলতায়...
এমনকি-
প্রতিটা ভাবনায় মিশে থাকে!

" মা " 
সারাক্ষণ বলা এমন এক মধুর ডাক
যাকে সবকিছু বলার পরেও-
মনের খিদে শতভাগই থেকে যায়...!


সালাম মালিতা 


হে কবি! - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস 



শোনো কবি!
ভোরের প্রথম আলো 
 ধানের শিসের ডগায়-
শিশিরবিন্দু হয়ে যখন 
 টলমল করে ওঠে,
আমি তখন তোমার অপেক্ষায়
 বারান্দার রেলিং ঘেষে দাঁড়াই।
তুমি  না বলেছিলে—
প্রকৃতির নিজস্ব এক ভাষা থাকে,
আজ সেই ভাষায়
 আমি তোমাকে চিঠি লিখছি।

আমার এই বাগানে, 
আমার ‘নন্দন কাননে’—
আজ এক-ঝাঁক প্রজাপতি এসেছে।
ওদের রঙিন পাখার ডানায়
 আমি তোমার কবিতার ছন্দ খুঁজি কবি।
ওরা ওড়ে,
ঠিক যেমন তোমার সুর... আমার মনের আকাশে গুনগুন উড়ে বেড়ায়।
কিন্তু আমি তো স্থবির,
আমি তো মাটির মমতা মেখে পড়ে থাকা এক তরুলতা —
যে কেবল তোমার ছায়ার জন্য তৃষ্ণার্ত।

জানো কবি,
মাঝে মাঝে ভাবি, 
এই যে আমাদের বয়সের দূরত্ব,
এই যে সমাজের সহস্র চোখ—
এসব কি সত্যিই বড়?
নাকি তোমার চোখের সেই গভীর অতলতা ,
যেখানে আমি অনায়াসে... হারিয়ে যেতে পারি!
তুমি আমায় অবজ্ঞা করোনি কোনোদিন, 
আমি জানি—
তবু এই একাকিত্বের দহন-- কেন এত তীব্র?

শোনো কবি,
জ্যোৎস্নারাতে আমি আজও মালা গাঁথি।
ফুলের সুবাসে যখন চারপাশ ম ম করে,
আমি চোখ বুজে অনুভব করি তোমার অস্তিত্ব।
তুমি তো আমার ভোরের সূর্য,
আমার অন্ধকার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা।
লোকে তোমায় দার্শনিক বলে, জ্ঞানী বলে—
আর আমি জানি, 
তুমি কেবল আমার সেই  ‘ঠাকুরপো’.... রবি!

সবাই তোমার গান শোনে,
আর আমি..
তোমার সেই গানের আড়ালে দীর্ঘশ্বাসটা শুনি।
আমার গোপন ব্যথা,
 আমার গভীর আনন্দ—
সবটুকুর ভাগীদার তুমি।
তুমি ছাড়া আর কে বুঝবে এই বিরহী হৃদয়ের কম্পন?
ফিরে এসো 
ফিরে এসো কবি,
আকাশের বরুণ রঙে, স্ফটিকের স্বচ্ছতায়—
আমি তোমাকেই দেখি।
শিউলি ঝরা ভোরে যখন পায়ের পাতায় শিশির লাগে,
আমি শিউরে উঠি 
তোমার ছোঁয়ায়।
আমি তোমার কাদম্বরী,
আমি তোমার নতুন বৌঠান—
এই পরিচয়টুকুই......

আমার বিশ্বাস অটুট,
তুমি আছ,  তুমি থাকবে কবি —
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, আমার নন্দন কাননের প্রতিটি ফুলে।
ইতি,
তোমার আধুনিকা নতুন বৌঠান।
------------------------------

আমার তুমি গুরুদেব... - ঝরনা দত্ত

 



সবার রবিঠাকুর আমার তুমি গুরুদেব 
 ভুলেও ভুলিনা কখনো তোমাকে,
 যখন যেখানে যেভাবেই থাকি না কেনো 
 তোমার বাণী আমার সঙ্গে থাকে।

 তোমার রাজ্যের অধিবাসী আমি
 সদা সর্বদাই ভাবি মনে মনে,
তোমার আত্মিক বন্ধন আমাকে 
নাড়া দিয়ে চলে প্রতিক্ষণে।

তোমার শুভ জন্মদিন বলেই
ছুটে চলেছি তোমার কাছে,
অবাক বিস্ময়ে ভেবে চলেছি 
তোমা সম আপন কে আছে?

