গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

লাভের কড়ি - দীপ্তি নন্দন

- দীপ্তি নন্দন 

লাভের কড়ি
- দীপ্তি নন্দন 


সেদিন সন্ধেবেলা তার ঘরের  দাওয়ায় হরিশ খুব মনমরা হয়ে বসেছিল। একটু আগেই  সুকুলের ঠেক-এ গিয়ে কয়েক গেলাস ধেনো চড়িয়ে এসে তারই নেশায় নিজের পোড়া কপালের কথা ভাবছিল বসে বসে।সেই দুপুরে এক মুঠো ভাত খেয়েছিল সে তারপর আর পেটে কিছু পড়েনি। উপরন্তু বৌ -এর লুকোনো টাকা থেকে পয়সা নিয়ে সে মনের দুঃখে ধেনোর ঠেক -এ গিয়েছিল।

খালি পেটে নেশাটা যেন ভীষণ জোরদার হয়েছে মনে হচ্ছে তার।
এখন ভরা বর্ষায় মাছ ধরার মরশুম চলছে, কিন্তু তার নৌকোর তলাটা ফেঁসে অকেজো হয়ে পড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে। হাতে এমন  পয়সা নেই যে সারাবে। এসময় কেউ চট করে নৌকো ব্যবহার করতে দিতেও চাইবেনা।এখন তার নৌকো নেই ,টাকাও নেই তাই এবার নদীতে মাছ ধরার পারমিটও নেওয়া হয়নি। তাই সে এখন বেকার হয়ে ঘরে বসে আছে আর দুবেলা বৌ - এর মুখ ঝামটা শুনছে। কারণ বৌ এখন অন্যের বাড়ির ধান, চিঁড়ে কুটে, মুড়ি ভেজে সংসার চালাচ্ছে।

মনের দুঃখে একপেট ধেনো খেয়ে সে দাওয়ায়  বসে থেকে থেকে একসময় শুয়েই পড়ে ছিল। এমন সময়,শোনে একটা চাপা গলা --

" এ্যাই হরিশ আজ একটু বেশি রাতে যাবি নাকি মাছ ধরতে? "

এটা কালুর গলা না! 'হরিশ লাফিয়ে উঠল। 

সাগ্রহে বলল," কোথায় রে?"

  কালু বলে, " কেন, নদীতে ! অনেক মাছ  পাওয়া যাবে এখন গেলে । যাবি তো বল্!
---   "সে কি রে? ওখানে রাতে পাহারা থাকে না?"

---" হ্যাঁ থাকে তো। কিন্তু আমার কাছে খবর আছে, জল পুলিশের পাহারার লঞ্চ আজ এদিকে থাকবে না,  অন্য দিকে থাকবে।কাল সকালের আগে ফিরবে না। "

 ---"  তাই নাকি? আচ্ছা তবে চল্ ! "হরিশ চুপিচুপি দাওয়ার একধারে রাখা মাছ ধরার সরঞ্জামের ঝোলা আর খেপলা জালটা নিয়ে বলে,-- 

" চল এবার দেখি কটা মাছ নিয়ে আসতে পারি। "

কালু, হরিশের মাছ ধরার নানা কৌশলের কথা জানতো। জানতো তার অব্যর্থ কোঁচ দিয়ে গেঁথে মাছ ধরার দক্ষতার কথা। তাই আজকের এই পাহারাহীন নদীতে মাছ ধরে কিছু বেশি লাভের কড়ি গোনবার জন্যই তো তার হরিশকে সঙ্গে নেওয়া! 

একটুক্ষণ পরেই অন্ধকারে দুটি ছায়া মূর্তি সকলের অগোচরে নদীর দিকে রওয়ানা হয়।একটা নিরিবিলি অন্ধকার ঘাটে কালুর নৌকোটা বাঁধা ছিল। দুজনে নিঃশব্দে নৌকোয় গিয়ে ওঠে। ঘাটের ধারের বড় গাছটায় বাঁধা রশি খুলে ঠেলে জলে নামিয়ে দিতেই নৌকোটা নদীর স্রোতে তরতরিয়ে চলতে থাকে।একটু পরে ঘন অন্ধকারের মধ্যে বিশাল বড়ো নদীর অথৈ কালো জলে নিঃশব্দে কালু তার নৌকো বাইতে থাকে আর হরিশ তার খেপলা জালটা ফেলে মাছ ধরার তোড়জোড় করতে গিয়ে দ্যাখে ,ঠিক নৌকোর পাশেই বড়ো বড়ো মাছ খলবল করছে ।  

সে বুঝল,এত কাছ থেকে মাছ ধরতে এই জালে কোনো কাজ হবে না।সে তার জাল গুটিয়ে রেখে মোক্ষম অস্ত্র  কোঁচটি বের করে  হাতে কোঁচ চালিয়ে  মাছ গেঁথে  তোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ধেনোর নেশায় হাত ঠিক মতো না চালাতে পেরে  খুব একটা বেশি মাছ গেঁথে তুলতে পারলনা। কালু ,হরিশের এই  বিশেষ গুণের কথা জানত বলেই, তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু নেশার ঘোরে এই হঠাৎ পাহারাহীন নদী থেকে ফায়দা তুলতে সে অপারগ হচ্ছে দেখে রেগে গিয়ে বলল, --  

" তুই যে নেশা করে আছিস আগে আমাকে বললি না কেন?   আজকের দিনটাই তো মাটি করে দিলি একেবারে। আমার তো সবটাই ক্ষতি।এতক্ষণ ধরে  নৌকো চালিয়ে লাভ কি হলো! ঐ দুএকটা মাছ বিক্রি করে ক'টা টাকা পাওয়া যাবে ? এর চেয়ে আমি একা এলে তবুও লাভ থাকত কিছু! "

রাগে সে গজগজ করতে লাগল। হরিশ অনেকক্ষণ ধরে  কালুর কথাগুলো শুনছিল।  তারও তো পরিশ্রম হয়েছে যথেষ্ট। ক্লান্ত হয়ে সে নৌকোর গলুই- এ বসে হাঁফাচ্ছিল। একেই কদিন তার কোনো আয় নেই। তেমন খাওয়াও জুটছে না, তার ওপরে রয়েছে ধেনোর নেশার প্রভাব।তাই ক্লান্তির মাত্রাটা একটু বেশিই ছিল হরিশের।

কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করার পর কালু নৌকোর একেবারে ধারে বসে ঢুলতে লাগল ঘুমে। তার আগেই সে পাড়ের কাছাকাছি একটা খুঁটিতে তার নৌকোটা বেঁধে রেখেছিল।

হরিশ ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়ে শুতেই যাচ্ছিল। তখনি হঠাৎ একটু আগে বলা কালুর কথাগুলো ভেবে তার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল।

তখন হঠাৎই হরিশের মনে হলো, আচ্ছা আর তো কেউ জানে না, আজ কালুর আর তার রাতের অভিযানের কথা !এখন যদি সে কালুকে তার রাস্তা থেকে হটিয়ে দেয়, তাহলে কেউই তো  কিছু জানতে পারবে না।খোলের মধ্যে যে পরিমাণ মাছ আছে , কাল সকালে নদীর ঘাটে কিংবা হাটে বিক্রি করতে পারলে, কিছু তো পাওয়া যাবে! 

সে নৌকোর পাশে বসে ঘুমে ঢুলতে থাকা  কালুর গলায় পেছন থেকে তার হাতের কোঁচটা চালিয়ে দিয়ে, ঠেলে ফেলে দিল তাকে জলের মধ্যে। হরিশ দেখল তার কোঁচের ঘায়ে, কালুর গলাটা প্রায় পুরোটাই কেটে দুই টুকরো হয়ে গেছে। এবার সে খুব নিশ্চিন্ত হয়ে নৌকোর মধ্যে শুয়ে  পড়ল, আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়েও পড়ল। 

অল্পক্ষণ পরেই তার মনে হলো যেন নৌকোর পাশেই একটা বড়ো মাছের খলবলানির শব্দ আসছে। সে উঁকি মেরে দেখে একটা বিশাল মাছ নৌকোর ঠিক পাশেই খলবল করছে। সে হাতের কোঁচটা চালিয়ে দিয়ে সেটাকে একবারেই গেঁথে , অনেক কষ্টে সেই বৃহৎ মাছকে নৌকোর খোলে তুলে রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। 

ভোরের আলো ফুটে গেলেও তার সেই ঘুম ভাঙলো না। এদিকে উপকূল রক্ষী বাহিনীর লঞ্চ এদিকে ততক্ষনে চলে এসেছিলো। তারা কালুর নৌকায় হরিশকে অঘোরে ঘুমোতে দেখে তাকে ওঠাতে গেলো।

জল পুলিশের লোকের লাঠির খোঁচা  খেয়ে  ঘুম ভাঙল হরিশের। বেআইনি ভাবে পারমিট ছাড়া মাছ ধরার অপরাধে তাকে ধরতে গেলে, সে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে ,-- 

" হুজুর যে মাছ ধরেছি তার  থেকে কটি মাছ আপনার বাড়িতে পাঠিয়ে দিই! " 

পুলিশের লোক কিছু বলার আগেই ঝামেলা থেকে ছাড় পেয়ে যাবার আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সে নৌকোর খোল থেকে মাছ বের করতে গেল। 

পাশ থেকে পুলিশ ইন্সপেক্টর  উঁকি মেরে দেখতে গেলেন কত মাছ রয়েছে সেখানে , কিন্তু  তাঁরা অনেক মাছের বদলে দেখলেন, নৌকোর খোলের মধ্যে কালু, তার প্রায়  দু ফাঁক করা গলা নিয়ে সেখানে শুয়ে আছে!


শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (চতুর্থ পর্ব)




ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি
লেখক - আকাশ আহমেদ

চতুর্থ পর্ব: 
নীরবতার কান্না


রাত যত গভীর হয়, মানুষের ভেতরের সত্যগুলো তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দিনের ব্যস্ততা মানুষকে অনেক কিছু ভুলিয়ে রাখে - কাজ, দায়িত্ব, মানুষের ভিড়, ফোনের শব্দ - সব মিলিয়ে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাত ?

