শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (তৃতীয় পর্ব) লেখক - আকাশ আহমেদ

 




ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি
লেখক - আকাশ আহমেদ

তৃতীয় পর্ব: (ভেতরের দেয়াল)

মানুষের জীবনে কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর বাইরে কোথাও পাওয়া যায় না। যতই মানুষ, কাজ, ব্যস্ততা কিংবা সাফল্যের ভিড়ে নিজেকে ঢেকে রাখা হোক না কেন - একসময় সেই প্রশ্নগুলো ফিরে আসে।

আর তখন মানুষকে নিজের সামনেই দাঁড়াতে হয়।
আকাশ এখন সেই সময়টার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আগে সে ব্যস্ত থাকত।
এখনো থাকে।

কিন্তু পার্থক্য হলো - আগে ব্যস্ততা তাকে ভাবতে দিত না, এখন ব্যস্ততার মাঝেও সে ভাবতে থাকে।
ফোনে কথা বলছে, কিন্তু ভেতরে অন্য চিন্তা।
হিসাব করছে, কিন্তু মাথার ভেতর অন্য প্রশ্ন।
রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফিরছে, কিন্তু ঘুম আসছে না।
তার মনে হচ্ছে - সে যেন এতদিন একটা যন্ত্রের মতো বেঁচে ছিল।
সব দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছে, কিন্তু নিজের ভেতরটাকে কখনো দেখেনি।

সেদিন রাতেও ঘুম আসছিল না।
জানালার বাইরে শহরের আলো ঝাপসা হয়ে আছে। দূরে কোথাও গাড়ির শব্দ, কোথাও মানুষের হাসি।
আকাশ চুপচাপ বসে ছিল।
তার সামনে খোলা ডায়েরি।
কিন্তু আজ সে লিখতে পারছিল না।
কারণ আজ তার ভেতরে শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছে -

“আমি এমন কেন ?”

সে নিজের অতীতের কথা ভাবতে শুরু করল।
ছোটবেলার সেই চুপচাপ ছেলেটা।
যে নিজের কথা কাউকে বলত না।
যে সবসময় দূরত্ব বজায় রাখত।
যে কখনো কাউকে খুব কাছে আসতে দেয়নি।
হয়তো সেখান থেকেই শুরু।

তার মনে পড়ল স্কুলজীবনের একটা ঘটনা।
তখন সে নবম শ্রেণিতে পড়ে।
ক্লাসের এক ছেলে তাকে বলেছিল -

“তুই এত চুপচাপ থাকিস কেন? তোর কি কোনো অনুভূতি নেই ?”

সবাই হেসেছিল।
আকাশও হালকা হেসেছিল।
কিন্তু সেদিন রাতে সে অনেক ভেবেছিল।

তার কি সত্যিই অনুভূতি কম ?
নাকি সে শুধু প্রকাশ করতে পারে না ?

ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করল - সে সবসময় নিজেকে আটকে রেখেছে।
কারও কাছে দুর্বল হতে চায়নি।
কারও সামনে নিজের শূন্যতা প্রকাশ করতে চায়নি।
সে সবসময় শক্ত থাকার অভিনয় করেছে।
আর সেই অভিনয় করতে করতেই একসময় সত্যিকারের অনুভূতিগুলোও হারিয়ে ফেলেছে।
একদিন বিকেলে তার এক পুরোনো বন্ধু দেখা করতে এলো।
অনেক বছর পর।
বন্ধুর কোলে ছোট্ট মেয়ে।
মেয়েটা বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আছে।
বন্ধু হেসে বলল -

“দেখ, এটা আমার পৃথিবী।”

আকাশ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা ব্যথা অনুভব করল।
বন্ধু বলল -

“তোর কী খবর ? বিয়ে করবি না ?”

আকাশ হালকা হেসে বলল -

“সময় হয়নি।”

বন্ধু মজা করে বলল -

“সময় না ইচ্ছা ?”

আকাশ কোনো উত্তর দিল না।
কারণ সে জানে -সমস্যাটা সময় নয়।
সমস্যাটা সে নিজে।
বন্ধু চলে যাওয়ার পর সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল - সে যেন জীবনের একটা বড় অংশ মিস করে ফেলেছে।

কিন্তু সেটা কী ?
প্রেম ?
সম্পর্ক ?
নাকি শুধু কারও কাছে নিজের মতো করে বাঁচার অনুভূতি ?

সেই রাতে সে ডায়েরিতে লিখল -

“আমি বুঝতে পারছি, আমি শুধু ভালোবাসা পাইনি তা নয় - আমি কখনো ভালোবাসার জন্য নিজেকে প্রস্তুতও করিনি।”
“আমি সবসময় নিজেকে কাজের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছি।”
“হয়তো আমি ভয় পেতাম।”

ভয়।
এই শব্দটা তার মাথায় ঘুরতে লাগল।

সে কি সত্যিই ভয় পেত ?

হ্যাঁ।
সে ভয় পেত প্রত্যাখ্যানকে।
ভয় পেত দুর্বল হয়ে পড়তে।
ভয় পেত নিজের ভেতরের শূন্যতা কাউকে দেখাতে।
তাই সে সহজ পথ বেছে নিয়েছিল -
দূরে থাকা।
কিন্তু আজ সেই দূরত্বই তাকে গ্রাস করছে।

পরদিন সকালে সে ব্যবসার কাজে বাইরে বেরিয়েছিল।
রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে থামল।
চা খেতে খেতে চারপাশে তাকাচ্ছিল।
একটা মধ্যবিত্ত পরিবার পাশে বসেছিল।
স্বামী, স্ত্রী আর ছোট্ট ছেলে।
তারা খুব সাধারণভাবে কথা বলছিল।
হাসছিল।
ছোট ছোট বিষয় নিয়ে।

কিন্তু সেই দৃশ্যটা দেখে আকাশের মনে হলো - এই সাধারণ জিনিসগুলোই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

যেগুলো তার নেই।
চায়ের কাপ হাতে নিয়েই সে হঠাৎ অনুভব করল - তার ভেতরের দেয়ালটা খুব উঁচু হয়ে গেছে।
এত উঁচু, যে এখন সে নিজেও সেই দেয়ালের ওপারে যেতে পারছে না।
দিনের পর দিন সে নিজের ভেতরে ডুবে যেতে লাগল।
এখন সে রাতে আর শুধু ডায়েরি লেখে না।
সে নিজের সাথে তর্ক করে।
নিজেকে প্রশ্ন করে।

“আমি যদি কাউকে জীবনে আসতে দিতাম, তাহলে কি আজ সবকিছু অন্যরকম হতো?”
“আমি কি সত্যিই একা থাকতে চাই?”
“নাকি আমি শুধু একা থাকতে শিখে গেছি?”

একদিন গভীর রাতে সে হঠাৎ ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট খুলল।
অসংখ্য নাম।
ব্যবসার লোক।
কর্মচারী।
সামাজিক কাজের মানুষ।
বন্ধু।
পরিচিত।
কিন্তু এমন একজনও নেই, যাকে রাত তিনটায় ফোন করে সে বলতে পারে -

“আমার খুব খারাপ লাগছে।”

এই উপলব্ধিটা তাকে ভেঙে দিল।
সেই রাতে সে অনেকদিন পর কাঁদল।
খুব নিঃশব্দে।
কারও সামনে নয়।
নিজের সামনে।

পরদিন সকালে আয়নায় নিজের চোখ দেখে সে বুঝতে পারল - সে বদলাচ্ছে।
এই বদলটা বাইরে থেকে দেখা যায় না।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে আগের মানুষটা নেই।
এখন সে বুঝতে পারছে -
মানুষ শুধু দায়িত্ব নিয়ে বাঁচতে পারে না।
শুধু সফলতা নিয়েও না।
মানুষের ভেতরে একটা জায়গা থাকে, যেখানে অনুভূতি দরকার হয়।
কারও উপস্থিতি দরকার হয়।
কারও কাছে নিজের মতো করে দুর্বল হওয়ার জায়গা দরকার হয়।
কিন্তু আকাশের জীবনে এখনো কেউ নেই।
কোনো প্রেম নেই।
কোনো বিশেষ মানুষ নেই।
শুধু একটা দীর্ঘ নীরবতা।

তবুও, এই প্রথমবার সে নিজের দেয়ালটাকে দেখতে পাচ্ছে।
এতদিন সে ভাবত - সে ঠিক আছে।
এখন সে জানে - সে অসম্পূর্ণ।
সেই রাতে ডায়েরির পাতায় সে লিখল -

“আমি জানি না আমার জীবনে কোনোদিন ভালোবাসা আসবে কিনা।”
“কিন্তু আজ আমি প্রথমবার বুঝলাম - আমি ভালোবাসাহীন হয়ে জন্মাইনি।”
“আমি নিজেই ধীরে ধীরে নিজের হৃদয়টাকে বন্ধ করে ফেলেছি।”
“আর এখন সেই বন্ধ দরজার ভেতর আমি নিজেই বন্দী।”

বাইরে তখন গভীর রাত।
শহর প্রায় ঘুমিয়ে গেছে।
কিন্তু আকাশের ভেতরে এক অদ্ভুত জাগরণ শুরু হয়েছে।


চলবে ...

(চতুর্থ পর্বে আকাশ জীবনের এক গভীর একাকীত্বের মুখোমুখি হবে, যেখানে সে বুঝতে শুরু করবে - সবচেয়ে ভয়ংকর নীরবতা মানুষের ভেতরেই বাস করে…)

৭টি মন্তব্য:

নামহীন বলেছেন...

ক্রমশঃ প্রকাশঃ

Jahidul Islam ostur বলেছেন...

চমৎকার লিখেছেন প্রিয় কবি।

Sarbani Das বলেছেন...

ভীষণ সুন্দর লেখা 🙏🏻
নীরবতা একাকিত্ব ভেঙে উজ্জ্বল দিনের শুভকামনা রইলো প্ৰিয় লেখকের তরে। 🙏🏻

আকাশ আহমেদ AKASH AHMED বলেছেন...

উৎসাহ দেবার জন্য আন্তরিক ধন্যাবাদ

আকাশ আহমেদ AKASH AHMED বলেছেন...

যারা ভালবেসে আমার লেখা গল্প টি পড়েছেন তাদের সকল কেই আন্তরিক ধন্যাবাদ 🌹

Tania Ahmed বলেছেন...

চমৎকার লেখা, হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে, পরবর্তী পর্ব পড়ার অপেক্ষায় রইলাম ♥️

SKY BRAND বলেছেন...

. আপনার কলমে সাহিত্য যেন নতুন প্রাণ খুঁজে পায়। অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা রইলো।

সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস  সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার - সর্বানী দাস  লাশ হয়ে যাইনি এখনো মা'গো,  আমি এখনো ছটফট করছি ব্যথায়- ভাঙা হাড়ের টুকরোগুলো  বিঁধছে ...

জনপ্রিয় পোস্ট