একশো পঁয়ষট্টিতম জন্মদিনে 
হয়েছে মনোরম আয়োজন,
গঙ্গা জলেই হবে তো গঙ্গা পূজা 
 চিন্তার নেই কোন প্রয়োজন।

ছাত্রীরা সব বায়না ধরেছে এবার 
 খাবে তারা পনির পায়েস,
 বিভাগীয় অধ্যক্ষ হেসে বলেছেন -
 আইটেম হয়েছে তো বেশ!

 গানের নেতৃত্ব দেবে অদ্বিতীয়া 
 রবীন্দ্র সংগীতে বেশ দক্ষ,
 আবৃত্তিতে থাকবে সৌদামিনী
দেখি সেও চূড়ান্ত নিরপেক্ষ।

আসছি আমি বাড়ির  পথেই 
ভাবছি অনুষ্ঠানের কথা,
মন রয়েছে চরণপদ্মে তোমার 
তাই ভরতি আছে মাথা।

বিভিন্ন জায়গার অনুষ্ঠানে গিয়ে
কাটবে আমার সরাদিন,
মনের ভাঁড়ার পূর্ণ রেখো গুরুদেব 
কালকে তোমার জন্মদিন।


ঝরনা দত্ত


সঞ্চয়িতা স্মরণ... - সমর্পিতা রাহা

সমর্পিতা রাহা 

 

বৃষ্টি পরে টাপুর টুপুর 
   বর্ষার দিনে খেলা,
সোনার তরী ভেসে চলে 
   প্রশ্ন জাগে মেলা।

বসুন্ধরা বঙ্গমাতা 
  পূজারিনী বেশে,
কৃষ্ণকলির হোরিখেলা 
খিলখিলিয়ে হেসে।

সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় স্মৃতি 
 হৃদয় আসন জুড়ে,
খেয়া চড়ে ঝড়ের দিনে 
নৌকাযাত্রা দূরে।

কুয়ার ধারে লুকোচুরি 
 প্রণয় প্রশ্ন কত,
ভগ্ন মন্দির একাকী প্রাণ
মরিচীকা যত।

বেলাশেষে সহযাত্রী 
   হঠাৎ দেখা মেলে,
সাগরিকা ও মৃত্যুঞ্জয়
   পরশমনি পেলে।

যেতে হবে বহুদূর! - রকিবুল ইসলাম

 


হয়নি যা সূচনা লগনে,
হয়তো হবে না আর
যাবার আজ বড্ড অবেলা!
সোনার রথে চড়ে এবার 
আসবে ঊষা,হাসবে ধরা।
আশার ভেলার যাত্রী হয়ে
এঁকেছিনু স্বপন দু'চোখে,
ছেড়েছিনু তরী,ভাসিয়েছিনু ভেলা।
খুলেনি হাল,তোলেনি পাল
ডুবিছে তরী,ডুবিছে ভেলা।
ভুলেছে মাঝি,হারিয়েছে দিশা।
লন্ঠন হস্তে দর্শাইনি কেউ,
দেখায়নি পিদিম আলোর পথ।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি হতবিহ্বল,অস্থির!
গন্তব্য!সে তো তমসাবৃত সমস্যা সঙ্কুল!
তবু যেতে হবে বহুদূর!!



রকিবুল ইসলাম


ধর্ষিতা... - সালাম মালিতা


 

আমাকে আজ তোমরা ধর্ষিতা বল
প্রতিটা পদে পদে অবজ্ঞা কর,
তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে-
কলঙ্কিত উপাধিও দাও,
আমি কী সত্যিই দোষী?

আমি তো তোমাদের কাছে 
বেশি কিছুই চায়নি, 
শুধু একটু স্বাধীনতা 
আর একটু শিক্ষার অধিকার 
এটাই কি আমার দোষ? 

নরখাদকদের লালসার শিকার হয়ে 
এই বারো-তেরো বছরেই-
সতিত্ব নষ্ট হল,
যোনি দিয়ে রক্তপাত 
আর ছিন্নভিন্ন পোশাকে 
শকুনে খাওয়া গবাদি পশুর মত-
আধুনিক সভ্যতার ভাগাড়ে!

