রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

আমার অতীত আমার ভবিষ্যত - নন্দিতা গাঙ্গুলী

 
নন্দিতা গাঙ্গুলী


আমার অতীত আমার ভবিষ্যত
  - নন্দিতা গাঙ্গুলী

আমার অতীত জানে আমার কান্নার রঙ,  
ভাঙা স্বপ্নের ধুলোয় মাখা কত শত ঢঙ।  
ছোট্ট ভুলের পাহাড়, না-পাওয়ার গল্প,  
তবু সে-ই শিখিয়েছে আমায় হতে অল্প অল্প।  

অতীত আমার শিক্ষক, কঠিন হাতে ধরে,  
শিখিয়েছে পথ চলতে আবার পড়ে পড়ে।  
যে হাত ছেড়ে গেছে, যে কথা রয়ে গেছে বাকি,  
সব নিয়েই আজ আমি—একটুখানি পাকা-পাকি।  

আর ভবিষ্যত? সে তো একরাশ সাদা পাতা,  
যেখানে রোজ লিখি আমি নতুন স্বপ্নের কথা।  
ভোরের আলোর মতো নরম তার আহ্বান,  
বলে, “ভয় কিসের? তুই তো পেরিয়ে এলি শ্মশান।”  

জানি না কাল কী হবে, ঝড় নাকি জোছনা,  
তবু হাঁটবো আমি, বুকে নিয়ে আজকের প্রেরণা।  
অতীত যদি হয় শিকড়, ভবিষ্যত তবে ডাল,  
আর আমি আজ—ফুল হয়ে ফোটার তাল।  

অতীতকে জড়িয়ে ধরি, ক্ষমা করি নিজেকে,  
ভবিষ্যতকে বলি, “আয়, বসি মুখোমুখি দেখে।”  
যা গেছে তা গেছে, যা আসবে তা আসুক,  
আমি আছি, এই আমি—এইটুকুই হোক সুখ।  

                        
                      

অসমাপ্ত পান্ডুলিপি... - ডা. তানভীর হাসান তানিম


ডা. তানভীর হাসান তানিম

অসমাপ্ত পান্ডুলিপি
ডা. তানভীর হাসান তানিম

বহুদিনের জমানো অজস্র লুকানো জমাট ব্যথা,
হাসি-কান্না, নীরবতার কথা,
বন্ধু— এত সহজে কি যায় মুছে?
চাইলেই কি সব কষ্ট দেওয়া যায় ঝেড়ে ফেলে—
অতীতের আস্তাকুঁড়ে।
বারবার স্মৃতি হয়ে তারা আসে ফিরে,
মেঘলা বিকেলের নীরব জানালায়,
অকারণে মন আজও তোমাকেই খোঁজে।
পুরোনো ডায়েরির ভাঁজে—
শুকিয়ে থাকা সেই গোলাপ ফুলে,
নিঃশব্দে কথা যায় বলে।
সময় বদলায়, বদলে যায় মানুষ,
কিছু সম্পর্ক স্মৃতি হয়ে রয়ে যায়—
জীবনের ভিড়ে।

কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নেরা - রামকৃষ্ণ পাল

রামকৃষ্ণ পাল 


কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নেরা
- রামকৃষ্ণ পাল 

 
অবশেষে এল স্বপ্নের সেই দিন 
বইছে বাতাস ছন্দে,
হাসছে পুবের আকাশ দিগন্তে 
গাইছে পাখি আনন্দে।

পুলকিত পুষ্পরাজি রাজকীয় 
বেশে ফুটছে বাগানে,
পাখি পতঙ্গ অলি ধাইছে সেথায় 
ধরতে রাগিনী গানে। 

স্বপ্নের সেই দিন জানি না ক'দিন 
রয় আপনার ঘরে, 
এলোমেলো বাতাস থেমেছে হঠাৎ 
শান্তি কুসুমের স্তরে।

তরুণ যৌবনের স্বপ্নের সাথীরা 
সুদিনের অপেক্ষায়, 
মুছে যাবে যত পাপ তাপ গ্লানি 
হাসবে মানবতায়। 

কেটে যাক সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব আশঙ্কা 
দেখুক স্বপ্ন ভোরেরা,
আসুক কাঙ্ক্ষিত সেই ভালোবাসা
দূর হোক ঐ ভয়েরা।

ঘুমপাড়ানি গান ✑ মেফ্তাহুল জান্নাত

মেফ্তাহুল জান্নাত


 ঘুমপাড়ানি গান
✑ মেফ্তাহুল জান্নাত 

চাঁদের সঙ্গে আজকাল আমার বড্ড আড়ি,
বহুদিন তার আলোয় অবগাহন করা হয়না,
জড়িয়ে থাকা হয়না তারই বিচ্ছুরিত স্বর্ণাভ শাখা-প্রশাখা!
ঘুমরাত যেন পাড়ি দিয়েছে কোনও এক অবিসম্ভাব্য স্বর্গের প্রতীক্ষায়।
চোখ বুজলেই দেখতে পাই কেবল–
একটা অন্ধকার ঘর, অদূর দুঃসহ এক অনিশ্চিত জীবন!
একদিন হঠাৎ…. 
হঠাৎ তুমি এলে, আর এসেই কী-না আবদার করে বসলে - 
তোমায় শোনাতে হবে ঘুমপাড়ানি গান!
“ঘুম ঘুম চাঁদ ঝিকিমিকি তারা…”

এমন এক অনিশ্চিত জীবনে যার বসবাস,
তোমায়— কী করে কথা দিই বলোতো?
আবার এও ভাবি,
ওই একটা কল্পনা করতে খুব বেশি বাঁধা নেই!
এই ক্লান্ত আমি'র এবং তুমি'র এইটুকু সাধ ক্ষান্ত হবে,
যদি দেখা হয়ে যায় নিমিষেই…
কোলের উপর তুমি এবং, তোমার মনের বাড়িঘর
একটুকু ছাদ, বৃষ্টি শহর। 
আমরা হারাই বেখবর।
পথ হতে পথ, পথেঘাটে; অনেক দূরের…
সমুদ্র আর অনেক চাঁদঝরা এক পাহাড়ের অসীমতায় মত্ত।
চাঁদে চাঁদে— তারায় তারায়—
আকাশের ও গানের সকল নক্ষত্রমণ্ডলী ছাপিয়ে। 

তোমায় ঘুম পাড়াব বলে, 
গানটুকু আজ কণ্ঠে আছে তোলা,
রাতের মিছিল যায় যে চলে ছুটে, 
আমার জীবন গুনছে জপের মালা।
চাঁদের এবং রাতের। স্বপ্ন এবং প্রাতের।
গান এবং ছন্নছাড়া বিষাদগ্রস্ত চাঁদের! 
আমার প্রহর ডাকছে দূরের চাঁদ, ওই….
সুরেরা ওই ঘুমের দেয়াল ভাঙন জুড়ে রাখছে খেয়াল।
ডাকছে তোমায়, 
ডাকছে আমায়– ঘুমপাড়ানি গান;
জীবনখানা শঙ্কিত তাই, 
চাঁদ হলো আজ স্নান?
চাঁদের বাড়ি– ঘুমের রাত; 
এবং তোমার আহ্বান। 

ডাকছে এসো– ঘুমপাড়ানির গান!

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

গল্পধারা বুধবার 🔰 রহস্যময় গল্প - পর্ব – ১ ( কালো দরজার ও পাশে )

 


গল্পধারা বুধবার 🔰

বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত - 
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন 

সম্পাদক - আকাশ আহমেদ

প্রকাশঃ ২৭শে ই মে ২০২৬ (বুধবার)

প্রচ্ছদ ডিজাইনঃ সর্বানী দাশ



------------------------------------------------------------------------------------


 
ধারাবাহিক গল্প: 

রহস্যময় গল্প

লেখক তামিম আদনান

পর্ব – 
কালো দরজার ওপাশে )


রাত তখন ঠিক বারোটা ছুঁইছুঁই। আকাশজুড়ে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। দূরের বাঁশবাগানের মাথায় ঝুলে থাকা আধখাওয়া চাঁদটাকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন ছুরি দিয়ে তার শরীর কেটে নিয়েছে। বাতাসে শীতের গন্ধ, অথচ ক্যালেন্ডারে তখন ভরা আষাঢ়।

ঢাকার ব্যস্ত জীবন ছেড়ে সাংবাদিক আরিব হঠাৎ করেই চলে এসেছিল “মরিচাপুর” নামের ছোট্ট এক গ্রামে। জায়গাটা মানচিত্রে থাকলেও মানুষের স্মৃতিতে খুব একটা নেই। কারণ এখানে কেউ বেশিদিন থাকতে চায় না।

গ্রামে ঢোকার আগেই বাসের বৃদ্ধ হেলপারটি তাকে বলেছিল—

— “ভাই, রাত হইলে ওই গ্রামের মানুষ জানালা খোলে না।”

আরিব হেসেছিল।

— “চোর-ডাকাতের ভয়?”

বৃদ্ধ লোকটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল।

— “চোর মানুষ হয়। কিন্তু সবকিছু মানুষ না।”

কথাটা শুনে আরিব মুচকি হাসলেও ভেতরে কোথাও একফোঁটা শীতলতা নেমে এসেছিল। সে মূলত এসেছে একটি পুরোনো ঘটনার অনুসন্ধানে। প্রায় বিশ বছর আগে মরিচাপুর জমিদারবাড়িতে একই রাতে পাঁচজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল। কেউ তাদের লাশ খুঁজে পায়নি। পুলিশ কেস বন্ধ করে দেয়। গ্রামের মানুষ ঘটনাটিকে “কালো দরজার রাত” নামে ডাকে।

আরিবের সম্পাদক তাকে স্পষ্ট বলেছিল—

“যদি সত্যিটা বের করতে পারো, এটা হবে বছরের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিবেদন।”

কিন্তু আরিব জানত না, সে কেবল একটি গল্পের পেছনে নয়, বরং এমন এক অন্ধকারের দিকে হাঁটছে—যেখানে মানুষের চেয়ে স্মৃতিরা বেশি জীবিত।

গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। কুকুরের ডাক নেই, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ নেই, এমনকি বাতাসও যেন নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে।

রাস্তার পাশে এক চায়ের দোকান খোলা ছিল। দোকানদার বৃদ্ধ লোকটি আরিবকে দেখেই চমকে উঠল।

— “আপনি বাইরের মানুষ ?”
— “জি। একটা রিপোর্টের কাজে এসেছি।”
— “জমিদারবাড়ির ব্যাপারে?”

আরিব অবাক হলো।

— “আপনি বুঝলেন কীভাবে ?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চায়ের কাপ নামিয়ে বলল—

— “যে বাইরের মানুষ রাতের বেলা মরিচাপুরে আসে, তারা দুই কারণে আসে। কেউ ভুল করে আসে… আর কেউ জমিদারবাড়ির জন্য।”

লোকটার চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক ছিল।

— “ওই বাড়িতে কেউ থাকে?”
— “মানুষ না।”

আরিব এবার একটু বিরক্ত হলো।

— “আপনারা সবাই এমন রহস্য করে কথা বলেন কেন?”
বৃদ্ধ কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—

— “কারণ এই গ্রামে সত্যি কথা জোরে বলতে নেই।”
ঠিক তখনই দোকানের পেছন থেকে একটা বিকট শব্দ এল। যেন কোনো ভারী জিনিস পড়ে গেল। বৃদ্ধ হঠাৎ কেঁপে উঠল।

— “আপনি যান। এখনই যান!”
— “কিন্তু—”
— “আজ রাত ভালো না।”

লোকটার আচরণে অদ্ভুত কিছু ছিল। আরিব আর কথা বাড়াল না। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এগিয়ে গেল গ্রামের একমাত্র অতিথিশালার দিকে।

অতিথিশালাটার নাম “নীলকমল ভিলা”। অথচ পুরো বাড়িটার রঙ ছিল ধূসর। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। বারান্দার বাতিগুলো বারবার জ্বলছে আর নিভছে।

দরজা খুললেন মাঝবয়সী এক মহিলা।

— “রুম লাগবে?”
— “জি।”
মহিলাটি কোনো কথা না বলে তাকে একটি চাবি দিলেন।
— “দ্বিতীয় তলা। কিন্তু একটা কথা…”
— “জি?”
— “রাত তিনটার পর দরজা খুলবেন না।”
আরিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— “আপনারাও শুরু করলেন?”
মহিলা শান্ত গলায় বললেন—
— “আমি মজা করছি না।”

তার চোখদুটো দেখে মনে হলো তিনি সত্যিই ভয় পাচ্ছেন।
রুমে ঢুকে আরিব জানালা খুলতেই ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে এক অদ্ভুত গন্ধ এলো। যেন পুরোনো ভেজা কাপড় আর পোড়া কাঠের মিশ্রণ।

দূরে অন্ধকারের মধ্যে জমিদারবাড়িটা দেখা যাচ্ছিল। বিশাল কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটার একটি জানালায় ক্ষীণ আলো জ্বলছিল।

আরিব থমকে গেল।
“ওখানে তো কেউ থাকে না!”

সে ক্যামেরা বের করে জুম করল। কিন্তু ঠিক তখনই আলোটা নিভে গেল।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।

টক… টক… টক…
আরিব দরজা খুলে দেখল কেউ নেই। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো চিঠি।

চিঠির ওপর কাঁপা হাতে লেখা—
“কালো দরজাটা খুলো না।”

তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।

সে দ্রুত করিডোরে তাকাল। কেউ নেই। শুধু লম্বা অন্ধকার পথ আর দেয়ালের পুরোনো ঘড়ির টিকটিক শব্দ।

রুমে ফিরে এসে চিঠিটা খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি লাইন—
“তারা এখনো বেঁচে আছে।”
রাত বাড়ছিল।

আরিব ঘুমাতে পারছিল না। সাংবাদিক হিসেবে সে বহু ভয়ংকর ঘটনা দেখেছে। কিন্তু আজকের পরিবেশটা অন্যরকম। যেন পুরো গ্রাম কোনো অদৃশ্য আতঙ্কের নিচে চাপা পড়ে আছে।

ঘড়িতে রাত ২:৪৭।

ঠিক তখনই নিচতলা থেকে ভেসে এলো পায়ের শব্দ।

ধুপ… ধুপ… ধুপ…

কেউ যেন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে।
আরিব দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।
শব্দটা থেমে গেল তার দরজার সামনে।
তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

এরপর খুব আস্তে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “দরজা খোলো…”

কণ্ঠটা মানুষের মতো, অথচ পুরোপুরি মানুষ না। যেন অনেকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে কথা বলছে।

আরিব কিছু বলল না।

আবার কণ্ঠটা শোনা গেল—
— “আমরা ফিরে এসেছি…”

তার হাত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু ঢুকতে শুরু করল।

আরিব আতঙ্কে পিছিয়ে গেল।
ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে মানুষের আকার নিতে লাগল।
সে দ্রুত লাইট জ্বালাতে গেল। কিন্তু লাইট জ্বলল না।
পুরো রুম অন্ধকার।

এরপর সে স্পষ্ট শুনতে পেল—
কেউ তার কানের কাছে ফিসফিস করছে—

— “কালো দরজাটা খুলে গেছে…”
ভোর হওয়ার আগেই আরিব অজ্ঞান হয়ে যায়।

সকালবেলা যখন তার ঘুম ভাঙল, তখন সূর্যের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছে। যেন রাতের সেই ভয়াবহতা কখনো ঘটেইনি।

কিন্তু মেঝেতে কালো পোড়া দাগ এখনো রয়েছে।
আরিব নিচে নেমে মহিলাকে জিজ্ঞেস করল—

— “গতরাতে কে আমার দরজায় এসেছিল?”
মহিলা চুপ।

— “আপনি শুনেছেন নিশ্চয়ই!”
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—

— “আপনি দরজা খুলেননি, এটাই ভালো হয়েছে।”
— “কেন?”

মহিলার চোখ ভিজে উঠল।

— “তিন বছর আগে আমার ছেলে দরজা খুলেছিল।”
— “তারপর?”
 
— “সকালে শুধু তার জুতো পাওয়া গিয়েছিল।”
আরিবের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

সেদিন দুপুরে সে জমিদারবাড়ির দিকে রওনা দিল।

গ্রামের মানুষ তাকে থামানোর চেষ্টা করল। কেউ সরাসরি কথা বলছে না, কিন্তু সবার চোখে একই আতঙ্ক।

জমিদারবাড়ির সামনে পৌঁছে সে থমকে দাঁড়াল।

বিশাল লোহার গেট। তার ওপরে মরিচা ধরা অদ্ভুত প্রতীক আঁকা। মনে হচ্ছিল কারো বিকৃত মুখ।
বাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধ। পাখিরাও যেন এড়িয়ে চলে জায়গাটা।

গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে অনুভব করল তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেছে।
চারপাশে ধুলো, ভাঙা দেয়াল, শুকনো গাছ।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—বাড়ির মূল দরজাটা আধখোলা।
যেন কেউ একটু আগেই ভেতরে ঢুকেছে।

ভেতরে ঢুকতেই কড়া গন্ধ নাকে এলো। পুরোনো কাঠ, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর কোনো অচেনা কিছুর গন্ধ।

দেয়ালে ঝুলছে বিশাল সব ছবি। জমিদার পরিবারের সদস্যরা।
কিন্তু একটা ছবির সামনে গিয়ে আরিব থেমে গেল।

ছবিতে পাঁচজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির নিচে লেখা—

“শেষ রাত্রির অতিথিরা, ২০০৬”
এরা সেই পাঁচজন, যারা নিখোঁজ হয়েছিল।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—

ছবির এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের মুখ ঠিক আরিবের মতো।
একদম হুবহু।

তার বুকের ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।
— “এটা কীভাবে সম্ভব?”

ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে শব্দ এলো।

ধুপ…
ধুপ…
ধুপ…

কেউ হাঁটছে।

আরিব ক্যামেরা শক্ত করে ধরল। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
ওপরের করিডোরে পৌঁছে সে দেখল, শেষ প্রান্তে একটা কালো দরজা।
পুরো বাড়ির মধ্যে একমাত্র দরজাটা একদম নতুনের মতো।
কালো রঙ চকচক করছে।

দরজার সামনে মেঝেতে শুকনো রক্তের দাগ।

আর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে খুব আস্তে ফিসফিস শব্দ—
— “ফিরে এসো…”

আরিবের হাত কাঁপছিল।
হঠাৎ তার পেছনে কারো নিঃশ্বাসের শব্দ।

সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল—
একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।

চোখদুটো সাদা। মুখ শুকনো। হাতে লণ্ঠন।
বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলল—

— “অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
— “আপনি কে?”
— “আমি এই বাড়ির শেষ দারোয়ান।”
— “এই দরজার ওপাশে কী আছে?”

