মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

বাবার মতো আমিও আজ... কলমে: মুন্নাফ সেখ



নবম শ্রেণিতে পড়তাম যখন বাবার ছায়ায় গিয়ে,
মেদিনীপুর পাড়ি দিলাম আসবাব সাথে নিয়ে।
সেই ট্রাকেতে ঠাসা ছিল আলমারি আর খাট,
বাবার সাথেই চিনেছিলাম জীবন যুদ্ধের মাঠ।
স্কুল শিক্ষকের বাসভবনে সব সাজাতে হবে,
কাষ্ঠ-শিল্পের সুবাস মাখা দিনটি ছিল তবে।

সাথে ছিল শ্রমজীবী আর অনেক কাজের লোক,
বাবার চোখে ছিল তখন শান্ত-গম্ভীর চোখ।
সকাল বেলা বিলিয়ে দিতেন সবার হাতে টাকা,
রাখতেন না মিস্ত্রিদের কারোর জঠর ফাঁকা।
তৃপ্তি ভরে প্রাতরাশ তারা করত কেনা রোজ,
বাবা কিন্তু নিতেন না সেই আহারটুকুর খোঁজ।

উদ্যমী ঐ দলে মিশে আমিও খেতাম বেশ,
নিজের বাটি নিমিষেই আমি করতাম যে শেষ।
বাবাকে যখন ডাকত সবাই, বাবা বলতেন হেসে—
"অনেক আগেই খেয়েছি আমি উদর ভরে এসে।"
পিতার হাতে শোভা পেত স্রেফ এক পেয়ালা চা,
ওতেই নাকি জুড়িয়ে যেত সকল ক্লান্তি-তৃষ্ণা।

ক্লান্ত জনে অবাক হয়ে শুধাতো যখন কথা,
বাবা কেবল আড়াল করতেন পেটের নীরব ব্যথা।
নাস্তা কেনার অর্থ দিয়ে নিজে থাকতেন উপোস,
কারোর ওপর করতেন না বাবা কোনোই আফসোস।
অবুঝ তখন বুঝিনি তো পিতার আসল রূপ,
অভাবের সেই জ্বালা সয়ে থাকতেন তিনি নিশ্চুপ।

কালচক্রের আবর্তনে বদলে গেছে দিন,
শৈশব আজ ধূসর হলো, নেই সে সময় রঙিন।
আজকে আমি বড় হয়েছি, বাবা হয়েছি নিজে,
অভাব দেখে চোখের কোণটি মাঝেমধ্যে ভিজে।
উপার্জন করতে গিয়ে বুঝি বাবার অসীম দাম,
রক্ত পানি করে কেমন ঝরাতে হয় ঘাম।

আপন মুখে অন্ন দিতে কুণ্ঠা জাগে মনে,
সন্তানের ঐ হাসির মূল্য গুনছি প্রতিক্ষণে।
মাঝেমধ্যে কাজের চাপে উদর থাকে খালি,
গৃহে ফিরে হাসিমুখে মিথ্যে কথা বলি।
সন্তানের ঐ তৃপ্তির তরে অভুক্ত আজ থাকি,
যেমন করে দিয়েছিলেন আমার বাবাও ফাঁকি।

পিতৃত্বের অর্থ হলো নিজের সুখকে ত্যাগ,
অভাবের ঐ দিনগুলোতেও সংবরণ করা রাগ।
বাবার সেই চা-চক্রের মানে বুঝেছি আজ গিয়ে,
সন্তান যেন শান্তিতে রয় নিজের আহার দিয়ে।
পিতার সেই ‘সাদা মিথ্যে’ আজ আমারও হয় সঙ্গী,
সবার মাঝে বজায় রাখি বীরের ধৈর্য-ভঙ্গি।

জঠর-জ্বালার হাহাকার কেউ পায় না কভু টের,
বাবারাই সব সইতে পারে পাহাড়-প্রমাণ ঢের।
আমার বাবা লড়ত যেমন, লড়ছি আমি তেমন,
বাবার পরশ অলক্ষ্যেতে আগলে রাখে এমন।
কোনো তনয় বুঝতে পারে না পিতার কত কষ্ট,
বাবার ত্যাগেই জীবনটা হয় সুন্দর এবং স্পষ্ট।

নিজের কষ্ট সংগোপনে খাবার তুলে দেওয়া,
বাবার মতো হতে পারা এক মহৎ পাওয়া।
মেদিনীপুরের সেই স্মৃতি আজ আমায় মনে করায়,
বাবার অসীম ভালোবাসা কেমন করে হারায়।
শত দুঃখ সয়েও যারা দেখায় সুখের আলো,
ভুবনের সব বাবারা তাই থাকুক অনেক ভালো।

লেখক -মুন্নাফ সেখ


কোন মন্তব্য নেই:

অচেনা ঠিকানায় শেষ বিকেলের চিঠি

গল্পধারা বুধবার  🔰 বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত -  সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন  সম্পাদক - আকাশ আহমেদ প্রকাশঃ...

জনপ্রিয় পোস্ট