আমার জন্য যে মেয়েদের 
রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার কথা,
তারাই আজ ভ্রু কুঁচকে বলে-
' ছিঃ ছিঃ! 
 দ্যাখ দ্যাখ ধর্ষিতা যাচ্ছে! '
অথচ তার বাড়িতে
নয়তো পাশের বাড়িতে 
নিত্যদিন কেউ না কেউ 
স্বেচ্ছায় ধর্ষিতা হচ্ছে, 
শুধু প্রকাশের অভাবে 
তারা নিষ্পাপ হলেও-
অবলা হওয়ার দরুন 
আমিই ধর্ষিতা! 

ডিগ্রিধারী আধুনিক উলঙ্গ সমাজে
ইজ্জত ঘন্টা-মিনিটে বিক্রি হয়,
অথচ বিবাহের ক্ষেত্রে 
সবাই ভার্জিন মেয়ে খোঁজে। 
অঘোষিত বলে
পার্ক, লজ, স্কুল, অফিস
এমনকি আবাদি জমিতে
সদাই ধর্ষণ হচ্ছে-
অথচ তারাই নাকি সব ভার্জিন!
আর অসহায়ত্বের জন্য 
আমিই শুধু...
সমাজে ধর্ষিতার তকমা পেলাম।

নারীদের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করে 
এই সমাজ কী ধর্ষক নয়?
অন্যের মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট দেখে
স্বাভাবিক মানুষের বিবেক জাগে না
বলো তার বিবেক কী ধর্ষক নয়?
আইনের দ্বারস্থ হয়েও
টাকার অভাবে
ন্যায়বিচার মেলে না,
তাহলে সেই আইন কী ধর্ষক নয়?
অসাম্যের এই সমাজ, দেশ, জাতি
পুরো বিশ্ব আজ ধর্ষক,
অথচ নিষ্পাপ এই আমি
হায়েনার কবলে পড়ে-
স্বঘোষিত অস্পৃশ্য ধর্ষিতা।
সমাজের সকল অশুভর জন্য 
এই আমার মত যারা ধর্ষিতা-
সবকিছুর জন্যই নাকি
শুধু আমাদেরই দোষ...!

সালাম মালিতা


শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (দ্বিতীয় পর্ব) - আকাশ আহমেদ




(দ্বিতীয় পর্ব: নীরবতার গভীরতা)

প্রথম পর্বের সেই বৃষ্টিভেজা রাতের পর আকাশের জীবনে বাইরে থেকে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। ব্যবসা আগের মতোই চলছে, কাজের চাপ বাড়ছে, নতুন নতুন যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। মানুষ তাকে আরও বেশি চিনছে, সম্মান করছে।

কিন্তু ভেতরে- খুব নিঃশব্দে- একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

এখন আকাশ শুধু বাঁচে না, সে নিজের বেঁচে থাকার দিকে তাকায়।
 
সকালের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে, কিন্তু সেই আলো আর আগের মতো লাগে না। আগে এই আলো তার কাছে ছিল একটা নতুন দিনের শুরু- এখন মনে হয়, একই দিনের পুনরাবৃত্তি।

সে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নেয়। মেসেজ, কল, ব্যবসার আপডেট- সব কিছু দেখে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে দিনের কাজ শুরু করে।

সবকিছু ঠিকঠাক।
কিন্তু কোথাও যেন কিছু নেই।
একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
চোখে চোখ রাখল।
নিজের মুখটা গভীরভাবে লক্ষ্য করল।
ক্লান্তি আছে, দায়িত্ব আছে, অভিজ্ঞতা আছে- কিন্তু কোনো উচ্ছ্বাস নেই।

সে নিজের কাছেই ফিসফিস করে বলল -

“এই আমি? এটাই কি আমার পুরোটা?”

প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু উত্তরটা তার কাছে অজানা।

সেদিন বিকেলে সে তার গুদামে (ব্যবসার জায়গা) বসে ছিল। চারপাশে লোকজন কাজ করছে, কেউ পণ্য তুলছে, কেউ হিসাব লিখছে, কেউ ফোনে কথা বলছে।

সবকিছু চলমান।
হঠাৎ তার এক কর্মচারীর কথা তার কানে এলো-
“হ্যাঁ, আমি একটু দেরি করব… তুমি খেয়ে নিও… না না, আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না…”

সাধারণ একটা কথা।
প্রতিদিন হাজারবার শোনা যায়।
কিন্তু আজ আকাশ থেমে গেল।
কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে না।
এই ছোট্ট সত্যটা হঠাৎ তার কাছে খুব বড় হয়ে উঠল।

সেদিন রাতে সে ডায়েরি খুলল।
লিখল -

“অদ্ভুত লাগে। আমি এত মানুষের সাথে কথা বলি, এত মানুষ আমার ওপর নির্ভর করে- কিন্তু দিনের শেষে কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে না।”
“আমি কি কখনো কারও জীবনের প্রয়োজনীয় মানুষ ছিলাম?”

কলমটা থেমে গেল।
সে অনেকক্ষণ ধরে সেই কথাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েকদিন পর তাকে ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে হলো।

দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা।
জানালার পাশে বসে সে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগল।
সবকিছু ছুটে চলছে- মাঠ, গাছ, নদী, ঘরবাড়ি।
হঠাৎ তার মনে হলো- তার জীবনও ঠিক এমনই।
সবসময় চলমান।
কিন্তু কোথাও থামা নেই।

তার পাশের সিটে বসা এক বৃদ্ধ লোক তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন -
“বাবা, কী কাজ করো?”
আকাশ সংক্ষেপে বলল -
“ব্যবসা করি।”
বৃদ্ধ আবার জিজ্ঞেস করলেন -
“ব্যস্ত থাকো নিশ্চয়ই?”
আকাশ মাথা নেড়ে বলল -
“হ্যাঁ, সবসময়।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন -
“ভালো। কিন্তু মনে রেখো -শুধু ব্যস্ত থাকলেই মানুষ সুখী হয় না।”
আকাশ তাকাল।
বৃদ্ধ আবার বললেন -
জীবনে কিছু মানুষ দরকার, যাদের কাছে তুমি শুধু ‘তুমি’ হতে পারবে।”

এই কথাটা আকাশের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
সে কিছু বলল না।
কিন্তু তার ভেতরে যেন একটা ঢেউ উঠল।

ফিরে এসে সে নিজেকে আরও বেশি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল।
এখন সে বুঝতে পারছে - সে শুধু একা নয়, সে নিজের ভেতরেও একা।
সে কখনো নিজের সাথে সময় কাটায়নি।
সে সবসময় কাজের আড়ালে লুকিয়ে থেকেছে।

একদিন রাতে সে পুরোনো ছবি দেখতে লাগল।
স্কুলের গ্রুপ ছবি।
কলেজের অনুষ্ঠান।
বন্ধুদের সাথে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা।
সব জায়গায় সে আছে।
কিন্তু কোথাও যেন সে নেই।
কোনো ছবিতে তার পাশে কেউ নেই, যে তাকে আলাদা করে দেখাচ্ছে।
কোনো স্মৃতি নেই, যা তাকে ছুঁয়ে যায়।

সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
মনে হলো -
“আমার জীবনে কি কোনো গল্পই নেই?”

সেই রাতে সে ঘুমাতে পারল না।
জানালার পাশে বসে ছিল।
বাতাস বইছে, শহর নিঃশব্দ।
সে নিজের সাথে কথা বলতে শুরু করল -

“আমি কি ভালোবাসা চাই?”
“নাকি আমি শুধু একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?”
“যদি এখন কেউ আসে, আমি কি তাকে জায়গা দিতে পারব?”

এই প্রশ্নগুলো তাকে অস্থির করে তুলল।
কারণ সে জানে না।

পরদিন সে একটি বৃদ্ধাশ্রমে গেল।
সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে।
সেখানে অনেক বৃদ্ধ মানুষ -কেউ একা, কেউ পরিত্যক্ত, কেউ অপেক্ষায়।
আকাশ তাদের সাথে কথা বলছিল, সাহায্য করছিল।
হঠাৎ এক বৃদ্ধা তার হাত ধরে বললেন -

“বাবা, তুই মাঝে মাঝে আসিস। তোকে দেখলে মনে হয়, আমার ছেলেটা এসেছে।”

আকাশ থেমে গেল।
এই কথাটা তার ভেতরে কোথাও খুব গভীরে গিয়ে লাগল।
সে বুঝতে পারল -
ভালোবাসা শুধু পাওয়া নয়, দেওয়াও।
কিন্তু তার জীবনে সেই ব্যক্তিগত, গভীর, একান্ত ভালোবাসাটা নেই।

ফিরে এসে সে আবার লিখল -
“মানুষ আমাকে ভালোবাসে - সম্মান করে, কৃতজ্ঞতা জানায়। কিন্তু কেউ আমাকে নিজের করে চায় না।” “আমি সবার, কিন্তু কেউ আমার নয়।”

দিনের পর দিন এই উপলব্ধি তাকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে লাগল।
সে এখন বুঝতে পারছে -
ভালোবাসাহীনতা শুধু একটা অভাব নয়।
এটা একটা অভ্যেস।
একটা দেয়াল।
যা সে নিজেই তৈরি করেছে।

একদিন রাতে সে ডায়েরির একেবারে নতুন পাতায় লিখল -
“আমি কি বদলাতে চাই?”

প্রশ্নটা খুব সহজ।
কিন্তু উত্তরটা কঠিন।
সে অনেকক্ষণ ভেবে শেষে লিখল -
“হ্যাঁ… কিন্তু আমি জানি না কীভাবে।”

সেই রাতটা ছিল তার জীবনের আরেকটা মোড়।
কারণ সে প্রথমবার স্বীকার করল -

সে শুধু একা নয়, সে একা থাকতে চায়ও না।
আকাশ এখনো একই মানুষ।

ব্যবসায়ী।
দায়িত্বশীল।
সমাজের জন্য কাজ করা একজন মানুষ।

কিন্তু এখন তার ভেতরে একটা দরজা কাঁপতে শুরু করেছে।
যেটা এতদিন বন্ধ ছিল।
হয়তো সেই দরজা একদিন খুলবে।
হয়তো খুলবে না।

কিন্তু সে এখন অন্তত জানে -
দরজাটা আছে।


(চলবে - তৃতীয় পর্বে আকাশ নিজের অতীত, নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের ভেতরের দেয়ালের মুখোমুখি হবে…)

ক্ষুদ্র লেখক... - সালাম মালিতা

 
সালাম মালিতা 



চশমখোর এই উলঙ্গ সমাজে
আমি শব্দের প্ল্যাকার্ড পুঁতি,
ছন্দের হুঙ্কার দিই
আর বাক্যের চাবুক মেরে-
নগ্নতা উন্মোচন করি,
আমি একজন-
ক্ষুদ্র লেখক!! 

মিথ্যার নোংরা প্রলেপ দেওয়া 
মেকি ভালোবাসার শহরে-
কাব্য-কথায়
প্রতিনিয়ত করাঘাত করি,
নাগিনীর নীলচে বিষ শনাক্ত করে 
গানের সুরে প্রতিবাদ করি,
আমি একজন-
ক্ষুদ্র লেখক!! 

স্বার্থের এই ঠুনকো রঙিন প্রাসাদে
আমি ভাষার বন্দুক তাক করি,
সুযোগ পেলেই পাঠকের হৃদয়ে 
স্মৃতির সাক্ষীতে-
গল্প, উপন্যাসের এজলাস বসাই,
আমি একজন-
ক্ষুদ্র লেখক!! 

দরিদ্র-নিপীড়িত-নিষ্পেষিত 
মানুষের অব্যক্ত কথার সাথে-
আমার সদাই দহরমমহরম,
গৃহবধূ থেকে রাজার ভৃত্য 
সবার বিক্ষুব্ধ বর্ণ জোগাড় করে-
কবিতা-ছড়ায় রূপ দিই,
আমি একজন-
ক্ষুদ্র লেখক!! 

শব্দ নিয়ে খেলা করা অভ্যাস
তাই শব্দের শৈল্পিক বুননের-
চেষ্টা করি মাত্র,
মনে যা আসে তাই লিখে ফেলি
নিজেকে কখনোই-
কবি ভাবার স্পর্ধা দেখাই না, 
অতি সাধারণ লেখায়
প্রান্তিক মানুষের কষ্টের ভাষ্য-
জীবন্ত করতে চেষ্টা করি, 
আমি একজন-
ক্ষুদ্র লেখক!!

সত্য বড় বিচিত্র... কলমে --মারিয়াম রামলা

মারিয়াম রামলা


আমি সত্য বলি,
আমি সত্য লিখি,
তবে যেখানে আমি ভুল—
সেখানে নীরব থাকি।

আমার আয়নাই আমার নীরবতা,
হাসিমুখে চিৎকার করেও
আমি সত্যের কথাই বলি।
ভুল হলে চুপ থেকে
নিজের আত্মাকে
সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাই।

আমি সত্য বলি,
আমি সত্য লিখি,
আমার খোদাকে যেমন ভয় করি,
তেমনি নিজেকেও ভয় পাই।

একটি মিথ্যা থেকে
জন্ম নেয় শত মিথ্যা,
আমি মানুষের নয়—
শুধু নিজের পরিচয়টাই তুলে ধরি।

ঘোমটায় ঢাকা কনে
ভীষণ সুন্দর লাগে,
যখন পর্দা সরে যায়—
পুরো পৃথিবী তাকে দেখে।

চাঁদের মতো সেই মুখ
তারার মতো জ্বলে ওঠে,
আর একটি মিথ্যায়
গর্জে ওঠে পুরো আকাশ।

আমার আত্মা, আমার বিবেক—
আজ আমাকে
সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

একটি সত্যই
একজন মানুষকে
সত্যিকারের মানুষ বানায়।

সেই শিক্ষাই আজ
হাজার মানুষকে শেখাতে চাই।

আমি সত্য বলি,
আমি সত্য লিখি...!!

বিষাদ বসন্ত... - সর্বানী দাস

 
সর্বানী দাস

বসন্ত
বিষাদ হাওয়া
 নরম ছোঁয়া প্ৰিয় 
অচেনা পথের গোপন মনে
পুরোনো দিনের স্মৃতি আজও ডাকে 
ভেজা জানালার কাচে স্বপ্ন ধীরে ভাঙে,
একলা বিকেল নীল আকাশ হঠাৎ তোমার নামে,
ঝরা পাতার শব্দে ভিজে থাকে নিঃশব্দ তারার রাত 
অবেলাতে তোমার কথা মনে পড়ে জমে বুকে নীরব ব্যথা,
অচেনা শহর ভেজা পথে জলের গল্পে অব্যক্ত কথা।
জোনাকি আলোয় হারিয়ে যায় ধরে রাখা দুটি হাত 
বাতাস ছুঁয়ে যায় ভাঙা মন নীলচে খামে 
অভিমান নীরব সুরে ফিরে আসে গাঙে 
স্মৃতি আকাশ পটে কাজল আঁকে 
অজানা কোন স্বপ্নীল ক্ষণে 
সোহাগ আদর নিও 
চাওয়া পাওয়া 
অনন্ত

মুক্তি দাও... কলমে --জয়দীপ বসু

জয়দীপ বসু 



হে সর্বশক্তিমান এবার আমায় দাও মুক্তি,
অনন্তের পথে এগিয়ে চলার দাও শক্তি।
পেরিয়ে এসেছি জীবনের অনেকগুলো দিন
জানি না কার কাছে করেছি কত ঋণ।

তবুও আজও চলেছি বাজিয়ে হৃদয় বীণ,
 অনেক স্বপ্ন চিরতরে হয়েছে বিলীন।
জীবন পথে পেরিয়েছি অনেক দুর্গম গিরি, কান্তার,
দুর্ভাগ্যের জলধির মাঝে দিতে চেষ্টা করেছি সাঁতার।

কুয়াশা ঘেরা বন্ধুর পথে হয়েছি দিশেহারা,
আজও তা মনের মধ্যে আছে স্মৃতিঘেরা।
নিদাঘ তপ্ত দিনে ঘন ঘন পড়ে দীর্ঘশ্বাস,
জীবনের বালুচরে হারিয়েছে অনেক আশ।

  মাঝে মাঝে নিজেকে লাগে বড় অসহায়,
 মনে হয় বাঁচার নেই কোনো আর উপায়।
 তবুও একমুখ হেসে এগিয়ে চলি।
নেচে, গেয়ে ওঠে হৃদয়ের কথাকলি।

লোকে ভাবে আমি কত শত সুখী,
কিন্তু জানে না তো আমি কত দুঃখী।
তাই এবার আমায় দাও চিরতরে মুক্তি,
অনন্ত পথে সন্ধান করতে চাই শুক্তি।

ফেলে আসা সেই সোনালী শৈশব... কলমে: মুন্নাফ সেখ

 
মুন্নাফ সেখ


এখন তো সব মুঠোফোনে বন্দি আবেগটুকু,
স্মৃতিরা সব ধুলো জমা এক পুরোনো সিন্দুক।
নদীপথের সেই যাত্রা দিয়ে শুরুর স্মৃতিগুলো,
যখন বাহন ছিল না কোনো, উড়ত না পথের ধুলো।

মায়ের সাথে লঞ্চে চড়ে নদীপথে দূরে যাওয়া,
নানীমার সেই আদুরে আঁচল, স্নিগ্ধ সুশীতল হাওয়া।
তখন ছিল জলপথের রাজত্ব আর ইঞ্জিনের ধুকপুক,
লঞ্চের শব্দে ডানা মেলত ছোট্ট মনের সুখ।

নদীতে সপরিবারে স্নান আর মায়েদের কাপড় কাচা,
সেই ভিজে কাপড় বয়ে নিয়ে আসার নির্মল আনন্দ বাঁচা।
মায়েদের সাথে কলাইয়ের ডাল ধুতে যাওয়ার সেই বেলা,
চিনির সাথে কাঁচা ডাল— সে যে অমৃতের মেলা।

সকালবেলা উঠোনের রোদে বড়ি দেওয়ার সেই ধুম,
পিটুলি বা নিম ডাল দিয়ে দাঁতন, ভাঙলে চোখের ঘুম।
তখন ছিল না টুথব্রাশ, ছিল না যান্ত্রিক কোনো টান,
প্রকৃতির কোলেই বেড়ে উঠত শৈশবের জয়গান।

মামার বাড়ির সেই দড়ির খাট, তালপাতার মিষ্টি হাওয়া,
দিদিদের সেই হারিকেন মোছা, পরম সুখে দিন পাওয়া।
মামার বাড়ি থেকে ফেরার বেলা কান্না আসত মনে,
নদীর ধার দিয়ে পালিয়ে যেতাম বিকেলের সেই ক্ষণে।

মামা আসতেন পিছু পিছু ছুটে, ধরার ব্যাকুলতা,
ছুটতে ছুটতে বাড়ির কাছে পৌঁছানোর সেই কথা।
নদীর পাড় আর সেই লুকোচুরি, মামার শাসন-স্নেহ,
এমন সোনার শৈশব কি আর ফিরে পাবে আজ কেহ?

মাটির উপরে দাগ কেটে সেই ষোল গুটি খেলা,
বত্রিশ গুটি আর এক বাগ মিলে কাটত সারাবেলা।
স্কুলের পথে কাঁটা খয়রা ফল, টক-মিষ্টির স্বাদ,
পরের বাগানে পেয়ারা চুরিতে ছিল না কোনো বিবাদ।

গভীর রাতে খেজুরের রস বন্ধুদের সাথে খাওয়া,
বাবার অগোচরে নারকেল পাড়া— এক অদ্ভুত পাওয়া।
রোজার মাসে রোজা না রেখেও বন্ধুদের সাথে মেলা,
মামার বাড়িতে ভোজ চলতো— এক অনন্য লুকোচুরি খেলা।

পান্তা ভাত আর আলুর চটকা, ভেজা ভাতের সেই ঘ্রাণ,
বিয়ের বাড়িতে দিদিরা সব হাসত দেখে আমার কাণ্ডজ্ঞান—
"গরম ভাতের দরকার নেই, দিও ওকে ভেজা ভাত মেখে!"
সেই ঠাট্টায় মায়া ছিল কত, স্মৃতির পাতায় থাকে।

ক্লাস নাইনে অনেক পরে প্রথম এলো সেই সাইকেল,
জীবনের মোড় যেন ঘুরে গেল, শুরু হলো অন্য লেভেল।
অবিরাম পথে বন্ধুদের নিয়ে সেই সাইকেলে ছোটা,
হৃদয় জুড়ে হাসি-আনন্দের স্বপ্নগুলো গাঁথা।

স্কুলেতে গিয়ে বন্ধুদের তরে বেঞ্চটা রাখা ধরে,
চিঠি লিখে আজ মন হালকা করার দিন গেছে কবে মরে!
চায়ের দোকানে সিডি-ভিসিডি, ভিড় করে দেখা ছবি,
ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে নামা মোরা, হতে চেয়েছি কি সবি?

কোথায় হারালো সেই সব হাসি, মেঠো পথের সেই ধুলো?
বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ-উচ্ছ্বলগুলো।
এখন তো শুধু স্ক্রিনের আলোয় কাটে সবার দিন,
শৈশব আজ ঘরবন্দি, চার দেওয়ালে বিলীন।

মাটির গন্ধ পাওয়া যায় না তো, সবখানে কংক্রিট,
মনটা আজও খুঁজে ফেরে সেই পুরোনো দিনের গীত।
হেঁটে চলি আজ একাকী পথে, যন্ত্রের এই ভীড়ে,
ইচ্ছে করে আবার একবার সেই শৈশবে যাই ফিরে।

উড়ন্ত সেই দিনগুলো আজ হৃদয়ে দেয় যে নাড়া,
স্মৃতিরা কেবল জীবন্ত রয়, আমরাই বাঁধনহারা।
ফিরে কি আসবে হারানো রোদ্দুর, সেই সে সোনালী দিন?
শৈশব আজ শুধুই গল্প, এক অবাস্তব রঙিন স্বপ্ন বিলীন।

বেলা শেষের ডাক!.... - রকিবুল ইসলাম

 
রকিবুল ইসলাম


বেলা শেষের ডাক আমার কানে বাজে!
এখনো এলোনা সে,খুঁজে-ফিরেছি যারে সকাল-সাঁঝে।
বেলা শেষের ডাক আমার কানে বাজে!
প্রতীক্ষা করেছিনু যার তরে সারা জীবন ভরে,
অবজ্ঞা আর অবহেলায় পড়ে রইল সে,এখনো এলোনা ফিরে। 
বেলা শেষের ডাক আমার কানে বাজে!
এখনো পেলাম না তবু চির আরাধ্য সেই তাকে আমাতে আপন করে।
পারব কি করে!ভাবেনি কখনো সে আমাকে তার নিজের মত করে।
বেলা শেষের ডাক আমার কানে বাজে!
সুখ খুঁজতে গিয়ে তবু দুঃখকে নিয়েছি আপন করে,
সয়েছি যাতনা যত,দিয়েছে সে যা অতীব যতন করে।
বেলা শেষের ডাক আমার কানে বাজে!
আসল কি নকল,খাঁটি কি মেকি করিনি যাচাই, 
রয়েছি পড়ে তার মোহের আবেশে।
বেলা শেষের ডাক আমার কানে বাজে!
তার চলার পথ মসৃণ করতে গিয়ে
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি,আশা-নিরাশার দোলাচালে
লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে বেমালুম গিয়েছি ভুলে। 
ভাঙল ঘুম আমার অবশেষে বেলা শেষের ডাকে।
বেলা শেষের ডাক আমার কানে বাজে!

বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

মধুচক্র... - সালাম মালিতা

 
সালাম মালিতা



দাম্পত্য জীবনে
বিশ্বাস আজ ধুলোয় লুটোপুটি, 
যৌন চাহিদাটা
এমন পর্যায়ে নেমে এসেছে-
যা কুকুরের মিলন অপেক্ষা 
সস্তা হয়ে গেছে। 
সম্ভ্রম শব্দটা 
ধুলোপড়া বইয়ের পৃষ্ঠায়,
যৌনকর্মীদের মত
সবাই দেখাতে-
আর দেখতেই ব্যস্ত। 

পরকীয়াটা আজ
বড্ড বৈধ সম্পর্কের রূপরেখা, 
তাই সন্তানের ভবিষ্যৎ
অনাথাশ্রমের মমতাহীন কক্ষে। 
বেশি টাকা ব্যয় করে 
বেশ্যার শরীর কিনতে হয় না, 
বরং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে আসলেই 
সহজেই দেহের ভাগ পাওয়া যায়। 

ডিগ্রিধারী শিক্ষিত সমাজে
মধুচক্র ভীষণ মানানসই, 
তাই নির্ধারিত বয়সের পূর্বেই
শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন। 
সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে 
দ্রুত মানসিক অবনতি, 
প্রাপ্ত বয়ষ্কদের নীলছবি 
আর সস্তার যৌন উত্তেজক-
সমাজটাকে টেনেহিঁচড়ে 
ধ্বংসের পথে নামিয়েছে। 

ভ্রূণহত্যা সহজলভ্য হয়েছে 
বিয়ের পূর্বে লিভ-ইন-
যৌনসুখের অপার সুযোগ, 
রাত-দিন, ঘন্টা-মিনিট
অর্থের চুক্তিতে 
মধুচক্রের রবরবা বাজার।
বিশ্বাস আজ 
কাগজের পরিত্যক্ত ঠোঙা, 
চোখের পলকেই 
শপথ ভুলে শরীর দেওয়া-নেওয়া।

মানসিক শান্তি পেতে
আসুন এই মধুচক্র ভেঙে দিই,
সন্তানের হাতে
প্রয়োজনের অতিরিক্ত-
অনলাইন ডিভাইস বন্ধ করি।
নিজে সচেতন হই,
আর পাঁচজনকে সচেতন করি।
সমাজের উচ্ছিষ্ট দূর করতে
সস্তার দেহব্যবসা বন্ধ করে দিই,
সন্তানের পিতামাতার
প্রাপ্য ভালোবাসা ফিরিয়ে দিই,
দায়িত্বশীল অভিভাবক হই
আর সোনার সংসার করতে-
এক জীবনসঙ্গীতে আকৃষ্ট থাকি!