রাত কাউকে লুকাতে দেয় না।
রাত মানুষকে তার নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আকাশ এখন প্রতিটা রাতেই নিজের সামনে দাঁড়ায়।
আর প্রতিটা রাতেই সে একটু একটু করে ভেঙে পড়ে।
সেদিন রাতেও সে ঘুমাতে পারেনি।
ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় তিনটা ছুঁইছুঁই।

ঘরের সব আলো নিভানো, শুধু জানালার পাশে রাখা ছোট্ট ল্যাম্পটা জ্বলছে। সেই ম্লান আলোয় আকাশ চুপচাপ বসে ছিল।

বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু তার ভেতরে যেন ঝড় চলছে।
সে ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল।
কনট্যাক্ট লিস্ট খুলল।
অসংখ্য নাম।
ব্যবসার পার্টনার।
কর্মচারী।
সংগঠনের মানুষ।
পরিচিত।
বন্ধু।

কিন্তু সে হঠাৎ বুঝতে পারল - এই এত মানুষের ভিড়েও তার একজন মানুষ নেই।
এমন একজন নেই, যাকে সে এখন ফোন করে বলতে পারে -

“আমার খুব একা লাগছে।”

এই উপলব্ধিটা তার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল।
সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর ধীরে ধীরে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।
অনেকক্ষণ।

কোনো শব্দ নেই।
শুধু নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ।
হঠাৎ তার মনে হলো - সে ক্লান্ত।
খুব ক্লান্ত।
শরীর নয়।
হৃদয় ক্লান্ত।

বছরের পর বছর নিজের অনুভূতিগুলোকে চাপা দিতে দিতে, নিজেকে শক্ত দেখাতে দেখাতে, সব দায়িত্ব একা কাঁধে নিতে নিতে - সে ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে গেছে।

তার মনে পড়ল একটা কথা।
একবার তার মা বলেছিলেন -

“মানুষ যত বড়ই হোক, তার জীবনে একটা মানুষ দরকার, যার কাছে সে ছোট হয়ে থাকতে পারবে।”

তখন আকাশ কথাটার গুরুত্ব বুঝতে পারেনি।

আজ বুঝছে।
আজ তার মনে হচ্ছে - সে কোনোদিন কারও কাছে ছোট হতে পারেনি।
কোনোদিন মাথা রেখে বলতে পারেনি -

“আজ খুব কষ্ট হচ্ছে।”

তার চোখ ভিজে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
যেন কেউ দেখে ফেলবে।
অথচ ঘরে সে একা।

এই একাকীত্বটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
যেখানে মানুষ কাঁদলেও কেউ দেখে না।
চুপ থাকলেও কেউ বোঝে না।
সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা খুলল।

অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকল।
তারপর লিখতে শুরু করল -

“আজ হঠাৎ মনে হলো, আমি হয়তো কোনোদিন সত্যিকারের বাঁচিনি।”
“আমি শুধু দায়িত্ব পালন করেছি।”
“মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, কাজ করেছি, সফল হয়েছি।”
“কিন্তু নিজের হৃদয়ের পাশে কোনোদিন দাঁড়াইনি।”

কলম থেমে গেল।
তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
সে আবার লিখল -

“আমি জানি না ভালোবাসা কেমন।”
“কেউ কোনোদিন আমার হাত ধরে বলেনি -‘আমি আছি।’”
“আমিও কাউকে বলিনি -‘থেকে যাও।’”
“হয়তো এটাই আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।”

একফোঁটা জল ডায়েরির পাতায় পড়ে দাগ হয়ে গেল।
আকাশ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দাগটার দিকে।
তার মনে হলো - এই দাগটা যেন তার পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি।

অস্পষ্ট।
নিঃশব্দ।
অপূর্ণ।

সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ভয় পেল।
কারণ আজ সে বুঝতে পারছে - এই শূন্যতা শুধু একা থাকার নয়।
এই শূন্যতা অনুভূতি হারিয়ে ফেলার।

পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চোখের নিচের কালো দাগ দেখল।
ক্লান্ত মুখ।
অবসন্ন চোখ।
সে নিজেকে দেখে মনে মনে বলল -

“মানুষ আমাকে শক্ত ভাবে।”
“কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভাঙা, সেটা কেউ জানে না।”

সেদিন তার অনেক কাজ ছিল।
একটার পর একটা মিটিং।
ফোন কল।
লেনদেন।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।

কিন্তু সে লক্ষ্য করল - আজ তার হাসিটা আরও বেশি কৃত্রিম লাগছে।
সে কথা বলছে, কিন্তু মন নেই।
মানুষের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু অনুভব করছে না।
একসময় দুপুরে সে নিজের কেবিনে একা বসেছিল।
হঠাৎ বাইরে একটা ছোট্ট বাচ্চার হাসির শব্দ শুনতে পেল।
তার এক কর্মচারী তার মেয়েকে নিয়ে এসেছে।
ছোট্ট মেয়েটা বাবার হাত ধরে হাসছে।
বাবাও হাসছে।

সেই দৃশ্যটা দেখে আকাশের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
কারণ তার মনে হচ্ছিল - সে এমন একটা জীবনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেটা তার কোনোদিন হবে না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ অন্ধকার ঘরে বসে ছিল।
কোনো আলো জ্বালায়নি।
অন্ধকারের ভেতরে বসে থাকতে তার ভালো লাগছিল।
কারণ তার মনে হচ্ছিল - এই অন্ধকারটাই তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী।
হঠাৎ সে খুব গভীর একটা সত্য অনুভব করল।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার একা থাকা নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো -
কারও অভ্যাস না হয়ে ওঠা।
সে কখনো কারও প্রয়োজন হয়ে উঠতে পারেনি।
কেউ তার অপেক্ষায় ঘুম হারায়নি।
কেউ তার কষ্ট বুঝে নীরবে পাশে বসেনি।
কেউ তার অনুপস্থিতিতে শূন্যতা অনুভব করেনি।
এই উপলব্ধিটা তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিল।
সে আবার ডায়েরি খুলল।
এইবার তার হাত কাঁপছিল।
সে লিখল -

“আমি আজ বুঝলাম, ভালোবাসাহীন হৃদয় শুধু নিঃসঙ্গ হয় না - একসময় অনুভূতিহীনও হয়ে যায়।”
“আমি হাসি, কথা বলি, মানুষের পাশে দাঁড়াই।”
“কিন্তু আমার ভেতরে যেন কিছুই আর নড়ে না।”
“আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি ?”

প্রশ্নটা লিখেই সে থেমে গেল।
তার মনে হলো - এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না।
রাত আরও গভীর হলো।
বাইরে বাতাস বইছে।
জানালার পর্দা দুলছে।

আকাশ ধীরে ধীরে মাথাটা দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হচ্ছিল- তার পুরো জীবনটা যেন একটা দীর্ঘ করিডোর।
যেখানে অনেক মানুষ এসেছে, গেছে, কথা বলেছে -
কিন্তু কেউ থেমে থাকেনি।

আর সেই করিডোরের একেবারে শেষে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজে।
একটা ভালোবাসাহীন হৃদয় নিয়ে।

যে হৃদয় আজ প্রথমবার নিজের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছে।
সেই রাতের শেষে ডায়েরির শেষ পাতায় সে শুধু একটা লাইন লিখল -

“আমি কখনো কাউকে বলিনি আমাকে ভালোবাসতে… হয়তো এ কারণেই কেউ থাকেনি।”

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
কিন্তু আকাশের ভেতরে এখনো গভীর রাত।


(চলবে - পঞ্চম ও শেষ পর্বে আকাশ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের মুখোমুখি হবে, যেখানে সে বুঝবে - সব ভালোবাসা পাওয়া যায় না, কিছু ভালোবাসা শুধু অনুভব করেই বেঁচে থাকতে হয়…)

অণুগল্প: চেতনায় নজরুল - সুবর্ণা দাশ

লেখিকা - সুবর্ণা দাশ

 
চেতনায় নজরুল
- সুবর্ণা দাশ


কিরে দাদা তুই লম্বা চুলের পাগড়ি পড়ে কি করছিস? 

তুলি প্রশ্ন করে ওর দাদা শুভকে। আরে তুলি কালকে তো কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। আমরা কবির জন্মদিন পালন করব, তাই আমি নজরুল সেজে দেখছি কেমন লাগে। 

ও তাই নাকি খুব ভালো লাগছে তোকে দেখতে। 
- তাহলে আমিও কিছু একটা করতে চাই। 
- তাহলে বোন তুই 'সাম্যের গান গাই' কবিতাটি পাঠ করবি কেমন। 
- আচ্ছা দাদা। তুই কি করবি দাদা?
- আমি নজরুলের ভূমিকায় অভিনয় করবো। বিদ্রোহের অভিনয়। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য জেলে বন্দী হয়েছিল সেই ভূমিকায়। আর কাজী নজরুল ইসলাম জেলে বসে যে গান রচনা করেছিল 'কারার ঐ লৌহ কপাট' ঐ গানটি করবো। আর আমাদের অনুষ্ঠানের নাম হবে 'চেতনায় নজরুল'। 

দাদা আর বোন মিলে সুন্দর একটি কারাগারের মতো বানালো। দাদা শুভ বানানো কারাগারে ঢুকে অভিনয় করে গানটি গাইলো, 'কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল করলে লোপাট।'

আর একটু দূর থেকে ওদের মা-বাবা দুই ছেলে মেয়ের কান্ড দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। 

কি সুন্দর করে তুলি কবিতা পাঠ করলো, আর শুভ চমৎকার অভিনয় করলো নজরুলের ভূমিকায়। 

মা-বাবা গর্ববোধ করে ছেলে মেয়ের এ হেন আচরণে। 
ছেলে মেয়ের মননে জাগ্রত হয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম জয়ন্তী।

সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

গল্প - অভাবের সংসারে এক চিলতে সুখ... - সুবর্ণা দাশ

 


গল্প -
অভাবের সংসারে এক চিলতে সুখ
- সুবর্ণা দাশ


আজ উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বের হলো। মণি সেরা দশজনের মধ্যে ৩য় স্থান অধিকার করেছে। দলে দলে লোকজন ভিড় করতে লাগলো মণিদের বাড়িতে। বাড়ি'তো নয়, একটুকরো খড়ের ছাউনির ছোট ঘর। সাংবাদিক আসলো টিভি চ্যানেল থেকে। মহা আনন্দের সমারোহ আজ মণির মা-বাবার কাছে। 

অভাবের সংসার রীতা ও জয়ের। অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করে রীতা, জয় ও তাদের আদরের একমাত্র কন্যাসন্তান মণি।বাবা জয় ভ্যানে করে ডাব বিক্রি করে আর মা রীতা পরের বাড়িতে কাজ করে। মণির ছোট বেলা থেকে পড়া লেখার প্রতি বড় ঝোঁক ছিল। তাই মা-বাবা অনেক কষ্টে মণিকে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়াচ্ছে। ঠিকঠাক কোন প্রাইভেট শিক্ষকও দিতে পারেনি মণিকে মণির মা-বাবা। 

স্কুলে শিক্ষকরা ক্লাসে যতটুকু পড়িয়েছেন সেটাই মনোযোগ দিয়ে বাড়িতে পড়তো মণি। দিন রাত শুধু পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতো মণি। 

রীতা ও জয় মেয়ের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে পারতো না বলে,ওদের মনে অনেক দুঃখ ছিলো। মণির মা-বাবা কখনো বুঝতে পারেনি তাদের মেয়ে পড়াশোনায় এত ভালো। স্কুলের হেডমাস্টার এলো মণির মা-বাবার কাছে। আজ যেন মণিদের বাড়িতে খুশির ঢল নেমেছে। 

সাংবাদিক স্বাক্ষাৎকার নিচ্ছে মণির। পাড়া প্রতিবেশি এসে বলে 'ও মণির মা, মণিকে টিভিতে দেখাচ্ছে। মণির মা-বাবার এত আনন্দের মধ্যেও চোখে জল আসলো। রীতা ও জয় দুঃখ করে বলে,বাড়িতে আমাদের টিভি নেই যে ,মেয়েকে যে টিভিতে দেখাচ্ছে সেটা একটু দেখবো ! মণি এসে বলে, আমি বড় হয়ে চাকরি করে তোমাদের টিভি কিনে দেব। মণি সাংবাদিকদের বলে - 

"সে বড় হয়ে মানুষের ও দেশের সেবা করবে"

রীতা ও জয় আজকের দিনে মণিকে যে একটা কিছু দেবে সেই বাড়তি টাকা টুকুও নেই। তাই মনে মনে ওদের খুব দুঃখ! তবুও রীতা ও জয় খুশি। সুখের বন্যা বয়ে যাচ্ছে তাদের হৃদয়ে। 

রীতা ও জয় বুঝে তাদের মেয়ে কি সাফল্য অর্জন করেছে। মেয়ে মণিকে জড়িয়ে ধরে বাবা-মা আবেগে আপ্লুত। কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে গেছে ওরা ওদের নিত্য দিনের অভাবের যুদ্ধের কথা। মণিকে মিষ্টিমুখ করিয়ে জয় বলে -  

- আমি ও তোর মা পড়ালেখা করতে ভালোবাসতাম। 
কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি আমাদের প্রতিকূলে ছিলো বলে পড়ালেখা করতে পারিনি। 
আমাদের না'পারা গুলো তুই পূরণ করলি মা। 
তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি তুই আরো ভালো রেজাল্ট করবি ভবিষ্যতে। 
এই আশা থাকলো তোর কাছে। 

মণি বলে - 
- আশা আমি পূরণ করবো বাবা। 

বেলা গড়াতে ভ্যান নিয়ে জয় বেরিয়ে গেল নিজ কর্মে। জয়াও মেয়েকে চুমু খেয়ে কাজে বেরিয়ে গেল। 

মণি ভাবে - 
মা-বাবা, শিক্ষক সবাই আজ কত আনন্দ করলো আমার ভালো রেজাল্টের কারণে। 
আমি আরো ভালো করবো, নিজের পায়ে দাঁড়াবো। মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করবো। 
দেশের কাজ করবো এই আমার অঙ্গিকার।




লেখিকা - সুবর্ণা দাশ


শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (তৃতীয় পর্ব) লেখক - আকাশ আহমেদ

 




ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি
লেখক - আকাশ আহমেদ

তৃতীয় পর্ব: (ভেতরের দেয়াল)

মানুষের জীবনে কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর বাইরে কোথাও পাওয়া যায় না। যতই মানুষ, কাজ, ব্যস্ততা কিংবা সাফল্যের ভিড়ে নিজেকে ঢেকে রাখা হোক না কেন - একসময় সেই প্রশ্নগুলো ফিরে আসে।

আর তখন মানুষকে নিজের সামনেই দাঁড়াতে হয়।
আকাশ এখন সেই সময়টার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আগে সে ব্যস্ত থাকত।
এখনো থাকে।

কিন্তু পার্থক্য হলো - আগে ব্যস্ততা তাকে ভাবতে দিত না, এখন ব্যস্ততার মাঝেও সে ভাবতে থাকে।
ফোনে কথা বলছে, কিন্তু ভেতরে অন্য চিন্তা।
হিসাব করছে, কিন্তু মাথার ভেতর অন্য প্রশ্ন।
রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরছে, কিন্তু ঘুম আসছে না।
তার মনে হচ্ছে - সে যেন এতদিন একটা যন্ত্রের মতো বেঁচে ছিল।
সব দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছে, কিন্তু নিজের ভেতরটাকে কখনো দেখেনি।

সেদিন রাতেও ঘুম আসছিল না।
জানালার বাইরে শহরের আলো ঝাপসা হয়ে আছে। দূরে কোথাও গাড়ির শব্দ, কোথাও মানুষের হাসি।
আকাশ চুপচাপ বসে ছিল।
তার সামনে খোলা ডায়েরি।
কিন্তু আজ সে লিখতে পারছিল না।
কারণ আজ তার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে -

“আমি এমন কেন ?”

সে নিজের অতীতের কথা ভাবতে শুরু করল।
ছোটবেলার সেই চুপচাপ ছেলেটা।
যে নিজের কথা কাউকে বলত না।
যে সবসময় দূরত্ব বজায় রাখত।
যে কখনো কাউকে খুব কাছে আসতে দেয়নি।
হয়তো সেখান থেকেই শুরু।

তার মনে পড়ল স্কুলজীবনের একটা ঘটনা।
তখন সে নবম শ্রেণিতে পড়ে।
ক্লাসের এক ছেলে তাকে বলেছিল -

“তুই এত চুপচাপ থাকিস কেন? তোর কি কোনো অনুভূতি নেই ?”

সবাই হেসেছিল।
আকাশও হালকা হেসেছিল।
কিন্তু সেদিন রাতে সে অনেক ভেবেছিল।

তার কি সত্যিই অনুভূতি কম ?
নাকি সে শুধু প্রকাশ করতে পারে না ?

ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করল - সে সবসময় নিজেকে আটকে রেখেছে।
কারও কাছে দুর্বল হতে চায়নি।
কারও সামনে নিজের শূন্যতা প্রকাশ করতে চায়নি।
সে সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় করেছে।
আর সেই অভিনয় করতে করতেই একসময় সত্যিকারের অনুভূতিগুলোও হারিয়ে ফেলেছে।
একদিন বিকেলে তার এক পুরোনো বন্ধু দেখা করতে এলো।
অনেক বছর পর।
বন্ধুর কোলে ছোট্ট মেয়ে।
মেয়েটা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আছে।
বন্ধু হেসে বলল -

“দেখ, এটা আমার পৃথিবী।”

আকাশ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা ব্যথা অনুভব করল।
বন্ধু বলল -

“তোর কী খবর ? বিয়ে করবি না ?”

আকাশ হালকা হেসে বলল -

“সময় হয়নি।”

বন্ধু মজা করে বলল -

“সময় না ইচ্ছা ?”

আকাশ কোনো উত্তর দিল না।
কারণ সে জানে -সমস্যাটা সময় নয়।
সমস্যাটা সে নিজে।
বন্ধু চলে যাওয়ার পর সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল - সে যেন জীবনের একটা বড় অংশ মিস করে ফেলেছে।

কিন্তু সেটা কী ?
প্রেম ?
সম্পর্ক ?
নাকি শুধু কারও কাছে নিজের মতো করে বাঁচার অনুভূতি ?

সেই রাতে সে ডায়েরিতে লিখল -

“আমি বুঝতে পারছি, আমি শুধু ভালোবাসা পাইনি তা নয় - আমি কখনো ভালোবাসার জন্য নিজেকে প্রস্তুতও করিনি।”
“আমি সবসময় নিজেকে কাজের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছি।”
“হয়তো আমি ভয় পেতাম।”

ভয়।
এই শব্দটা তার মাথায় ঘুরতে লাগল।

সে কি সত্যিই ভয় পেত ?

হ্যাঁ।
সে ভয় পেত প্রত্যাখ্যানকে।
ভয় পেত দুর্বল হয়ে পড়তে।
ভয় পেত নিজের ভেতরের শূন্যতা কাউকে দেখাতে।
তাই সে সহজ পথ বেছে নিয়েছিল -
দূরে থাকা।
কিন্তু আজ সেই দূরত্বই তাকে গ্রাস করছে।

পরদিন সকালে সে ব্যবসার কাজে বাইরে বেরিয়েছিল।
রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে থামল।
চা খেতে খেতে চারপাশে তাকাচ্ছিল।
একটা মধ্যবিত্ত পরিবার পাশে বসেছিল।
স্বামী, স্ত্রী আর ছোট্ট ছেলে।
তারা খুব সাধারণভাবে কথা বলছিল।
হাসছিল।
ছোট ছোট বিষয় নিয়ে।

কিন্তু সেই দৃশ্যটা দেখে আকাশের মনে হলো - এই সাধারণ জিনিসগুলোই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

যেগুলো তার নেই।
চায়ের কাপ হাতে নিয়েই সে হঠাৎ অনুভব করল - তার ভেতরের দেয়ালটা খুব উঁচু হয়ে গেছে।
এত উঁচু, যে এখন সে নিজেও সেই দেয়ালের ওপারে যেতে পারছে না।
দিনের পর দিন সে নিজের ভেতরে ডুবে যেতে লাগল।
এখন সে রাতে আর শুধু ডায়েরি লেখে না।
সে নিজের সাথে তর্ক করে।
নিজেকে প্রশ্ন করে।

“আমি যদি কাউকে জীবনে আসতে দিতাম, তাহলে কি আজ সবকিছু অন্যরকম হতো?”
“আমি কি সত্যিই একা থাকতে চাই?”
“নাকি আমি শুধু একা থাকতে শিখে গেছি?”

একদিন গভীর রাতে সে হঠাৎ ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট খুলল।
অসংখ্য নাম।
ব্যবসার লোক।
কর্মচারী।
সামাজিক কাজের মানুষ।
বন্ধু।
পরিচিত।
কিন্তু এমন একজনও নেই, যাকে রাত তিনটায় ফোন করে সে বলতে পারে -

“আমার খুব খারাপ লাগছে।”

এই উপলব্ধিটা তাকে ভেঙে দিল।
সেই রাতে সে অনেকদিন পর কাঁদল।
খুব নিঃশব্দে।
কারও সামনে নয়।
নিজের সামনে।

পরদিন সকালে আয়নায় নিজের চোখ দেখে সে বুঝতে পারল - সে বদলাচ্ছে।
এই বদলটা বাইরে থেকে দেখা যায় না।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে আগের মানুষটা নেই।
এখন সে বুঝতে পারছে -
মানুষ শুধু দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে পারে না।
শুধু সফলতা নিয়েও না।
মানুষের ভেতরে একটা জায়গা থাকে, যেখানে অনুভূতি দরকার হয়।
কারও উপস্থিতি দরকার হয়।
কারও কাছে নিজের মতো করে দুর্বল হওয়ার জায়গা দরকার হয়।
কিন্তু আকাশের জীবনে এখনো কেউ নেই।
কোনো প্রেম নেই।
কোনো বিশেষ মানুষ নেই।
শুধু একটা দীর্ঘ নীরবতা।

তবুও, এই প্রথমবার সে নিজের দেয়ালটাকে দেখতে পাচ্ছে।
এতদিন সে ভাবত - সে ঠিক আছে।
এখন সে জানে - সে অসম্পূর্ণ।
সেই রাতে ডায়েরির পাতায় সে লিখল -

“আমি জানি না আমার জীবনে কোনোদিন ভালোবাসা আসবে কিনা।”
“কিন্তু আজ আমি প্রথমবার বুঝলাম - আমি ভালোবাসাহীন হয়ে জন্মাইনি।”
“আমি নিজেই ধীরে ধীরে নিজের হৃদয়টাকে বন্ধ করে ফেলেছি।”
“আর এখন সেই বন্ধ দরজার ভেতর আমি নিজেই বন্দী।”

বাইরে তখন গভীর রাত।
শহর প্রায় ঘুমিয়ে গেছে।
কিন্তু আকাশের ভেতরে এক অদ্ভুত জাগরণ শুরু হয়েছে।


চলবে ...

(চতুর্থ পর্বে আকাশ জীবনের এক গভীর একাকীত্বের মুখোমুখি হবে, যেখানে সে বুঝতে শুরু করবে - সবচেয়ে ভয়ংকর নীরবতা মানুষের ভেতরেই বাস করে…)

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

গল্প : ভাঙ্গা সাইকেল... কলমে- সুবর্ণা দাশ

 


শোভাদেবী বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রোজ পাশের বাড়ির ভদ্রলোক দিবাকর বাবুর চালচলন খেয়াল করেন। আর ভাবেন কি অদ্ভুত জীবন মানুষের। দিবাকর বাবুর দোতলা বাড়ি, দু'খানা গাড়ি, কি নেই ? সব আছে কিন্তু নিজের নয়, আবার ধরতে গেলে নিজেরও বলা যায়। 

কেননা এই গাড়ি, বাড়ি' তো তার ছেলেদের। ছেলের মানে'তো তার নিজের তাই না? কিন্তু এতে সাচ্ছন্দ বোধ করতে পারেন না দিবাকর বাবু, কেমন জানি একটা হীনমন্যতা কাজ করে। এই বাড়ি গাড়ি তার নিজের বলতে কোথায় যেন বাধে তার হৃদয়ে। কারণ এতো তার নিজের রোজগারের নয়, ছেলেদের। 

দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেন দিবাকর বাবু। 

এসব দেখে শোভাদেবীর মনে পড়ে অনেক বছর আগের সেই দিবাকর বাবুকে। যাকে তার কোন এক দাদা তাঁর ব্যবহৃত একটা সাইকেল দিয়ে বলেছিলেন -

"ধর দিবাকর এই সাইকেলটা আজ থেকে তোর। তুই এটা নিয়ে যা খুশি করতে পারিস। তোর প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারিস। এটার মালিক এখন তুই।"

খুশি মনে দিবাকর বাবু সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরেন। 
বউকে এসে বলে দেখ রমেন'দা এই ভাঙ্গাচোরা সাইকেল খানা আমাকে দিল। 
রমেন'দার এত টাকা, প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও আমাকে একটা পুরনো সাইকেল দিল! 

বউ দিবাকর বাবুকে বলে  -

"তুমি কেন এত রাগ করছ? হোকনা পুরনো, তবুও তো রমেন'দা দিলেন! তোমার মতো তুমি ব্যবহার করার জন্য। 

পরেরদিন থেকে দিবাকর বাবু সাইকেলে করে দোকানে যেতেন, হাটবাজার করতেন। দিবাকরের একটা কি যেন ব্যবসা ছিল, মানুষের বাড়ি গিয়ে জিনিস পৌঁছে দেওয়া, সব এই সাইকেলে চড়ে করতেন। কিন্তু সবাইকে বলে বেড়াতেন -

- ঐ বড়লোক দাদা তাঁর এত টাকা তবুও এই ভাঙ্গাচোরা একটা সাইকেল আমাকে দিল! 

শোভাদেবী সে দিনও মনে মনে হেসে ছিলেন, আজও তিনি হাসছেন দিবাকর বাবুর এই অজ্ঞতা, এই অদ্ভুত কান্ড দেখে! 

সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল দিবাকর বাবুর, একটু লং ড্রাইভে যাবে, কিন্তু সংকোচের কারণে কিছুতেই ছেলেদের বলতে পারলেন না ,মনের এই ছোট্ট আকাঙ্ক্ষার কথা। 

আজ মনে মনে রমেন'দার কথা ভাবে, পুরনো হলেও সেই সাইকেলটির সম্পূর্ণ মালিক ছিলাম আমি।নির্দ্বিধায় যেখনে খুশি, যখন খুশি সাইকেলে চড়ে বেড়িয়ে যেতে পারতাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করেন দিবাকর বাবু।

বেলকনি থেকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন শোভাদেবী। 

কি আজব মানুষের মন! 
কি বিচিত্র এই জীবন! 
সব আছে কিন্তু নিজের বলতে কিছুই নেই!


লেখিকা - সুবর্ণা দাশ


শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (দ্বিতীয় পর্ব) - আকাশ আহমেদ




(দ্বিতীয় পর্ব: নীরবতার গভীরতা)

প্রথম পর্বের সেই বৃষ্টিভেজা রাতের পর আকাশের জীবনে বাইরে থেকে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। ব্যবসা আগের মতোই চলছে, কাজের চাপ বাড়ছে, নতুন নতুন যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। মানুষ তাকে আরও বেশি চিনছে, সম্মান করছে।

কিন্তু ভেতরে- খুব নিঃশব্দে- একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

এখন আকাশ শুধু বাঁচে না, সে নিজের বেঁচে থাকার দিকে তাকায়।
 
সকালের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে, কিন্তু সেই আলো আর আগের মতো লাগে না। আগে এই আলো তার কাছে ছিল একটা নতুন দিনের শুরু- এখন মনে হয়, একই দিনের পুনরাবৃত্তি।

সে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নেয়। মেসেজ, কল, ব্যবসার আপডেট- সব কিছু দেখে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে দিনের কাজ শুরু করে।

সবকিছু ঠিকঠাক।
কিন্তু কোথাও যেন কিছু নেই।
একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
চোখে চোখ রাখল।
নিজের মুখটা গভীরভাবে লক্ষ্য করল।
ক্লান্তি আছে, দায়িত্ব আছে, অভিজ্ঞতা আছে- কিন্তু কোনো উচ্ছ্বাস নেই।

সে নিজের কাছেই ফিসফিস করে বলল -

“এই আমি? এটাই কি আমার পুরোটা?”

প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু উত্তরটা তার কাছে অজানা।

সেদিন বিকেলে সে তার গুদামে (ব্যবসার জায়গা) বসে ছিল। চারপাশে লোকজন কাজ করছে, কেউ পণ্য তুলছে, কেউ হিসাব লিখছে, কেউ ফোনে কথা বলছে।

সবকিছু চলমান।
হঠাৎ তার এক কর্মচারীর কথা তার কানে এলো-
“হ্যাঁ, আমি একটু দেরি করব… তুমি খেয়ে নিও… না না, আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না…”

সাধারণ একটা কথা।
প্রতিদিন হাজারবার শোনা যায়।
কিন্তু আজ আকাশ থেমে গেল।
কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে না।
এই ছোট্ট সত্যটা হঠাৎ তার কাছে খুব বড় হয়ে উঠল।

সেদিন রাতে সে ডায়েরি খুলল।
লিখল -

“অদ্ভুত লাগে। আমি এত মানুষের সাথে কথা বলি, এত মানুষ আমার ওপর নির্ভর করে- কিন্তু দিনের শেষে কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে না।”
“আমি কি কখনো কারও জীবনের প্রয়োজনীয় মানুষ ছিলাম?”

কলমটা থেমে গেল।
সে অনেকক্ষণ ধরে সেই কথাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েকদিন পর তাকে ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে হলো।

দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা।
জানালার পাশে বসে সে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগল।
সবকিছু ছুটে চলছে- মাঠ, গাছ, নদী, ঘরবাড়ি।
হঠাৎ তার মনে হলো- তার জীবনও ঠিক এমনই।
সবসময় চলমান।
কিন্তু কোথাও থামা নেই।

তার পাশের সিটে বসা এক বৃদ্ধ লোক তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন -
“বাবা, কী কাজ করো?”
আকাশ সংক্ষেপে বলল -
“ব্যবসা করি।”
বৃদ্ধ আবার জিজ্ঞেস করলেন -
“ব্যস্ত থাকো নিশ্চয়ই?”
আকাশ মাথা নেড়ে বলল -
“হ্যাঁ, সবসময়।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন -
“ভালো। কিন্তু মনে রেখো -শুধু ব্যস্ত থাকলেই মানুষ সুখী হয় না।”
আকাশ তাকাল।
বৃদ্ধ আবার বললেন -
জীবনে কিছু মানুষ দরকার, যাদের কাছে তুমি শুধু ‘তুমি’ হতে পারবে।”

এই কথাটা আকাশের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
সে কিছু বলল না।
কিন্তু তার ভেতরে যেন একটা ঢেউ উঠল।

ফিরে এসে সে নিজেকে আরও বেশি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল।
এখন সে বুঝতে পারছে - সে শুধু একা নয়, সে নিজের ভেতরেও একা।
সে কখনো নিজের সাথে সময় কাটায়নি।
সে সবসময় কাজের আড়ালে লুকিয়ে থেকেছে।

একদিন রাতে সে পুরোনো ছবি দেখতে লাগল।
স্কুলের গ্রুপ ছবি।
কলেজের অনুষ্ঠান।
বন্ধুদের সাথে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা।
সব জায়গায় সে আছে।
কিন্তু কোথাও যেন সে নেই।
কোনো ছবিতে তার পাশে কেউ নেই, যে তাকে আলাদা করে দেখাচ্ছে।
কোনো স্মৃতি নেই, যা তাকে ছুঁয়ে যায়।

সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
মনে হলো -
“আমার জীবনে কি কোনো গল্পই নেই?”

সেই রাতে সে ঘুমাতে পারল না।
জানালার পাশে বসে ছিল।
বাতাস বইছে, শহর নিঃশব্দ।
সে নিজের সাথে কথা বলতে শুরু করল -

“আমি কি ভালোবাসা চাই?”
“নাকি আমি শুধু একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?”
“যদি এখন কেউ আসে, আমি কি তাকে জায়গা দিতে পারব?”

এই প্রশ্নগুলো তাকে অস্থির করে তুলল।
কারণ সে জানে না।

পরদিন সে একটি বৃদ্ধাশ্রমে গেল।
সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে।
সেখানে অনেক বৃদ্ধ মানুষ -কেউ একা, কেউ পরিত্যক্ত, কেউ অপেক্ষায়।
আকাশ তাদের সাথে কথা বলছিল, সাহায্য করছিল।
হঠাৎ এক বৃদ্ধা তার হাত ধরে বললেন -

“বাবা, তুই মাঝে মাঝে আসিস। তোকে দেখলে মনে হয়, আমার ছেলেটা এসেছে।”

আকাশ থেমে গেল।
এই কথাটা তার ভেতরে কোথাও খুব গভীরে গিয়ে লাগল।
সে বুঝতে পারল -
ভালোবাসা শুধু পাওয়া নয়, দেওয়াও।
কিন্তু তার জীবনে সেই ব্যক্তিগত, গভীর, একান্ত ভালোবাসাটা নেই।

ফিরে এসে সে আবার লিখল -
“মানুষ আমাকে ভালোবাসে - সম্মান করে, কৃতজ্ঞতা জানায়। কিন্তু কেউ আমাকে নিজের করে চায় না।” “আমি সবার, কিন্তু কেউ আমার নয়।”

দিনের পর দিন এই উপলব্ধি তাকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে লাগল।
সে এখন বুঝতে পারছে -
ভালোবাসাহীনতা শুধু একটা অভাব নয়।
এটা একটা অভ্যেস।
একটা দেয়াল।
যা সে নিজেই তৈরি করেছে।

একদিন রাতে সে ডায়েরির একেবারে নতুন পাতায় লিখল -
“আমি কি বদলাতে চাই?”

প্রশ্নটা খুব সহজ।
কিন্তু উত্তরটা কঠিন।
সে অনেকক্ষণ ভেবে শেষে লিখল -
“হ্যাঁ… কিন্তু আমি জানি না কীভাবে।”

সেই রাতটা ছিল তার জীবনের আরেকটা মোড়।
কারণ সে প্রথমবার স্বীকার করল -

সে শুধু একা নয়, সে একা থাকতে চায়ও না।
আকাশ এখনো একই মানুষ।

ব্যবসায়ী।
দায়িত্বশীল।
সমাজের জন্য কাজ করা একজন মানুষ।

কিন্তু এখন তার ভেতরে একটা দরজা কাঁপতে শুরু করেছে।
যেটা এতদিন বন্ধ ছিল।
হয়তো সেই দরজা একদিন খুলবে।
হয়তো খুলবে না।

কিন্তু সে এখন অন্তত জানে -
দরজাটা আছে।


(চলবে - তৃতীয় পর্বে আকাশ নিজের অতীত, নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের ভেতরের দেয়ালের মুখোমুখি হবে…)

বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

মুখোশের অন্তরালে.... কলমে- সুবর্ণা দাশ

 


বধির হয়ে গেলো উমা। কী অপরাধ ছিল উমার! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। কারো কোনো কথায় সাড়া দেয় না। ঘুম নেই, খাওয়া নেই, দিনরাত যেন এক হয়ে আছে। পাড়ার মানুষ কানাঘুষা করে বলে, মেয়েটা মনে হয় পাগল  হয়ে গেলো। সুন্দর জীবনটা একদম শেষ করে দিলো লম্পট বরটা। 

উপলকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো উমা। উপলের ভালো মানুষের অন্তরালে যে, এত নিষ্ঠুর মন, এত খারাপ! মুখোশ পরা একজন মানুষ। উমার ভালোবাসায় কোনো খামতি ছিল না। হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছিল। দিনের পর দিন উপল উমাকে ঠকিয়েছে। উমা মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। রূপে গুনে অনন্যা উমা। বাবার ও ছিলো অঢেল সম্পত্তি। সম্পত্তির লোভে উপল উমাকে ভালোবাসার মিথ্যে নাটকে ফাঁসিয়েছে।

উমা সহজ সরল মেয়ে। উমার বাবা মারা যাওয়ার পরে উপলের কুৎসিত মুখ আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। যখন প্রথম সন্তান সম্ভবা হলো, তখন উপল নানা অজুহাতে সন্তান নষ্ট করার জন্য চাপ দিতে থাকে উমাকে। এতে উমা খুব কষ্ট পায়। অনেক অনুনয় বিনয় করেও এ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত করতে পারলো না উপলকে। নার্সিংহোমে যেদিন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উমার মাতৃ জঠর থেকে তার বুকের ধন বের করে নিচ্ছে ডাক্তার, উপল তখন হাসিতে মত্ত বাইরে দাঁড়িয়ে। 

এক একটি খোঁচায় যেন প্রাণ বেরিয়ে আস্তে চায় উমার। দুচোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে ডাক্তার বলে, আপনি নিজে থেকে কী এবরশন করতে চান না?তাহলে কেন করছেন এই নিষ্পাপ জীবনটাকে হত্যা? কিছু বলে না উমা চুপ থাকে। ডাক্তার যখন পরিষ্কার করা ঐ জিনিসটা দেখায় উমাকে, ধক্ করে উঠে উমার বুক। যেন হৃদপিণ্ডটা এক মুহুর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল! উপল আসলো উমার কাছে। একটু হেসে উমাকে বলে, ভেবো না এসব কিছু না। সব ঠিক হয়ে যাবে। উপলের এই নির্মমতা দেখে উমা আরো কষ্ট পেলো। পেটে একটু হাত বুলিয়ে দেখে উমা। না আর নেই আমার অস্তিত্বের মধ্যে বেড়ে উঠা জীবনটা, শেষ হয়ে গেলো। 

এর কিছু দিন পর উপল উমাকে বলে, উমার বাবার সম্পত্তি উপলের নামে লিখে দিতে। স্তব্ধ হয়ে গেল উমা। কি বলছে এসব উপল! ভালোবাসার কাছে হার মানে উমা। বাবার সম্পত্তি লিখে দিলো উপলের নামে। কী সর্বনাশ করলো উমা তখনো জানেনা। হঠাৎ একদিন উপল বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর বাড়ি ফিরলো না। কোনো খবরও দিলো না। ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বলছে বার বার। ভেঙ্গে পড়ে উমা। দিন যায়, মাস যায় উপলের খোঁজ আর পেলো না উমা। কি করবে বুঝতে না পেরে লোকাল থানায় জানায় উপলের কথা। থানায় একটা হারানো ডায়েরি করে। উপলের ছবি দিয়ে আসে। 

রাত প্রায় দশটা বাজে লোকাল থানা থেকে ফোন আসে উমার কাছে। উমা খুশিতে থানায় যায়। থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে একি শুনলো উমা! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পরেরদিন সকালে খবরের কাগজে বড় বড় করে উপরের পাতায় লেখা, প্রতারক রোমেল পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে। 

বিভিন্ন নামে মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের সম্পত্তি নিজের নামে করে তারপর চম্পট দেয়। ছদ্মনামে উপল হয়ে শহরের কোটিপতির মেয়ে উমাকে বিয়ে করে তার সম্পত্তি নিজের করে নিয়ে আত্মসাৎ করার চেষ্টা। এই খবর চোখে পড়তেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে উমা। সেই থেকে আজ অবধি উমা নিষ্প্রাণ অপলক হয়ে কঙ্কালসার হয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছে। না জেনে না বুঝে, যে সর্বনাশ উমা করলো, তার তীব্র যন্ত্রনার দায় বয়ে বেড়াচ্ছে আজও। এ

ই সমাজের আশেপাশে এমন অসংখ্য উপল ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভালো মানুষের মুখোশের অন্তরালে থাকে এক কুৎসিত মুখ।


সুবর্ণা দাশ


শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

নিরব ঘামের গল্প... - আকাশ আহমেদ




ভোর এখনো পুরোপুরি জাগেনি। 

আকাশের পূর্বদিকে হালকা লালচে রেখা, যেন সূর্য উঠবার আগে পৃথিবী একটু লজ্জা পেয়ে থেমে আছে। ঠিক সেই সময়েই উঠে পড়ে রামু। তার অ্যালার্ম লাগে না- অভ্যাসই তাকে জাগিয়ে তোলে। পাশে মাটির মেঝেতে শুয়ে আছে তার দুই সন্তান, আর কোণে অর্ধেক ভাঙা খাটে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে আছে তার স্ত্রী সীতা।

রামু নিঃশব্দে উঠে বসে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ঘরের দিকে- এই ছোট্ট, টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরটাই তার সব। তারপর ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। মুখে পানি দেয়, একটা পুরনো গামছা দিয়ে মুখ মুছে নেয়। 

আজও একটা নতুন দিন- কিন্তু তার কাছে প্রতিটা দিনই যেন একই।

রামু একজন নির্মাণ শ্রমিক। 
শহরের বড় বড় দালানগুলো যেগুলো দেখে মানুষ বিস্মিত হয়, সেগুলোর ভেতরে তার মতো অসংখ্য মানুষের ঘাম মিশে থাকে। কিন্তু সেই ঘামের গল্প কেউ জানতে চায় না।

সকাল ছয়টার আগেই তাকে বের হতে হয়। আজও হলো তার ব্যতিক্রম নয়। সীতা আধো ঘুমের মধ্যে উঠে পড়ে, হাতে গরম চা ধরিয়ে দেয়।

“আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো,”  আস্তে করে বলে সে।

রামু শুধু মাথা নাড়ে। সে জানে- এই কথার ভেতরে কত আশা লুকিয়ে আছে, আর সেই আশা পূরণ করতে না পারার কষ্টও সে জানে।

কাজের জায়গায় পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। ভাঙা রাস্তা, ঠাসা বাস, ঠেলাঠেলি- সবকিছু পেরিয়ে যখন সে নির্মাণস্থলে পৌঁছায়, তখন সূর্য পুরোপুরি উঠে গেছে।

সাইটে ঢুকেই শুরু হয় কাজ। ইট তোলা, বালি টানা, সিমেন্ট মেশানো- কোনো কাজই সহজ নয়। মাথার ওপর রোদের তাপ, শরীরে ঘাম, পায়ে ক্লান্তি- সবকিছু মিলিয়ে দিনটা যেন একটা দীর্ঘ যুদ্ধ।

রামু কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে থেমে যায়। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল দালানটার দিকে তাকায়। ভাবতে থাকে- একদিন এই দালানে হয়তো বড় বড় মানুষ থাকবে, এয়ারকন্ডিশনের ঠান্ডা হাওয়ায় বসে থাকবে। কিন্তু সে? সে তো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে, রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে।

দুপুরে একটু বিরতি মেলে। একটা শুকনো রুটি আর আলুর তরকারি খায়। পাশে বসে থাকা আরেক শ্রমিক, গোপাল, হঠাৎ বলে ওঠে -

“ভাই, এত কষ্ট করি, তবুও কিছুই বদলায় না কেন?”

রামু একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে -

“আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না, ভাই। আমরা শুধু কাজ করি, আর বাকিরা ফল ভোগ করে।”

দুপুরের পর আবার শুরু হয় কাজ। শরীর তখন আর সায় দিতে চায় না, কিন্তু থামার উপায় নেই। দিন শেষে মজুরি না পেলে ঘরে খাবার উঠবে না।

বিকেলের দিকে হঠাৎ একটা ছোট দুর্ঘটনা ঘটে। একজন শ্রমিক পা পিছলে পড়ে যায়। সবাই ছুটে আসে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার সবাই কাজে ফিরে যায়। কারণ এখানে থামার সুযোগ নেই। কষ্ট, ব্যথা- সবকিছু চাপা দিয়ে কাজ করে যেতে হয়।

রামু এই দৃশ্য দেখে ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। ভাবে- যদি একদিন তার সাথেও এমন কিছু ঘটে? তার পরিবার তখন কী করবে? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।

দিন শেষে যখন কাজ শেষ হয়, তখন শরীর যেন আর নিজের থাকে না। তবুও সে হাঁটে- ধীরে ধীরে, ক্লান্ত পায়ে বাড়ির দিকে।

বাড়ি পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। ঘরে ঢুকতেই দুই সন্তান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। এই মুহূর্তটাই তার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

বাবা, তুমি আজ কী এনেছো?” ছোট ছেলেটা জিজ্ঞেস করে।

রামু হাসে। পকেট থেকে একটা ছোট বিস্কুটের প্যাকেট বের করে দেয়। ছেলেটার মুখে হাসি ফুটে ওঠে-এই ছোট্ট হাসিই তার দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

রাতের খাবার খেতে বসে সীতা জিজ্ঞেস করে -

“আজ কত পেলেন?”
রামু একটু থেমে বলে -
“আজ পুরোটা দেয়নি… বলেছে কাল দেবে।”

সীতার মুখটা একটু ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু সে কিছু বলে না। কারণ সে জানে- এই কথাগুলো বলার মধ্যেই রামুর কতটা অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে।

রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রামু একা বসে থাকে। বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে, কিন্তু তার ভেতরে যেন অন্ধকার।

সে ভাবে -
তারও তো স্বপ্ন ছিল। ছোটবেলায় পড়াশোনা করবে, ভালো একটা কাজ করবে। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে সেই স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

আজ সে শুধু একজন শ্রমিক- যার নাম নেই, পরিচয় নেই, আছে শুধু পরিশ্রম।

কিন্তু তবুও, তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে। প্রতিদিন নতুন করে শুরু করার শক্তি। নিজের কষ্ট ভুলে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর শক্তি।

সে জানে - তার গল্প কেউ লিখবে না। তার কষ্ট কেউ বুঝবে না। কিন্তু তবুও সে থামে না।

কারণ সে জানে -
তার থেমে যাওয়া মানেই তার পরিবারের থেমে যাওয়া।

রাত গভীর হয়। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার।
কাল আবার ভোর হবে, আবার শুরু হবে সেই একই লড়াই।
কিন্তু সেই লড়াইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার ভালোবাসা, দায়িত্ব আর বেঁচে থাকার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

এই হলো একজন মেহনতি শ্রমিকের না বলা গল্প -
যেখানে কষ্ট আছে, বঞ্চনা আছে, তবুও আছে অদম্য জীবনের জেদ।
আর হয়তো একদিন,
এই নীরব ঘামের গল্পগুলোই বদলে দেবে পৃথিবীর ভাষা।

ঠাণ্ডা জলের গল্প... - মারিয়াম রামলা

 


সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে যে কত কাজ করে! রান্না করা থেকে শুরু করে ঘর ঝাড়ু দেওয়া, মোছা আর বাসন মাজা—সবই তার একার হাতে। মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের আবদার মেটাতেও হয়—"আন্টি এটা করে দাও, ওটা করে দাও।" কিন্তু এত কিছুর পরেও তার মুখে ক্লান্তির কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। শরীর থাকলে ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক, কিন্তু অন্যকে সেই ক্লান্তির আঁচ বুঝতে না দেওয়াটাই বড় কথা।

অথচ ভুলেও যদি কোনো কাজ বাকি থেকে যায়, তবে মালকিনের হাজারটা কথা মুখ বুজে সইতে হয়। বুক ফাটা কষ্ট চেপে তখন কাজ করে যেতে হয়। মন খারাপ হলে কাজেও আর মন বসে না।

গরম পড়ার পর থেকেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সবার তৃষ্ণা মেটাতে ফ্রিজে জলের বোতল ভর্তি করে রাখার দায়িত্বও তার ওপর। তারও তো অধিকার আছে মাঝেমধ্যে সেই ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠাণ্ডা জল বের করে নিজের গলা ভেজানোর। কিন্তু কখনও সময় সুযোগ দেয় না, আবার কখনও ফ্রিজ তাকে সেই অবসর দেয় না। ফ্রিজ খালি হতে না হতেই বাচ্চা থেকে বুড়ো—সবার হুকুম আসে, "জলদি জলজল ভরো।" আর বোতলগুলো ভর্তি করার কিছুক্ষণ পর দেখা যায় সব ফাঁকা। সম্ভবত, ঠাণ্ডা জলের তৃষ্ণাটা একটু বেশিই তীব্র হয়।

সকালে এসে ফ্রিজের সব বোতল ভরার পর সে যখন রান্নাঘরে গেল, মালকিন তাকে একগাদা নির্দেশ দিলেন। বাড়িতে অতিথি আসবে, তাই রান্নাবান্না একটু বেশিই করতে হবে। অনেক সবজি কাটা আর অনেকটা আটা মাখার কাজ বাকি। সেও সব ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একদিকে চুলায় দুধ ফুটতে দিয়ে সে আটা মাখতে শুরু করল। কিন্তু একদিকে প্রচণ্ড গরম, তার ওপর চুলার আঁচ—সব মিলিয়ে তীব্র গরমে বারবার তেষ্টা পাচ্ছিল তার। রান্নাঘরে নেই কোনো পাখা, নেই কুলার বা এসি। এই প্রচণ্ড গরম সহ্য করা বড় কঠিন।

অনেকক্ষণ সহ্য করার পর কিছুটা স্বস্তির আশায় সে যখন ফ্রিজের দিকে পা বাড়াল যে এক বোতল ঠাণ্ডা জল খাবে, তখন দেখল—এ কী! এত অল্প সময়ে পুরো ফ্রিজ খালি!

“আমার তৃষ্ণার বেলাতেই কেন সব বোতল খালি হয়ে যায়, পোড়া কপাল!” বিরক্তি নিয়ে মনে মনে এটুকু বলেই সে সাধারণ জল খেয়ে আবার বোতলগুলো ভরতে লাগল।

দুপুরে যখন অতিথিরা এলেন, মালকিন বললেন অতিথিদের জন্য শরবত বানাতে। কিন্তু ফ্রিজ খুলে দেখল বাচ্চারা ততক্ষণে সব বোতল খালি করে ফেলেছে। অগত্যা সে ফ্রাইজার থেকে বরফ বের করে রুহ-আফজা তৈরি করে অতিথিদের পরিবেশন করল।

এরপর তার মনে হলো দুপুরের খাবারের জন্যও ঠাণ্ডা জল লাগবে। তাই তড়িঘড়ি করে সে ফ্রিজের সব বোতল ভরে দুটো বোতল ডিপ-ফ্রিজে রেখে দিল, যাতে খাবারের সময় জলটা ঠিকঠাক ঠাণ্ডা হয়।

সবাই বেশ তৃপ্তি করে দুপুরের খাবার খেল এবং ঠাণ্ডা জলের কোনো অভাব হলো না। কিন্তু সেই মেয়েটি এক ঢোক ঠাণ্ডা জলের জন্য তৃষ্ণার্তই রয়ে গেল। সবার সামনে ফ্রিজ থেকে জল বের করে খাওয়ার সাহস তার নেই। আর যদি বোতল নিয়ে রান্নাঘরে যায়, তবে মালকিনের বকুনি খাওয়ার ভয়—"এদিকে বাচ্চারা জলের জন্য কষ্ট পাচ্ছে, আর ওদিকে কাজের মেয়ে নিজের গলা ভেজাচ্ছে!"

অতিথিদের মধ্যে দশ-বারো বছরের একটি ছেলে তাকে কাজ করতে দেখছিল। ছেলেটির মা নেই, সে তার কাকা-কাকিমার সঙ্গে অতিথি হয়ে এসেছিল।

সবার খাওয়া শেষ হওয়ার পর সেই মেয়েটি যখন ঘামে ভেজা শরীরে রান্নাঘরে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ছেলেটি ফ্রিজ থেকে একটি ঠাণ্ডা জলের বোতল নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। বোতলটি তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল— 
"আন্টি, জলটা খেয়ে নিন। আর বারান্দায় গিয়ে ফ্যানের নিচে একটু বিশ্রাম নিন।"

মুহূর্তেই কাজ করা মেয়েটির মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল এবং তার দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল।


মারিয়াম রামলা


আবেগের পরিণতি... কলমে- সুবর্ণা দাশ

 


ত্বন্নী ও তনয় দুজনকে দুজন খুবই ভালোবাসতো। 
পড়াশোনায়ও দুজন তুখোড়। এম, বি, এ'র ছাত্র-ছাত্রী দুজন। রোজ দুজন দেখা করতো সময় মতো। এমন একদিনও ছিলো না দুজন দেখা না করে থেকেছে। কিন্তু পৃথিবীর অমোঘ নিষ্ঠুর নিয়মের কাছে হার মানতে হয় সবাইকে। 

জন্ম নিলে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী কিন্তু অপমৃত্যু বা সময়ের আগে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেওয়া কেইবা সহ্য করতে পারে! তনয় বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবার কাছে তনয় আবদার করে একটা ভালো থেকে বাইক কিনে দেবার জন্য। মা-বাবাও ভাবলো একটা বাইকের খুব দরকার। কাছে পিঠে কোথাও যেতে বাইকের প্রয়োজন হয়। তাই বাবাও তনয়ের কথা মতো ভালো দেখে একটা বাইক কিনে দিলো। সেই বাইক যে কাল হবে কে জানতো। কে জানতো মৃত্যুর ফাঁদ পেতে বসে আছে ঐ বাইক। 

প্রথম যেদিন বাইক নিয়ে তনয় বের হয়, বাড়ির কিছু দূর যেতে না যেতেই রাস্তায় গাছের সাথে ধাক্কা লেগে বাইক থেকে ছিটকে পড়ে স্পট ডেথ। নিথর দেহ পড়ে আছে রাস্তার উপর। সাধের বাইক পড়ে আছে রাস্তার ধারে। লোকজন জড়ো হয়ে তনয়ের নিথর দেহ খানা তুলে হসপিটাল নিয়ে গেল। ডাক্তার দেখে বলে, দেহে প্রাণ নেই। তনয় নেই পৃথিবীতে, কি করে জানাবে তনয়ের মা-বাবাকে? নিষ্ঠুর সত্য জানাতেই হবে তাই অগত্যা তনয়ের মা-বাবাকে খবর দেওয়া হলো। ত্বন্নীর কাছেও খবর গেল। আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো তনয়ের মা-বাবা ও আত্মীয় স্বজনদের কান্নায়। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য! ত্বন্নীর মুখে কোনো কথা নেই। নির্বাক তাকিয়ে আছে তনয়ের দেহর দিকে। 

রোগা হয়ে গেছে ত্বন্নী। সবাই অনেক চেষ্টা করলো একটু কাঁদুক বা মুখে কিছু একটা বলুক। কিন্তু না চুপ হয়ে গেল ত্বন্নী। বুকের ভেতর দুমড়ে মুষড়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে হৃদয়। আর সহ্য করতে পারছে না ত্বন্নী। কী করবে তনয়কে ছাড়া ত্বন্নী? ওরা যে কথা দিয়েছিলো একজনকে ছাড়া একজন বাঁচতে পারবে না। 

ত্বন্নীর মা-বাবা পাহারায় রেখেছে ত্বন্নীকে। আদর করে বুকে ধরে রাখে ত্বন্নীর মা। মুখে কিছু তোলে না, কিছু বলেও না। মহা চিন্তায় পড়ে গেল ত্বন্নীর মা-বাবা। ত্বন্নী যে তনয়কে প্রচন্ড ভালোবাসতো। 

রাতে শোয়ার সময় ত্বন্নীর মা ত্বন্নীর সাথে শোয়। না ঘুমতে ঘুমতে ত্বন্নীর মাও বড় ক্লান্ত। একদিন রাতে ত্বন্নীর মা চোখ লেগে এলো ঘুমে হঠাৎ চোখ মেলে দেখে ত্বন্নীর দেহ পাখার সাথে ঝুলছে। চিৎকার করে ওঠে ত্বন্নীর মা। একি সর্বনাশ করলি মা! পাশের ঘর থেকে ত্বন্নীর বাবা ছুটে আসে। মেয়ের এই অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে, দিশা হারিয়ে বুক চাপড়াতে থাকে। প্রেমের আবেগে উদাসীন হয়ে যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যুকে শেষ পরিণতি হিসেবে বেছে নিলো ত্বন্নী। হয়তো 

ত্বন্নী মনে প্রাণে বিশ্বাস করে ওদের অমর প্রেমের পরিণয় মৃত্যু।


সুবর্ণা দাশ


পরার্থের আকাশ... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস


আমি সর্বানী। একদম সাদামাটা বাঙালি ঘরের বউ। লোভ বলতে একটু ভালোবাসা। স্নেহ মায়া মমতায় শাশুড়ি মাকে নিয়ে দেওর ননদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে, দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সুখী গৃহকোণ বলতে পারো।

নীরবে নিভৃতে প্রচার না করে সেবামূলক কাজে নিজেকে সঁপে দেওয়াটাই এখন জীবনের আদর্শ। মান আর হুঁশ বজায় রাখতে মানুষ রূপ নিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখতে আমার এই চুপিসারে কিছু গল্প কথা। জীবনের। তাই মাঝে মাঝেই ছুটে যাই একটা ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্রে । শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, যেন অন্য এক পৃথিবী। গাছ-গাছালির তলে এক এক অন্য জগৎ। এখানে সময় ধীরে চলে— মানুষের ভাঙা মনগুলো  থমকে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। আমি সপ্তাহে একটা দিন ওখানে যাওয়ার চেষ্টা করি। ওদের সাথে কয়েক ঘন্টা থাকার অনুভূতিতে, বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী লাভ করতে যাই। বড় গেট খুলে যখন ঢুকি, ওদের মধ্যে একটা হুল্লোড় লেগে যায়। হুল্লোড় লাগে আমার মনেও। ওরা হেসে ওঠে। চিৎকার করে বলে ওঠে আন্টি এসেছে আন্টি এসেছে।

আমি ওদের পাশে বসি, শুনি ওদের কথা , কখনো চুপ করে থাকি, অবাক হই। কখনো  বা হয়তো বাকরুদ্ধ।কারণ সব গল্প বলার জন্য শব্দ লাগে না।

সেদিনও গিয়েছিলাম।
ওরা চারজন পাশে বসেছিল—দীপশিখা , ঝুম্পা , ছন্দা  আর নীলাঞ্জনা।

দীপশিখা,নামের মতোই তার চোখের উজ্জ্বলতা, কথা বলতে পারে না।অন্ধকার জীবনের জ্বলন্ত আগুন। বয়স উনিশ কি কুড়ি। প্রচুর পরিশ্রম করেও মুখে একগাল হাসি। ক্লান্তি নেই চাহিদা নেই, শুধু ভালোবাসার কাঙাল। ওর জীবনটা অন্ধকার থেকে আজ হোমের আলোয় অনেকটাই সুস্থ।
 
আমি যখন প্রথম ওকে দেখি, ও কারও চোখের দিকে তাকাতো না। নিজের হাতটা শক্ত করে চেপে রাখতো, যেন ভেতরের ভয়টা বেরিয়ে না আসে।

আমি ধীরে বলেছিলাম,
— “দীপশিখা কেমন আছো?”
ও উত্তর দেয়নি। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

দিনের পর দিন আমি শুধু ওর পাশে বসে থেকেছি। কোনো প্রশ্ন করিনি।
একদিন হঠাৎ ও ইশারায় বললো,
— “দিদি, আকাশ কি সব সময় একই থাকে?”

প্রথম জীবনের মানসিক অত্যাচার আজ ওকে আতঙ্কে ভোগায়।

 আমি ওর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম— “না রে, আকাশ বদলায়… কিন্তু হারিয়ে যায় না।”
ও আস্তে বলেছিল,
— “তাহলে আমিও কি বদলাতে পারবো?”
সেদিন বুঝলাম—ওর ভেতরে প্রশ্ন আছে মানে আলো এখনও নিভে যায়নি।


ঝুম্পা ওর হাসিটা অদ্ভুত—হাসে, সবসময় হাসে,কিন্তু ওর হাসি চোখে পৌঁছায় না।
প্রথমদিনেই এসে আমার হাত ধরে বলেছিল,
— “তুমি আবার আসবে তো?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
— “আসবো।”
ও বলেছিল,
— “সবাই বলে আসবো … তারপর আর আসে না।”

 ছটফটে মেয়ে দেখলেই বোঝা যায়, আজ দাঁড়ালেই হাত পা থরথর করে কাঁপে,
 মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ জ্ঞান থাকে না। চিকিৎসা চলছে। মাঝে মাঝেই মানসিক ভারসাম্য হারায়। হাসতে হাসতে হঠাৎ গোমরা হয়ে যায়। কলকাতার নামকরা এক মানসিক হসপিটালে চিকিৎসা চলছে।

ঝুম্পার  জীবনে বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিল । ওর বাচ্চাটাকে ওর থেকে এখন দূরে একটা অনাথ আশ্রমে রাখা আছে। মাঝে মাঝেই মাকে ফোন করে, কথা বলে।

ও হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, আবার হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠে।
একদিন আমি ওকে বললাম,
— “চল একটা খেলা খেলি ?”
ও বললো,
— “আমি খেলবো আন্টি?
খেললে কি সব ঠিক হয়ে যাবে ?”
আমি বললাম,
— “না, কিন্তু  আমরা নতুন করে শুরু করতে তো পারি।”

সেদিন আমরা একটা গল্প গল্প খেলা বানালাম—একটা মেয়ের, যে ধীরে ধীরে নিজের ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া লাগাচ্ছে।

 ও বললো ,
— “ওই মেয়েটা আমি হতে পারি?”
আমি বলেছিলাম,
— “তুই তো ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছিস রে ।”

নীলাঞ্জনা -

কথা কম বলে, কিন্তু চোখে একটা ক্লান্তি—যেন অনেক দূর হেঁটে এসেছে। ওর অনেক খিদে, মনে হয় যেন কতকাল খায়নি। ওর কাছে বসলেই আগে দুটো হাতের গন্ধ শুঁকে, কি রান্না করেছে জানতে চাইত। অভাবের সংসারে খাওয়া হতো না বোঝাই যায়। ওর তখন সবে এগারো,  কিশোরীর গঠন শরীর জুড়ে। বাবা আমাদের বটগাছ, বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল। আর ওর ভীতি আতঙ্ক। একদিন রাতে মদ্যপ বাপ ভয় দেখিয়ে প্রথম ধর্ষণ। রক্তে ভিজে গিয়েছিল ছেঁড়া শতরঞ্জি। বাবা ছাড়েনি। আঁচড়ে কামড়ে খুবলে খেত। পিশাচ রূপ বাবার। শুধু কি তাই, রাতে ২০০টাকা নিয়ে ঘরে লোক ঢোকাত। ছোট্ট ভাই অসুস্থ মা রোজ দেখেছে, মেয়ের গায়ে সিগারেটের পোড়া ফোস্কা। নরক ও এর থেকে ভালো। ওর কষ্ট সহ্য করা যায় না। গলায় পাকিয়ে ওঠে।

আমি ওর পাশে বসে একদিন বললাম,
— “তুই কি করতে ভালোবাসিস?”
ও একটু ভেবে বললো,
— “গান... নাচ …”
আমি বললাম,
— “গাবি?”
প্রথমে না করেছিল, তারপরে গান গাইলো, নাচ দেখালো।

তারপর খুব আস্তে একটা সুর তুললো।
সুরটা নিখুঁত ছিল না, কিন্তু তাতে একটা সত্যতা ছিল—যা সরাসরি হৃদয়ে লাগে।
গান শেষ হলে ও মাথা নিচু করে বললো,
— “খারাপ না?”
আমি বললাম,
— “না রে, এটা তো তোর বেঁচে থাকার শব্দ।”
সেদিন প্রথম ও একটু হেসেছিল।
তারপরে আমি গেলেই দৌড়ে এসে গলা জড়ায়।

আর ছন্দা , ওকে প্রথম যখন দেখি, ও মেঝেতে বসে ছিল। হাতের ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল—হামাগুড়ি দিয়ে।আমাকে দেখেই থেমে গেলো। তারপর হঠাৎ একরাশ আলো যেন মুখে ছড়িয়ে পড়লো।ও কিছু বলতে পারে না।

কিন্তু চোখ দিয়ে, হাসি দিয়ে—সব বলে দেয়।
আমি কাছে যেতেই ও হাত বাড়িয়ে দিলো।
আমি হাত ধরতেই ও তালি দিতে লাগলো—একটা ছন্দে, একটা সুরে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— “তুই গান করছিস?”
ও মাথা নেড়ে হাসলো।
তারপর আমি আস্তে আস্তে গাইতে শুরু করলাম।
ও তালি দিয়ে সুর মেলাতে লাগলো।
সেদিন আমি বুঝলাম—কথা না থাকলেও সঙ্গীত থামে না, ছন্দ থামে না।

দিন গড়াল।
আমি দেখলাম ছন্দা আজ শুধু হামাগুড়ি দেয় না।
ও দেওয়াল ধরে  দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
প্রথমে টলমল করতো।
বারবার পড়ে যেতো।
কিন্তু আবার উঠতো।

একদিন আমি গেলাম—দেখি, ও ওয়াকার নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে।
আমাকে দেখেই হাসলো—একটা বড়, উজ্জ্বল হাসি।
আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল।
ও তালি দিলো—সেই একই সুরে।
আমি গাইলাম—ও সঙ্গ দিলো।

আমরা দুজন মিলে একটা গান বানালাম—কথা ছাড়া, শুধু অনুভূতির। ছন্দা আমার কবিতা, আমার ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষ।

আমি যখন ওদের সঙ্গে বসি,
ওরা যেমন খুশি হয়, আমি খুশি হই তার থেকে বেশি।আমি কোনো উদ্ধারকর্তা নই। আমি শুধু একজন মানুষ, যে আর একজন মানুষের পাশে বসে, আর একজন মানুষের গল্প শোনে।

ওদের গল্পে কষ্ট আছে, ভাঙন আছে—কিন্তু তার মধ্যেও আছে বেঁচে থাকার জেদ। ভালো থাকার তীব্র চেষ্টা।

আমরা অনেক সময় ভাবি—সহানুভূতি মানে দুঃখ পাওয়া।
কিন্তু আসল সহানুভূতি হলো—কারো হাত ধরা, যখন সে নিজে দাঁড়াতে পারছে না।
পরার্থের পদার্থ মানে শুধু দান নয়—
এটা হলো সময় দেওয়া, মন দেওয়া, উপস্থিত থাকা।
ওরা এখন মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে।
 এখন নতুন গল্প বানায়।

 গান গায়—আর সেই গানে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা খুঁজে পায়।
সে হাঁটে।
সে হাসে।
সে কথা না বলেও পৃথিবীকে গান শোনায়।
আমি জানি, ওদের পথ এখনও কঠিন।
সব ক্ষত একদিনে ভরে যায় না।
কিন্তু আমি এটাও জানি—

একটা মানুষ যদি আরেকটা মানুষের পাশে দাঁড়ায়,
তাহলে অন্ধকার একেবারে জিততে পারে না।
ফিরে আসার সময় ওরা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি হাত নাড়িয়ে বলি—“আবার আসবো।”
এবার তারা বিশ্বাস করে।

কারণ আমি শুধু কথা দিইনি, আমি থেকেছি।
পরার্থের আকাশ হয়ে 
অন্যের জীবনে একটু আলো  দিয়ে আমিও ভালো থাকতে চাই।

মহেন্দ্রর প্রতি এক নারী... - মারিয়াম রামলা

 

মারিয়াম রামলা

মহেন্দ্র, 

হয়তো বিষণ্ণতা সত্যিই আমার কপালে লেখা ছিল। কখনও কখনও মনে হয়, নিজের সুখগুলোকে আমি নিজের হাতেই বিসর্জন দিয়েছি। কিন্তু তুমি? তুমি অন্তত তোমার স্ত্রীকে একটু সময় দাও—যে নারী তার পুরো জীবনটা তোমার ছায়ার নিচে কাটিয়ে দিল।

কখনও তাকে সোজাসাপ্টা জিজ্ঞেস করেছ—
“তোমার হাতে ব্যথা করছে? এসো, আমি একটু টিপে দিই...।”

এখন তোমার বয়স হয়েছে, কিন্তু ভেবে দেখো, তোমার স্ত্রী আজও অটল পাহাড়ের মতো তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিন যন্ত্রের মতো মোবাইলে ডুবে না থেকে, অন্তত একবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো— “পিঠে কি খুব ব্যথা করছে? এই শীতে তোমার কি ঠান্ডা লাগছে?”

বিশ্বাস করো মহেন্দ্র, প্রতিটি স্ত্রী তার স্বামীর কাছে পাহাড়প্রমাণ কিছু চায় না। সে শুধু চায় একটু সময়, দুটি মিষ্টি কথা আর সামান্য মায়ার পরশ। তুমি সত্যিই ভাগ্যবান যে তোমার স্ত্রী তোমার পাশে আছে। অনেক নারী আছে যাদের এই সৌভাগ্যটুকুও নেই—কারও স্বামী থেকেও পাশে নেই, আর কারও তো স্বামীই নেই।

শুধু মা-বাবার সেবা করাই কি জীবনের একমাত্র ধর্ম? স্ত্রীরও তো তার স্বামীর সঙ্গ পাওয়ার অধিকার আছে। পুরুষেরা চাইলে যেকোনো সময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু নারীরা যাবে কোথায়? কার কাছে উগরে দেবে মনের জমে থাকা সব কষ্ট? সব স্ত্রী তার যন্ত্রণা মুখে বলতে পারে না মহেন্দ্র, পুরুষকে তা চোখের ভাষা দেখে বুঝে নিতে হয়।

দিনভর ক্লান্তি কি শুধু স্বামীরই হয়? ঘরের ঘানি টানা স্ত্রীর শরীর কি ক্লান্ত হয় না? আমি মাঝে মাঝে ভাবি—একদিন যদি আমার পাশে কেউ না থাকে, তবে আমার খবর কে নেবে? রাতে যখন কাঁধের ব্যথায় কুঁকড়ে যাবো, তখন কাকে বলবো— “একটু টিপে দাও না গো...?” হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কি যথেষ্ট নয়, যে শরীরের এই তীব্র যন্ত্রণাটাও আজীবন একাই সইতে হবে?

একবার ভেবে দেখো মহেন্দ্র, সেসব নারীদের কথা—যাদের স্বামী যৌবনেই পাড়ি দিয়েছে পরপারে, কিংবা যাদের সাজানো সংসার মাঝপথে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তারা বাইরে থেকে হাসলেও ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে মরে। তাদের এই নিঃসীম নিঃসঙ্গতা কেউ দেখে না।

নারী শক্ত হতে পারে, কিন্তু সে তো আর পাথর নয়! তারও প্রয়োজন হয় ভরসা করার মতো একটা কাঁধের, একটু স্নেহভরা স্পর্শের। জীবনের এই দীর্ঘ পথ একা হাঁটা বড় কঠিন মহেন্দ্র—পাশে ভালোবাসার কেউ থাকলে দুর্গম পথটাও বড় সহজ মনে হয়।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি ( ১ম পর্ব) লেখক- আকাশ আহমেদ



(১ম পর্ব)
নীরব এক শুরুর গল্প...

মানুষের জীবন সবসময় শব্দে ভরা থাকে না। কিছু জীবন আছে, যেগুলো বাইরে থেকে স্বাভাবিক, সফল, এমনকি প্রশংসনীয়- কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। সেই ভাঙার শব্দ কেউ শোনে না, কারণ সেটা কেবল হৃদয়ের ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হয়।

আকাশের জীবন ঠিক তেমনই।

ছোটবেলা থেকেই আকাশ ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত। পাড়ার ছেলেরা যখন হৈচৈ করত, ক্রিকেট খেলত, ঝগড়া করত, তখন আকাশ হয়তো কোনো এক কোণে বসে বইয়ের পাতা উল্টাত, অথবা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার ভেতরে একটা আলাদা জগত ছিল- যেখানে শব্দ কম, ভাবনা বেশি।

তার মা প্রায়ই চিন্তিত হয়ে বলতেন,
“এই ছেলে এত চুপচাপ কেন? কারও সাথে মিশতে চায় না কেন?”
আকাশ কোনো উত্তর দিত না। সে নিজেও জানত না কেন সে এমন।

স্কুলজীবন তার কেটে গেল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততায়। সে ভালো ছাত্র ছিল, শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করতেন, সহপাঠীরা তাকে সম্মান করত- কিন্তু কেউ তার খুব কাছের ছিল না। বন্ধুত্ব যেন তার জীবনে কখনো গভীরভাবে প্রবেশ করতে পারেনি।

আর প্রেম?

সেটা তো তার জীবনে কোনোদিন আসেইনি।
যখন তার বন্ধুরা প্রেমে পড়তে শুরু করল, চিঠি লিখল, লুকিয়ে দেখা করল- আকাশ দূর থেকে সব দেখেছে। কিন্তু তার মনে কখনো তেমন কোনো অনুভূতি জাগেনি।

না, সে পাথর ছিল না।
কিন্তু সে নিজের অনুভূতিগুলোকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি।
হয়তো সে ভয় পেত।
হয়তো সে বুঝত না।
হয়তো সে নিজেকে সেই জায়গায় কল্পনাই করতে পারত না।

সময় পেরিয়ে গেল।
জীবনের বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়াল।

অনেকে চাকরি নিল, কেউ বিদেশে গেল, কেউ সংসার গড়ল।
আকাশ অন্য পথ বেছে নিল।
সে নিজের একটি ট্রেড ব্যবসা শুরু করল।

শুরুর সময়টা ছিল কঠিন। পুঁজি কম, অভিজ্ঞতা কম, মানুষের বিশ্বাস কম- সব মিলিয়ে তাকে প্রতিটা পদক্ষেপে লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু আকাশের একটা জিনিস ছিল- ধৈর্য।

সে চুপচাপ কাজ করে গেছে।
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত- সে নিজের ব্যবসাকে দাঁড় করিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য সংগ্রহ, আবার বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ- ধীরে ধীরে তার কাজের পরিধি বাড়তে লাগল।

মানুষ তাকে চিনতে শুরু করল।
তার ফোন ব্যস্ত থাকতে শুরু করল।
তার নামের সাথে “বিশ্বাসযোগ্য” শব্দটা জুড়ে গেল।
কিন্তু জীবনের এই সাফল্যের মাঝেও একটা জিনিস একই রয়ে গেল -
তার ব্যক্তিগত শূন্যতা।

আকাশের জীবনে কোনো প্রেম নেই।
কোনো সম্পর্ক নেই।
কোনো বিশেষ মানুষ নেই, যে তার জন্য অপেক্ষা করে।
দিন শেষে যখন সে বাড়ি ফেরে, তখন তার জন্য কেউ দরজা খুলে দেয় না।
কেউ বলে না- “আজ এত দেরি কেন?”
কেউ তার ক্লান্ত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করে না- “তুমি ঠিক আছো তো?”
তার ঘরটা পরিপাটি, কিন্তু নির্জন।

একটা টেবিল, কিছু বই, একটা ল্যাম্প, আর একটা জানালা- যেখান দিয়ে সন্ধ্যার আলো ঢোকে। সেই আলোয় বসে আকাশ মাঝে মাঝে নিজের সাথে কথা বলে।

একদিন রাতে সে ডায়েরি খুলল।
অনেকদিন পর।
কলম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর লিখল-
“আমি জানি না আমি কী হারিয়েছি। কিন্তু আমি অনুভব করি- আমার ভেতরে কিছু একটা নেই। এমন কিছু, যা অন্যদের আছে।”

সে থেমে গেল।

এই কথাটা লিখে সে নিজেই অবাক হলো।
কারণ সে প্রথমবার নিজের শূন্যতাকে স্বীকার করল।

পরদিন আবার তার ব্যস্ত জীবন শুরু হলো।
কিন্তু এবার তার ভেতরে একটা প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।

“আমি কি সত্যিই সম্পূর্ণ?”

এই প্রশ্নটা তাকে তাড়া করতে লাগল।
কাজের মাঝে, মানুষের সাথে কথা বলার মাঝে, একা থাকার সময়- সবসময় এই প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরতে থাকে।

সে উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে।
কিন্তু কোনো উত্তর পায় না।

একদিন সে সামাজিক কাজের জন্য একটি বস্তিতে গেল।
সে আগে থেকেই কিছু সামাজিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিল। গরিবদের সাহায্য করা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো- এই কাজগুলো সে করে।

সেদিন তারা খাবার বিতরণ করছিল।
মানুষের ভিড়, বাচ্চাদের হাসি, হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষ- এইসবের মাঝে আকাশ নিজেকে ব্যস্ত রাখল।

হঠাৎ তার চোখে একটা দৃশ্য ধরা পড়ল।
একজন মা তার ছোট ছেলেটাকে কোলে বসিয়ে খাওয়াচ্ছে।
খাবার খুব সামান্য।

কিন্তু মায়ের চোখে যে মমতা, সেটা অমূল্য।
ছেলেটা হাসছে, মায়ের গলায় জড়িয়ে ধরছে।

আকাশ স্থির হয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটা দেখল।
তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অচেনা অনুভূতি জাগল।
সে বুঝতে পারল না এটা কী।
কিন্তু সে জানল- সে এই অনুভূতিটা আগে কখনো পায়নি।

সেই রাতে সে আবার লিখল -
“আজ আমি ভালোবাসা দেখলাম। খুব কাছ থেকে। কিন্তু আমি সেটা অনুভব করতে পারলাম না। আমি শুধু দেখলাম। আমি একজন দর্শক- নিজের জীবনেরও, অন্যের জীবনেরও।”

তার হাত কাঁপছিল।
কিন্তু সে লিখে গেল।

দিনগুলো আবার চলতে লাগল।
কিন্তু এখন আকাশ বদলাতে শুরু করেছে।

সে মানুষের দিকে তাকায়।
তাদের হাসি, তাদের কথা, তাদের সম্পর্ক- সবকিছু সে খেয়াল করে।
সে বুঝতে শুরু করেছে- ভালোবাসা শুধু একটা অনুভূতি নয়, এটা একটা সংযোগ।
আর সেই সংযোগ তার জীবনে নেই।

একদিন রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল।
আকাশ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃষ্টির শব্দ, ঠান্ডা বাতাস- সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা।
সে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল।

নিজেকে দেখে তার মনে হলো- এই মানুষটাকে সে চেনে না।
সে ধীরে ধীরে বলল- 
“আমি কে?”
প্রশ্নটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।
কোনো উত্তর এল না।

সে আবার ডায়েরি খুলল।

এইবার সে লিখল- 
“আমার জীবনে কোনো প্রেম নেই। কোনো স্মৃতি নেই, যেখানে কারও হাত ধরেছিলাম। কেউ আমাকে ভালোবেসে ডাকেনি, আমিও কাউকে ডাকি নি। আমি জানি না ভালোবাসা কেমন।”
“আমি শুধু জানি- আমি একা।”

সেই রাতটা ছিল তার জীবনের এক মোড়।
কারণ সেই রাতে সে প্রথমবার নিজের একাকীত্বকে পুরোপুরি অনুভব করল।

আকাশ এখনো একই মানুষ।
ব্যবসায়ী।
সামাজিকভাবে সক্রিয়।
মানুষের কাছে সম্মানিত।
কিন্তু তার ভেতরে এখন একটা যাত্রা শুরু হয়েছে-
নিজেকে খুঁজে পাওয়ার যাত্রা।


(লেখা চলমান থাকবে, ২য় পর্ব  খুব শীঘ্রই প্রকাশ পাবে...)

সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস  সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার - সর্বানী দাস  লাশ হয়ে যাইনি এখনো মা'গো,  আমি এখনো ছটফট করছি ব্যথায়- ভাঙা হাড়ের টুকরোগুলো  বিঁধছে ...

জনপ্রিয় পোস্ট