একটি উঠোনের পা দুটো থাকে, কিন্তু সম্পর্কের ফাটল একটি আঙুল থেকেই শুরু হয়। ঘরে কন্যা সন্তান না জন্ম নিলে কত দোয়া, কত মিনতি করা হয়! কন্যা সন্তানের জন্ম হলে ঘরে লক্ষ্মী আসেন।
একটি মেয়ের শৈশব আর তার পরিচয় কতই না সুন্দর হয়। তার সব স্বপ্ন, সব প্রয়োজন একজন মা-বাবা পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, পূরণ করেন। এই সব ছেড়ে একটি মেয়ে মনে কত আশা নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যায়।
কারণ একটি মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই বলা হয় যে তার নিজের ঘর হলো তার শ্বশুরবাড়ি। মেয়ের বিয়ে হতেই একটি উঠোন শূন্য হয়ে যায়, তো অন্য উঠোন খুশিতে ভরে ওঠে। একটি মেয়েকেই তো একজন শাশুড়ি বউ-এর রূপে পান। এত বছর ধরে যিনি ঘর সাজিয়েছেন, প্রতিটি ছোট ছোট জিনিসের খেয়াল তিনি রাখেন।
ভোরের রুটি, সন্ধ্যার চা-এত ভিড়ের মধ্যেও একা সব কাজ সামলে নেন। জানালার সেই পর্দাটা সোফা কিংবা বিছানার চাদরের সঙ্গে মিলিয়ে ঘরকে হাজারো রঙে সাজানোর চেষ্টা করেন।
সব নিয়ম-কানুন একটি স্কুলের রুটিনের মতো করে সময় কেটে যায়। প্রতিদিন নতুন নতুন আওয়াজও শোনা যায়, যখন পুরো সংসারকে একটি নিয়ম, একটি বাঁধনে জুড়ে দিয়ে নিজের মুঠোয় বন্দি করেন। "সন্ধ্যায় আমার বাড়ি এসো, জিলিপি আর ফুচকা খাওয়াবো"-ভেবে প্রতিবেশীকে আমন্ত্রণ জানান।
ঠিক তখনই ঘরে আরও আনন্দ বাড়ানোর চেষ্টায় একটি মেয়ের রূপে বউ নিয়ে আসেন। আবার কিছু নিয়ম, কিছু পরিবর্তন দিয়ে শুরু হয়। কারণ প্রত্যেক নারীই নিজের মনমতো করে সংসারকে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে চালান।
যখন একটি মেয়ে বিবাহিত হয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে আসে, তখন প্রতিটি পদক্ষেপে তার মায়ের কথা মনে পড়ে। "আমার মা তো সবজিতে ঝাল বেশি দিতেন," "আমার করলা পছন্দ নয়," "আমার মা তো ভেন্ডিতেও আলু দিতেন"-কিন্তু শাশুড়িকে তো এই সব কথা জানা ছিল না! আর ওদিকে ননদও শ্বশুরবাড়িতে ঠিক মতো মানিয়ে নিতে পারছিল না। একই ঘরে দুটো পা আর দুটো আওয়াজ, কিন্তু অভিযোগ শুধু একটাই হচ্ছিল। দুই মাই নিজেদের মেয়ের জীবন গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন।
সারাদিন আমরা 'জান' 'জান' বলে স্বামীর কাছে শাশুড়ির হাজারটা নালিশ করি, কিন্তু এটা কেন ভুলে যাই যে, যেই 'জান' 'জান' ডাকার জন্য একটি ছেলে জন্ম দিয়েছেন, সেই শাশুড়িই তো আমাদের আসল মা হন!
এত বছর ধরে সব ছোট ছোট জিনিস-সেই পুরোনো গয়না, বিয়ের শাড়ি এবং আরও কত জিনিস কেবল নিজের বউকে দেওয়ার জন্যই সামলে রাখেন। সব ভালো জিনিস নিজের মেয়ের থেকেও লুকিয়ে রাখেন। তাহলে শাশুড়ি কেন বা কী জন্য শেষে দুর্নামের ভাগী হন?
চলো না আজ শাশুড়ির পছন্দের শাড়ি পরি। স্বামী তো প্রতিদিন ঘোরাতে নিয়ে যান। আজ শাশুড়ি-বউ একসঙ্গে পার্লারে যাই, কিছু কেনাকাটা সেরে আসার পথে ফুচকাও খাই।
কখনও শাশুড়ি রুটি বানালে, কেন না বউও খাবার পরিবেশন করুক? এতে আর এমন কী সময় লাগে!
স্বামী তো সকালে অফিসে চলে গেলে একজন শাশুড়ি আর বউ-ই তো ঘরে একা থাকেন। কখনও শাশুড়ি ছোট ছোট কথা দেখেও না দেখার ভান করলেন, আবার কখনও বউও না-শোনার ভান করল-তাতে আর কী-ই বা সমস্যা হবে! প্রতিটি চিন্তায় খারাপ দিক থাকে, তাহলে কেন না আমরা চিন্তাভাবনাটাই পাল্টে দিই!
এই রীতি তো যুগ যুগ ধরে তো শাশুড়িও কখনও বউ শাশুড়ির রূপেই পরিচিত হই। একটি উঠোনে পা দুটো থাকে চলে আসছে। আজ আমরা বউ, ছিলেন। আর একদিন আমরাও একটি মেয়ের কতই না রূপ হয়- কখনও মেয়ে, কখনও মা, কখনও শাশুড়ি।
কিন্তু এটা কি কখনও ভেবেছি যে, প্রত্যেকের পা কেবল দুটোই হয়, আর একটা পা না থাকলে আমরা পুরোপুরিভাবে অসহায় বা অসম্পূর্ণ থাকি। এই পা আমাদের হাজারো শিক্ষা, ভালো-মন্দের পরিচয় এবং ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়।
চলো না, এক পা আমাদের তো এক পা শাশুড়ির সঙ্গে মিলিয়ে আঙুল ধরে হাঁটি। 'তুই-তুই আমি-আমি' হলেও এই উঠোনটা তো আমাদেরই। এতে সুগন্ধ প্রতিটি মেয়ে, প্রতিটি মা, প্রতিটি শাশুড়ির। সবার শরীরটা আলাদা নয়, শুধু রূপটাই আলাদা হয়। কারণ শাশুড়িও কখনও বউ ছিলেন আর শাশুড়িও বান্ধবী হন।

৩টি মন্তব্য:
একটি উঠোনে পা দুটো থাকে- এই রীতি তো যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আজ আমরা বউ, তো শাশুড়িও কখনও বউ ছিলেন। আর একদিন আমরাও শাশুড়ির রূপেই পরিচিত হই। একটি মেয়ের কতই না রূপ হয় কখনও মেয়ে, কখনও মা, কখনও শাশুড়ি।
এমন করে যদি
সবাই ভাবে
অশান্তি হয় না
সেই সংসারে।
জয়দীপ বসু
অসাধারণ লিখেছেন🌹🌹
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন