![]() |
| সর্বানী দাস |
আমি সর্বানী। একদম সাদামাটা বাঙালি ঘরের বউ। লোভ বলতে একটু ভালোবাসা। স্নেহ মায়া মমতায় শাশুড়ি মাকে নিয়ে দেওর ননদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে, দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সুখী গৃহকোণ বলতে পারো।
নীরবে নিভৃতে প্রচার না করে সেবামূলক কাজে নিজেকে সঁপে দেওয়াটাই এখন জীবনের আদর্শ। মান আর হুঁশ বজায় রাখতে মানুষ রূপ নিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখতে আমার এই চুপিসারে কিছু গল্প কথা। জীবনের। তাই মাঝে মাঝেই ছুটে যাই একটা ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্রে । শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, যেন অন্য এক পৃথিবী। গাছ-গাছালির তলে এক এক অন্য জগৎ। এখানে সময় ধীরে চলে— মানুষের ভাঙা মনগুলো থমকে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। আমি সপ্তাহে একটা দিন ওখানে যাওয়ার চেষ্টা করি। ওদের সাথে কয়েক ঘন্টা থাকার অনুভূতিতে, বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী লাভ করতে যাই। বড় গেট খুলে যখন ঢুকি, ওদের মধ্যে একটা হুল্লোড় লেগে যায়। হুল্লোড় লাগে আমার মনেও। ওরা হেসে ওঠে। চিৎকার করে বলে ওঠে আন্টি এসেছে আন্টি এসেছে।
আমি ওদের পাশে বসি, শুনি ওদের কথা , কখনো চুপ করে থাকি, অবাক হই। কখনো বা হয়তো বাকরুদ্ধ।কারণ সব গল্প বলার জন্য শব্দ লাগে না।
সেদিনও গিয়েছিলাম।
ওরা চারজন পাশে বসেছিল—দীপশিখা , ঝুম্পা , ছন্দা আর নীলাঞ্জনা।
দীপশিখা,নামের মতোই তার চোখের উজ্জ্বলতা, কথা বলতে পারে না।অন্ধকার জীবনের জ্বলন্ত আগুন। বয়স উনিশ কি কুড়ি। প্রচুর পরিশ্রম করেও মুখে একগাল হাসি। ক্লান্তি নেই চাহিদা নেই, শুধু ভালোবাসার কাঙাল। ওর জীবনটা অন্ধকার থেকে আজ হোমের আলোয় অনেকটাই সুস্থ।
আমি যখন প্রথম ওকে দেখি, ও কারও চোখের দিকে তাকাতো না। নিজের হাতটা শক্ত করে চেপে রাখতো, যেন ভেতরের ভয়টা বেরিয়ে না আসে।
আমি ধীরে বলেছিলাম,
— “দীপশিখা কেমন আছো?”
ও উত্তর দেয়নি। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
দিনের পর দিন আমি শুধু ওর পাশে বসে থেকেছি। কোনো প্রশ্ন করিনি।
একদিন হঠাৎ ও ইশারায় বললো,
— “দিদি, আকাশ কি সব সময় একই থাকে?”
প্রথম জীবনের মানসিক অত্যাচার আজ ওকে আতঙ্কে ভোগায়।
আমি ওর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম— “না রে, আকাশ বদলায়… কিন্তু হারিয়ে যায় না।”
ও আস্তে বলেছিল,
— “তাহলে আমিও কি বদলাতে পারবো?”
সেদিন বুঝলাম—ওর ভেতরে প্রশ্ন আছে মানে আলো এখনও নিভে যায়নি।
ঝুম্পা ওর হাসিটা অদ্ভুত—হাসে, সবসময় হাসে,কিন্তু ওর হাসি চোখে পৌঁছায় না।
প্রথমদিনেই এসে আমার হাত ধরে বলেছিল,
— “তুমি আবার আসবে তো?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
— “আসবো।”
ও বলেছিল,
— “সবাই বলে আসবো … তারপর আর আসে না।”
ছটফটে মেয়ে দেখলেই বোঝা যায়, আজ দাঁড়ালেই হাত পা থরথর করে কাঁপে,
মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ জ্ঞান থাকে না। চিকিৎসা চলছে। মাঝে মাঝেই মানসিক ভারসাম্য হারায়। হাসতে হাসতে হঠাৎ গোমরা হয়ে যায়। কলকাতার নামকরা এক মানসিক হসপিটালে চিকিৎসা চলছে।
ঝুম্পার জীবনে বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিল । ওর বাচ্চাটাকে ওর থেকে এখন দূরে একটা অনাথ আশ্রমে রাখা আছে। মাঝে মাঝেই মাকে ফোন করে, কথা বলে।
ও হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, আবার হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠে।
একদিন আমি ওকে বললাম,
— “চল একটা খেলা খেলি ?”
ও বললো,
— “আমি খেলবো আন্টি?
খেললে কি সব ঠিক হয়ে যাবে ?”
আমি বললাম,
— “না, কিন্তু আমরা নতুন করে শুরু করতে তো পারি।”
সেদিন আমরা একটা গল্প গল্প খেলা বানালাম—একটা মেয়ের, যে ধীরে ধীরে নিজের ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া লাগাচ্ছে।
ও বললো ,
— “ওই মেয়েটা আমি হতে পারি?”
আমি বলেছিলাম,
— “তুই তো ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছিস রে ।”
নীলাঞ্জনা -
কথা কম বলে, কিন্তু চোখে একটা ক্লান্তি—যেন অনেক দূর হেঁটে এসেছে। ওর অনেক খিদে, মনে হয় যেন কতকাল খায়নি। ওর কাছে বসলেই আগে দুটো হাতের গন্ধ শুঁকে, কি রান্না করেছে জানতে চাইত। অভাবের সংসারে খাওয়া হতো না বোঝাই যায়। ওর তখন সবে এগারো, কিশোরীর গঠন শরীর জুড়ে। বাবা আমাদের বটগাছ, বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল। আর ওর ভীতি আতঙ্ক। একদিন রাতে মদ্যপ বাপ ভয় দেখিয়ে প্রথম ধর্ষণ। রক্তে ভিজে গিয়েছিল ছেঁড়া শতরঞ্জি। বাবা ছাড়েনি। আঁচড়ে কামড়ে খুবলে খেত। পিশাচ রূপ বাবার। শুধু কি তাই, রাতে ২০০টাকা নিয়ে ঘরে লোক ঢোকাত। ছোট্ট ভাই অসুস্থ মা রোজ দেখেছে, মেয়ের গায়ে সিগারেটের পোড়া ফোস্কা। নরক ও এর থেকে ভালো। ওর কষ্ট সহ্য করা যায় না। গলায় পাকিয়ে ওঠে।
আমি ওর পাশে বসে একদিন বললাম,
— “তুই কি করতে ভালোবাসিস?”
ও একটু ভেবে বললো,
— “গান... নাচ …”
আমি বললাম,
— “গাবি?”
প্রথমে না করেছিল, তারপরে গান গাইলো, নাচ দেখালো।
তারপর খুব আস্তে একটা সুর তুললো।
সুরটা নিখুঁত ছিল না, কিন্তু তাতে একটা সত্যতা ছিল—যা সরাসরি হৃদয়ে লাগে।
গান শেষ হলে ও মাথা নিচু করে বললো,
— “খারাপ না?”
আমি বললাম,
— “না রে, এটা তো তোর বেঁচে থাকার শব্দ।”
সেদিন প্রথম ও একটু হেসেছিল।
তারপরে আমি গেলেই দৌড়ে এসে গলা জড়ায়।
আর ছন্দা , ওকে প্রথম যখন দেখি, ও মেঝেতে বসে ছিল। হাতের ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল—হামাগুড়ি দিয়ে।আমাকে দেখেই থেমে গেলো। তারপর হঠাৎ একরাশ আলো যেন মুখে ছড়িয়ে পড়লো।ও কিছু বলতে পারে না।
কিন্তু চোখ দিয়ে, হাসি দিয়ে—সব বলে দেয়।
আমি কাছে যেতেই ও হাত বাড়িয়ে দিলো।
আমি হাত ধরতেই ও তালি দিতে লাগলো—একটা ছন্দে, একটা সুরে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— “তুই গান করছিস?”
ও মাথা নেড়ে হাসলো।
তারপর আমি আস্তে আস্তে গাইতে শুরু করলাম।
ও তালি দিয়ে সুর মেলাতে লাগলো।
সেদিন আমি বুঝলাম—কথা না থাকলেও সঙ্গীত থামে না, ছন্দ থামে না।
দিন গড়াল।
আমি দেখলাম ছন্দা আজ শুধু হামাগুড়ি দেয় না।
ও দেওয়াল ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
প্রথমে টলমল করতো।
বারবার পড়ে যেতো।
কিন্তু আবার উঠতো।
একদিন আমি গেলাম—দেখি, ও ওয়াকার নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে।
আমাকে দেখেই হাসলো—একটা বড়, উজ্জ্বল হাসি।
আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল।
ও তালি দিলো—সেই একই সুরে।
আমি গাইলাম—ও সঙ্গ দিলো।
আমরা দুজন মিলে একটা গান বানালাম—কথা ছাড়া, শুধু অনুভূতির। ছন্দা আমার কবিতা, আমার ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষ।
আমি যখন ওদের সঙ্গে বসি,
ওরা যেমন খুশি হয়, আমি খুশি হই তার থেকে বেশি।আমি কোনো উদ্ধারকর্তা নই। আমি শুধু একজন মানুষ, যে আর একজন মানুষের পাশে বসে, আর একজন মানুষের গল্প শোনে।
ওদের গল্পে কষ্ট আছে, ভাঙন আছে—কিন্তু তার মধ্যেও আছে বেঁচে থাকার জেদ। ভালো থাকার তীব্র চেষ্টা।
আমরা অনেক সময় ভাবি—সহানুভূতি মানে দুঃখ পাওয়া।
কিন্তু আসল সহানুভূতি হলো—কারো হাত ধরা, যখন সে নিজে দাঁড়াতে পারছে না।
পরার্থের পদার্থ মানে শুধু দান নয়—
এটা হলো সময় দেওয়া, মন দেওয়া, উপস্থিত থাকা।
ওরা এখন মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে।
এখন নতুন গল্প বানায়।
গান গায়—আর সেই গানে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা খুঁজে পায়।
সে হাঁটে।
সে হাসে।
সে কথা না বলেও পৃথিবীকে গান শোনায়।
আমি জানি, ওদের পথ এখনও কঠিন।
সব ক্ষত একদিনে ভরে যায় না।
কিন্তু আমি এটাও জানি—
একটা মানুষ যদি আরেকটা মানুষের পাশে দাঁড়ায়,
তাহলে অন্ধকার একেবারে জিততে পারে না।
ফিরে আসার সময় ওরা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি হাত নাড়িয়ে বলি—“আবার আসবো।”
এবার তারা বিশ্বাস করে।
কারণ আমি শুধু কথা দিইনি, আমি থেকেছি।
পরার্থের আকাশ হয়ে
অন্যের জীবনে একটু আলো দিয়ে আমিও ভালো থাকতে চাই।




