![]() |
| জয়দীপ বসু |
সুদীর্ঘ ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতার পেশায় আত্ম নিবেদিত। মানুষ গড়ার কারিগর। তারুণ্যের স্বপ্ন বিলসিত দিনে ভালো ছাত্র, ছাত্রী তৈরি করার ঐকান্তিক অভিপ্রায়ে চরম অনিশ্চিত এই পেশায় আসা। আজও একইভাবে চলেছি। কারণ পড়াতে ভীষণ ভালো লাগে। আদর্শ ও মূল্যবোধকে জীবনে সবসময় অগ্ৰাধিকার দিয়ে চলি।
সালটা ২০১৬, এপ্রিল মাস। I. C. S. E বোর্ডের ছাত্রী দেবস্মিতাকে একাদশ শ্রেণীতে বাংলা পড়াতে শুরু করলাম। ওদের ফ্ল্যাটে গিয়ে পড়াতাম। আমার বাড়ির কাছেই। ও একাই পড়তো। বিনিময়ে গুরু দক্ষিণা অনেক বেশি পেতাম। প্রথম দিন পড়িয়েই খুব ভালো লেগেছিল। ভীষণ জ্ঞান পিপাসু, বিনয়ী, হাসি-খুশি, পড়াশোনায় বেশ ভালো। ইংরাজী মাধ্যমের ছাত্রী হওয়ায় বাংলায় সামান্য দুর্বল। কিন্তু ভালো করার অদম্য ইচ্ছা। সপ্তাহে একদিন করে পড়ানোর কথা থাকলে ও ওর আগ্ৰহে ভীষণ খুশি হয়ে মাঝে মাঝেই একস্ট্রা ক্লাস দিতাম। ও প্রায় রোজই পড়া করে রাখতো। কোনো দিন শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে পড়া করতে না পারলে ক্ষমা চেয়ে নিত।
I. C. S. E 10 এর ফল বেরোলে দেখা গেল দেবস্মিতা বাংলায় ৯০ পেয়েছে। নাইন, টেনে ও অন্য টিচারের কাছে বাংলা পড়তো। যাইহোক আমি I. S. C র জন্য আরো জোরদার গতিতে পড়ানো শুরু করি। আমার অনেক ছাত্র, ছাত্রীর মতো দেবস্মিতা ও আমাকে "তুমি " বলে সম্বোধন করতো। আমি অবশ্য এই ব্যাপারটায় খুব একটা গুরুত্ব দিই না। অনেকেই আমাকে "দাদা তুমি", "স্যার তুমি" এসব বলে সম্বোধন করে থাকে। পড়াশোনাটাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বেশি আপন ভেবে "তুমি" বলে থাকে। তবে বেশিরভাগ " আপনি " এবং "স্যার বলেই সম্বোধন করে।
যাইহোক দেবস্মিতা এবং ওর বাবা, মার অমায়িক ব্যবহার আমাকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। ইলেভেন থেকে টুয়েলভে ওঠার সময় দেবস্মিতা বাংলায় বেশ ভালো ফল করে। ওর বাবা, মা আমাকে অভিনন্দন জানান।
টুয়েলভে আরো মন দিয়ে পড়াশোনা করতে থাকে। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হওয়ায় ওর মারাত্মক চাপ ছিল। তাও ও প্রায় রোজ পড়া করে রাখতো। আমি ও ওকে ভালো করানোর জন্য নিজেকে প্রায় উৎসর্গ করেছিলাম। একস্ট্রা ক্লাস ও সময়ের কোনো হিসাব ছিল না। এদিকে সময় এগিয়ে চলতে থাকে খুব দ্রুত তাল, লয়, ছন্দে। ২০১৮ এর I. S. C পরীক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগে ওকে শেষ বারের মতো পড়াতে গেলে ও আমাকে দেখে কেঁদে ফেলে। বলে "স্যার তুমি আমাকে বাংলায় আগ্ৰহী করে তৈরি করেছো। তোমার মতো ভালো শিক্ষক আমি এর আগে কাউকে পাই নি। কিন্তু আর তো দেখা হবে না"। ওর এই আচরণে আমি ও ভীষণভাবে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি। ওকে বুঝিয়ে বলি "দেখো সব কিছুর একদিন শুরু ও শেষ আছে। তাই কান্নাকাটি না করে মন দিয়ে পরীক্ষা দাও। আমি সরাসরি পড়াতে না এলে ও ফোনে কথা বলবে। অনেক প্রাক্তন ছাত্র, ছাত্রীই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে"। তবুও ও কাঁদতে থাকে। ওর মাও সেদিন ওকে শান্ত করতে পারেন নি। যাইহোক ২ ঘন্টা পড়ানোর পর আমি শেষ বারের মতো চলে আসি।
পরের দিন সকাল সাড়ে ১১ টায় দেবস্মিতার বাবা ফোন করে জানান আমি চলে আসার পর ও নাকি ভীষণ কান্নাকাটি করেছে। বলেছে বাংলা পরীক্ষার এখনও কিছুটা দেরি আছে। এই ক' দিন ও অন্যান্য পরীক্ষার মাঝে আমার কাছে বাংলা পড়া চালিয়ে যেতে চায়। ওর বাবা আমাকে আবার পড়াতে যেতে অনুরোধ করেন। আমি ওর আবেগের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে আবার পড়াতে যাই এবং বাংলা পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত পড়ানো চালিয়ে যাই। প্রত্যেক দিনই আবার ওকে শেষ দিন সম্পর্কে কাউন্সেলিং করতাম।
জীবনে বহু ছাত্র, ছাত্রী পড়িয়েছি এবং এখনও পড়িয়ে চলেছি। প্রত্যেকেরই একদিন পড়ানোর শেষ দিন আসে। শেষ দিনে কম, বেশি সবাই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, মন খারাপ করে। আমারও খারাপ লাগে। কিন্তু এটাই জাগতিক নিয়ম। শুরু থাকলে তার শেষও আছে। কিন্তু দেবস্মিতার মতো এতটা আবেগ আমার প্রতি কেউ কোনো দিন দেখায় নি।
I. S.C তে বাংলা সহ সব বিষয়ে ভালো ফল করার পর স্থাপত্য বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করে ও আজ অনেক উপরের স্তরে। বিধাতার অমেয় আশীর্বাদ ওর উপরে আছে। আমি তখনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম যে ও একদিন অনেক বড় হবে। আজ তা সত্যি হয়েছে। ওর মতো ভালো মেয়ে( সব দিক থেকে ভালো ছাত্রী) আমি এখনো পর্যন্ত খুব খুব কম পেয়েছি। ও আরো অনেক বড় হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন