শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

পরার্থের আকাশ... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস


আমি সর্বানী। একদম সাদামাটা বাঙালি ঘরের বউ। লোভ বলতে একটু ভালোবাসা। স্নেহ মায়া মমতায় শাশুড়ি মাকে নিয়ে দেওর ননদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে, দুই সন্তান ও স্বামীকে নিয়ে সুখী গৃহকোণ বলতে পারো।

নীরবে নিভৃতে প্রচার না করে সেবামূলক কাজে নিজেকে সঁপে দেওয়াটাই এখন জীবনের আদর্শ। মান আর হুঁশ বজায় রাখতে মানুষ রূপ নিয়ে নিজেকে আয়নায় দেখতে আমার এই চুপিসারে কিছু গল্প কথা। জীবনের। তাই মাঝে মাঝেই ছুটে যাই একটা ছোট্ট আশ্রয়কেন্দ্রে । শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, যেন অন্য এক পৃথিবী। গাছ-গাছালির তলে এক এক অন্য জগৎ। এখানে সময় ধীরে চলে— মানুষের ভাঙা মনগুলো  থমকে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। আমি সপ্তাহে একটা দিন ওখানে যাওয়ার চেষ্টা করি। ওদের সাথে কয়েক ঘন্টা থাকার অনুভূতিতে, বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী লাভ করতে যাই। বড় গেট খুলে যখন ঢুকি, ওদের মধ্যে একটা হুল্লোড় লেগে যায়। হুল্লোড় লাগে আমার মনেও। ওরা হেসে ওঠে। চিৎকার করে বলে ওঠে আন্টি এসেছে আন্টি এসেছে।

আমি ওদের পাশে বসি, শুনি ওদের কথা , কখনো চুপ করে থাকি, অবাক হই। কখনো  বা হয়তো বাকরুদ্ধ।কারণ সব গল্প বলার জন্য শব্দ লাগে না।

সেদিনও গিয়েছিলাম।
ওরা চারজন পাশে বসেছিল—দীপশিখা , ঝুম্পা , ছন্দা  আর নীলাঞ্জনা।

দীপশিখা,নামের মতোই তার চোখের উজ্জ্বলতা, কথা বলতে পারে না।অন্ধকার জীবনের জ্বলন্ত আগুন। বয়স উনিশ কি কুড়ি। প্রচুর পরিশ্রম করেও মুখে একগাল হাসি। ক্লান্তি নেই চাহিদা নেই, শুধু ভালোবাসার কাঙাল। ওর জীবনটা অন্ধকার থেকে আজ হোমের আলোয় অনেকটাই সুস্থ।
 
আমি যখন প্রথম ওকে দেখি, ও কারও চোখের দিকে তাকাতো না। নিজের হাতটা শক্ত করে চেপে রাখতো, যেন ভেতরের ভয়টা বেরিয়ে না আসে।

আমি ধীরে বলেছিলাম,
— “দীপশিখা কেমন আছো?”
ও উত্তর দেয়নি। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

দিনের পর দিন আমি শুধু ওর পাশে বসে থেকেছি। কোনো প্রশ্ন করিনি।
একদিন হঠাৎ ও ইশারায় বললো,
— “দিদি, আকাশ কি সব সময় একই থাকে?”

প্রথম জীবনের মানসিক অত্যাচার আজ ওকে আতঙ্কে ভোগায়।

 আমি ওর প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম— “না রে, আকাশ বদলায়… কিন্তু হারিয়ে যায় না।”
ও আস্তে বলেছিল,
— “তাহলে আমিও কি বদলাতে পারবো?”
সেদিন বুঝলাম—ওর ভেতরে প্রশ্ন আছে মানে আলো এখনও নিভে যায়নি।


ঝুম্পা ওর হাসিটা অদ্ভুত—হাসে, সবসময় হাসে,কিন্তু ওর হাসি চোখে পৌঁছায় না।
প্রথমদিনেই এসে আমার হাত ধরে বলেছিল,
— “তুমি আবার আসবে তো?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
— “আসবো।”
ও বলেছিল,
— “সবাই বলে আসবো … তারপর আর আসে না।”

 ছটফটে মেয়ে দেখলেই বোঝা যায়, আজ দাঁড়ালেই হাত পা থরথর করে কাঁপে,
 মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ জ্ঞান থাকে না। চিকিৎসা চলছে। মাঝে মাঝেই মানসিক ভারসাম্য হারায়। হাসতে হাসতে হঠাৎ গোমরা হয়ে যায়। কলকাতার নামকরা এক মানসিক হসপিটালে চিকিৎসা চলছে।

ঝুম্পার  জীবনে বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছিল । ওর বাচ্চাটাকে ওর থেকে এখন দূরে একটা অনাথ আশ্রমে রাখা আছে। মাঝে মাঝেই মাকে ফোন করে, কথা বলে।

ও হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, আবার হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠে।
একদিন আমি ওকে বললাম,
— “চল একটা খেলা খেলি ?”
ও বললো,
— “আমি খেলবো আন্টি?
খেললে কি সব ঠিক হয়ে যাবে ?”
আমি বললাম,
— “না, কিন্তু  আমরা নতুন করে শুরু করতে তো পারি।”

সেদিন আমরা একটা গল্প গল্প খেলা বানালাম—একটা মেয়ের, যে ধীরে ধীরে নিজের ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া লাগাচ্ছে।

 ও বললো ,
— “ওই মেয়েটা আমি হতে পারি?”
আমি বলেছিলাম,
— “তুই তো ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছিস রে ।”

নীলাঞ্জনা -

কথা কম বলে, কিন্তু চোখে একটা ক্লান্তি—যেন অনেক দূর হেঁটে এসেছে। ওর অনেক খিদে, মনে হয় যেন কতকাল খায়নি। ওর কাছে বসলেই আগে দুটো হাতের গন্ধ শুঁকে, কি রান্না করেছে জানতে চাইত। অভাবের সংসারে খাওয়া হতো না বোঝাই যায়। ওর তখন সবে এগারো,  কিশোরীর গঠন শরীর জুড়ে। বাবা আমাদের বটগাছ, বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল। আর ওর ভীতি আতঙ্ক। একদিন রাতে মদ্যপ বাপ ভয় দেখিয়ে প্রথম ধর্ষণ। রক্তে ভিজে গিয়েছিল ছেঁড়া শতরঞ্জি। বাবা ছাড়েনি। আঁচড়ে কামড়ে খুবলে খেত। পিশাচ রূপ বাবার। শুধু কি তাই, রাতে ২০০টাকা নিয়ে ঘরে লোক ঢোকাত। ছোট্ট ভাই অসুস্থ মা রোজ দেখেছে, মেয়ের গায়ে সিগারেটের পোড়া ফোস্কা। নরক ও এর থেকে ভালো। ওর কষ্ট সহ্য করা যায় না। গলায় পাকিয়ে ওঠে।

আমি ওর পাশে বসে একদিন বললাম,
— “তুই কি করতে ভালোবাসিস?”
ও একটু ভেবে বললো,
— “গান... নাচ …”
আমি বললাম,
— “গাবি?”
প্রথমে না করেছিল, তারপরে গান গাইলো, নাচ দেখালো।

তারপর খুব আস্তে একটা সুর তুললো।
সুরটা নিখুঁত ছিল না, কিন্তু তাতে একটা সত্যতা ছিল—যা সরাসরি হৃদয়ে লাগে।
গান শেষ হলে ও মাথা নিচু করে বললো,
— “খারাপ না?”
আমি বললাম,
— “না রে, এটা তো তোর বেঁচে থাকার শব্দ।”
সেদিন প্রথম ও একটু হেসেছিল।
তারপরে আমি গেলেই দৌড়ে এসে গলা জড়ায়।

আর ছন্দা , ওকে প্রথম যখন দেখি, ও মেঝেতে বসে ছিল। হাতের ভর দিয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল—হামাগুড়ি দিয়ে।আমাকে দেখেই থেমে গেলো। তারপর হঠাৎ একরাশ আলো যেন মুখে ছড়িয়ে পড়লো।ও কিছু বলতে পারে না।

কিন্তু চোখ দিয়ে, হাসি দিয়ে—সব বলে দেয়।
আমি কাছে যেতেই ও হাত বাড়িয়ে দিলো।
আমি হাত ধরতেই ও তালি দিতে লাগলো—একটা ছন্দে, একটা সুরে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— “তুই গান করছিস?”
ও মাথা নেড়ে হাসলো।
তারপর আমি আস্তে আস্তে গাইতে শুরু করলাম।
ও তালি দিয়ে সুর মেলাতে লাগলো।
সেদিন আমি বুঝলাম—কথা না থাকলেও সঙ্গীত থামে না, ছন্দ থামে না।

দিন গড়াল।
আমি দেখলাম ছন্দা আজ শুধু হামাগুড়ি দেয় না।
ও দেওয়াল ধরে  দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
প্রথমে টলমল করতো।
বারবার পড়ে যেতো।
কিন্তু আবার উঠতো।

একদিন আমি গেলাম—দেখি, ও ওয়াকার নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে।
আমাকে দেখেই হাসলো—একটা বড়, উজ্জ্বল হাসি।
আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল।
ও তালি দিলো—সেই একই সুরে।
আমি গাইলাম—ও সঙ্গ দিলো।

আমরা দুজন মিলে একটা গান বানালাম—কথা ছাড়া, শুধু অনুভূতির। ছন্দা আমার কবিতা, আমার ভালোবাসা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানুষ।

আমি যখন ওদের সঙ্গে বসি,
ওরা যেমন খুশি হয়, আমি খুশি হই তার থেকে বেশি।আমি কোনো উদ্ধারকর্তা নই। আমি শুধু একজন মানুষ, যে আর একজন মানুষের পাশে বসে, আর একজন মানুষের গল্প শোনে।

ওদের গল্পে কষ্ট আছে, ভাঙন আছে—কিন্তু তার মধ্যেও আছে বেঁচে থাকার জেদ। ভালো থাকার তীব্র চেষ্টা।

আমরা অনেক সময় ভাবি—সহানুভূতি মানে দুঃখ পাওয়া।
কিন্তু আসল সহানুভূতি হলো—কারো হাত ধরা, যখন সে নিজে দাঁড়াতে পারছে না।
পরার্থের পদার্থ মানে শুধু দান নয়—
এটা হলো সময় দেওয়া, মন দেওয়া, উপস্থিত থাকা।
ওরা এখন মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে।
 এখন নতুন গল্প বানায়।

 গান গায়—আর সেই গানে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা খুঁজে পায়।
সে হাঁটে।
সে হাসে।
সে কথা না বলেও পৃথিবীকে গান শোনায়।
আমি জানি, ওদের পথ এখনও কঠিন।
সব ক্ষত একদিনে ভরে যায় না।
কিন্তু আমি এটাও জানি—

একটা মানুষ যদি আরেকটা মানুষের পাশে দাঁড়ায়,
তাহলে অন্ধকার একেবারে জিততে পারে না।
ফিরে আসার সময় ওরা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি হাত নাড়িয়ে বলি—“আবার আসবো।”
এবার তারা বিশ্বাস করে।

কারণ আমি শুধু কথা দিইনি, আমি থেকেছি।
পরার্থের আকাশ হয়ে 
অন্যের জীবনে একটু আলো  দিয়ে আমিও ভালো থাকতে চাই।

গ্লানি... - উজ্জ্বল কান্তি দাশ

 
উজ্জ্বল কান্তি দাশ



এখন এখানে শুধু দ্রৌপদীর 
বস্ত্র হরণ হয় না, 
তাকে ধর্ষণও করা হয়! 
দ্বাপরের ভূত এখনো
তাড়া করে ফিরছে, 
এযুগের দূর্যোধন দুঃশাসনদের! 
এখনো এখানে ভীষ্ম দ্রোণাচার্য 
কর্ণ বিকর্ণের মতো বিজ্ঞ জনেরা, মুখে কুলুপ আঁটে, 
নির্বাক থেকে দৃশ্য দেখে, 
ভয়! 
ভয় ওদের যদি ধৃতরাষ্ট্র রুষ্ট হন। 
ওদের শিরদাঁড়া বক্র হয়ে
ধৃতরাষ্ট্রের পদ লেহন করছে! 
এখনো এখানে ধৃতরাষ্ট্র 
নিজের লালিতদের অপরাধে
থাকেন অন্ধ। 
এখানে এখন কোনো ভীম নেই
যে প্রতিজ্ঞা নেবে প্রতিশোধের, 
প্রতিজ্ঞা নেবে দুঃশাসনের রক্তে স্নাত হবে দ্রোপদীর কেশ। 
এখানে এখন কোনো জনার্দন নেই যে, 
ধর্ম রক্ষার যুদ্ধ হবে, বাঁচার লড়াই হবে! 
পূর্ণিমার চাঁদে যেমন
জ্বলজ্বল করছে কালো দাগ, 
যে দাগ যেমন কোনো কিছুতে ঢাকার নয় মোছার নয়, 
তেমনি বিংশশতাব্দীতেও নারীর এই হাল, 
জ্বলজ্বল করে স্বাক্ষী দিচ্ছে, 
গ্লানি! 
এই গ্লানি এযুগের দ্রৌপদীর একার নয়, 
এই গ্লানি কোনো নারীর একার নয়, 
এ গ্লানি আমার, 
এ গ্লানি তোমার, 
এ গ্লানি সমস্ত জাতির।

হাড়ের সাক্ষ্য... - সেখ মঈনুল হক




"হাড়ের সাক্ষ্য"
(উড়িষ্যায় দিদির কঙ্কাল কাঁধে ভাই)
- সেখ মঈনুল হক 

আমি আজ প্রমাণ নিয়ে এসেছি —
কাগজ নয়,
হাড়ের ঠাণ্ডা শব্দে লেখা এক ইতিহাস।

তোমরা বলেছিলে —
“মৃত্যুর সনদ দাও !”
আমি বলিনি কিছু,
শুধু কবরের মাটি সরিয়ে
দিদির ঘুম ভেঙে এনেছি —
কাঁধে তুলে,
তোমাদের টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়েছি শূন্যতা।

দেখো —
এই যে পাঁজরের ফাঁকে বাতাস ঢোকে,
এই যে চোখের গর্তে জমে থাকা অন্ধকার —
এই কি যথেষ্ট নয় তোমাদের জন্য ?
নাকি তোমাদের নিয়মের চোখ
এখনও অন্ধই রয়ে গেছে ?

তোমরা সই চাও, সিল চাও,
আমি রক্তের দাগ দেখাই —
তোমরা বলো, “প্রসিডিউর !”
আমি বলি, “এটা মানুষ!”

কাগজের চেয়ে কি হাড় কম সত্যি ?
নাকি তোমাদের ব্যাংকের দরজায়
মানুষ ঢোকার আগে
তার মৃত্যু দু’বার প্রমাণ করতে হয় ?

আজ আমি শুধু ভাই নই —
আমি এক বিদ্রোহ,
যে কাঁধে করে বয়ে আনে
এই ব্যবস্থার লজ্জা।

এই কঙ্কাল —
শুধু আমার দিদি নয়,
এটা তোমাদের মানবিকতার মৃতদেহ,
যাকে তোমরাই কবর দিয়েছিলে
নিয়মের নামে।

শোনো —
আর কোনো কবর খোঁড়া হবে না!
আর কোনো ভাই
হাড় কাঁধে নিয়ে
দরজায় দরজায় ভিক্ষা করবে না!

আজ থেকে —
প্রমাণ চাইলে
আমরা কাগজ নয়,
তোমাদের বিবেক খুলে দেখাবো —
যদি তাতে এখনও
এক ফোঁটা মানুষ বেঁচে থাকে।

নিগড়িত অস্তিত্ব... কলমে: হাসিনা খাতুন

হাসিনা খাতুন



অতলান্ত কারারুদ্ধ আত্মা, পাষাণে বিঁধেছে ফণা,
মজ্জায় মজ্জায় বাজে আজ বিভীষিকাময় লাঞ্ছনা।
অবরুদ্ধ এ মনোভূমি— যেখানে স্বপ্নরা নির্বাসিত,
প্রতিটি নিশ্বাসে ঝরে পড়ে এক একটা মৃত অস্তিত্ব।

মরীচিকার পিছু ধাওয়া করা ক্লান্ত এক অভিসার,
অস্তরাগের রঙে মিশে আছে গাঢ় কালোর অন্ধকার।
শৃঙ্খলের প্রতিটি ঘর্ষণে জন্ম নেয় এক একটা বিলাপ,
বুকের পাঁজরে জমাট বাঁধে কালজয়ী এক পরিতাপ।

রক্তে ভেজা এই নিগড়, যা চেতনার গতি থামায়,
বিবেকের তীক্ষ্ণ নখরে বিদীর্ণ হয় সব মহিমায়।
তবুও কোনো এক সুদূর মহাকালে মুক্তির ইশারা,
ভেঙে যাবে এই জীর্ণ আড়াল, জাগবে এক নতুন ধারা।

শিকল তো কেবল লোহার নয়, শিকল হলো মায়া,
অন্ধকারে মিশে থাকে নিজেরই একাকী ছায়া।
যেদিন পুড়বে এই অহমিকা, চূর্ণ হবে সব রেশ,
সেদিন শুরু হবে অনন্ত এক মুক্তির নব উন্মেষ।

মহেন্দ্রর প্রতি এক নারী... - মারিয়াম রামলা

 

মারিয়াম রামলা

মহেন্দ্র, 

হয়তো বিষণ্ণতা সত্যিই আমার কপালে লেখা ছিল। কখনও কখনও মনে হয়, নিজের সুখগুলোকে আমি নিজের হাতেই বিসর্জন দিয়েছি। কিন্তু তুমি? তুমি অন্তত তোমার স্ত্রীকে একটু সময় দাও—যে নারী তার পুরো জীবনটা তোমার ছায়ার নিচে কাটিয়ে দিল।

কখনও তাকে সোজাসাপ্টা জিজ্ঞেস করেছ—
“তোমার হাতে ব্যথা করছে? এসো, আমি একটু টিপে দিই...।”

এখন তোমার বয়স হয়েছে, কিন্তু ভেবে দেখো, তোমার স্ত্রী আজও অটল পাহাড়ের মতো তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সারাদিন যন্ত্রের মতো মোবাইলে ডুবে না থেকে, অন্তত একবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো— “পিঠে কি খুব ব্যথা করছে? এই শীতে তোমার কি ঠান্ডা লাগছে?”

বিশ্বাস করো মহেন্দ্র, প্রতিটি স্ত্রী তার স্বামীর কাছে পাহাড়প্রমাণ কিছু চায় না। সে শুধু চায় একটু সময়, দুটি মিষ্টি কথা আর সামান্য মায়ার পরশ। তুমি সত্যিই ভাগ্যবান যে তোমার স্ত্রী তোমার পাশে আছে। অনেক নারী আছে যাদের এই সৌভাগ্যটুকুও নেই—কারও স্বামী থেকেও পাশে নেই, আর কারও তো স্বামীই নেই।

শুধু মা-বাবার সেবা করাই কি জীবনের একমাত্র ধর্ম? স্ত্রীরও তো তার স্বামীর সঙ্গ পাওয়ার অধিকার আছে। পুরুষেরা চাইলে যেকোনো সময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু নারীরা যাবে কোথায়? কার কাছে উগরে দেবে মনের জমে থাকা সব কষ্ট? সব স্ত্রী তার যন্ত্রণা মুখে বলতে পারে না মহেন্দ্র, পুরুষকে তা চোখের ভাষা দেখে বুঝে নিতে হয়।

দিনভর ক্লান্তি কি শুধু স্বামীরই হয়? ঘরের ঘানি টানা স্ত্রীর শরীর কি ক্লান্ত হয় না? আমি মাঝে মাঝে ভাবি—একদিন যদি আমার পাশে কেউ না থাকে, তবে আমার খবর কে নেবে? রাতে যখন কাঁধের ব্যথায় কুঁকড়ে যাবো, তখন কাকে বলবো— “একটু টিপে দাও না গো...?” হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কি যথেষ্ট নয়, যে শরীরের এই তীব্র যন্ত্রণাটাও আজীবন একাই সইতে হবে?

একবার ভেবে দেখো মহেন্দ্র, সেসব নারীদের কথা—যাদের স্বামী যৌবনেই পাড়ি দিয়েছে পরপারে, কিংবা যাদের সাজানো সংসার মাঝপথে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। তারা বাইরে থেকে হাসলেও ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন একটু একটু করে মরে। তাদের এই নিঃসীম নিঃসঙ্গতা কেউ দেখে না।

নারী শক্ত হতে পারে, কিন্তু সে তো আর পাথর নয়! তারও প্রয়োজন হয় ভরসা করার মতো একটা কাঁধের, একটু স্নেহভরা স্পর্শের। জীবনের এই দীর্ঘ পথ একা হাঁটা বড় কঠিন মহেন্দ্র—পাশে ভালোবাসার কেউ থাকলে দুর্গম পথটাও বড় সহজ মনে হয়।

পরার্থের আকাশ... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস আমি সর্বানী। একদম সাদামাটা বাঙালি ঘরের বউ। লোভ বলতে একটু ভালোবাসা। স্নেহ মায়া মমতায় শাশুড়ি মাকে নিয়ে দেওর ননদের সঙ্গে সুসম্পর্...

জনপ্রিয় পোস্ট