বৃদ্ধের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

— “ওপাশে মানুষ যা হারায়… তা আর ফিরে পায় না।”
— “পাঁচজন মানুষ কোথায় গেল?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে কালো দরজার দিকে তাকাল।
তারপর বলল—

— “ওরা কোথাও যায়নি।”

ঠিক তখনই দরজার নিচ দিয়ে কালো ধোঁয়া বের হতে শুরু করল।
আরিব পেছাতে গেল।

কিন্তু বৃদ্ধ তার হাত শক্ত করে ধরে বলল—
— “আজ রাতেই দরজাটা আবার খুলবে…”
— “মানে?”

বৃদ্ধ আতঙ্কিত চোখে তাকাল—
— “আর এবার ওরা তোমাকে নিতে এসেছে।”

ঠিক তখনই কালো দরজার ভেতর থেকে ভেসে এলো এক বিকট শব্দ।
ধীরে ধীরে দরজাটা নিজে থেকেই খুলতে শুরু করল…

আরিব দেখল—

দরজার ওপাশে কোনো ঘর নেই।
শুধু অসীম অন্ধকার।

আর সেই অন্ধকারের ভেতর শত শত মানুষের চোখ জ্বলছে।



( চলবে…

---------------------------------------------



 তামিম আদনান

🔹 বয়সঃ ৪৫
🔹 জেলা / বর্তমান ঠিকানাঃ আহাদিপুর, কলাতিয়া,
      কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১৩। 

🔹 মোবাইল নম্বরঃ ০১৮৩১৬৮১৫৯৯
🔹 ইমেইলঃ adnansir599@gmail.com

🔹  তামিম আদনান, জন্ম ৩০/১২/৮০ পুরান ঢাকার ভাগালপুর এলাকায়। যদিও শৈশব, কৌশোর,যৌবন পড়াশুনা, বিয়ে সবকিছু পার হয়েছে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায়। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত নূর মোহাম্মদ মডেল স্কুল, কলাতিয়া, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

দিনকাল... - সুমি সাহা

- সুমি সাহা 

 দিনকাল 
- সুমি সাহা 


দিনকাল আজকাল 
    মোটে যেনো ভালো নয়,
পথে ঘাটে যেথা সেথা 
     বিপদ লুকিয়ে রয়‌।

মানুষের মত দেখতে তারা
   কিন্তু মানুষ তারা নয় ,
মুখোশ পড়া মুখোশধারী 
   মানুষের ভিড়ে রয়।।

সুযোগ বুঝে কোপ দেয় 
  সামলানো বড়ো দায়,
    প্রশাসন সব দেখেও
  চুপ করে থাকে ঠায়।।

নারীরা সদা থাকে তারা
    নিরাপত্তাহীনতায়,
      পথে ঘাটে চলতে    
     সদা তারা ভয় পায়।।

রাতে পথেঘাটে সদা যেনো
কোনই শান্তি নাই,
সদা বিপদ আড়ালে থাকে 
দেখা সদা  নাহি পাই।।

নজরুল, এক ধ্রুবতারা... - রামকৃষ্ণ পাল

 
রামকৃষ্ণ পাল 



নজরুল, এক ধ্রুবতারা
- রামকৃষ্ণ পাল 


সৃষ্টি ধারার বাহক রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুল 
অনন্য যুগাবতার সাহিত্যের ভুবনে, 
সৃষ্টির স্রোতধারায় অমলিন রইবে চিরকাল
ছন্দ গন্ধে বর্ণমালা শব্দ অনুরণনে।

বিপরীতধর্মী দুই মহাকবি সৃজনেরই পথিক-
দিকপাল সৃষ্টি রসনার দার্শনিক,
পেরিয়ে যত শত বাধা আগুয়ান সম্মুখপানে
দৃঢ়তায় অবিচল অটল অমায়িক।

তরুণের স্বপ্ন বিদ্রোহের আগুনে জ্বালিয়েছো
নব দিগন্তে সঞ্চারী দিয়েছো দিশা,
জাগিয়েছিলে বিধ্বস্ত প্রাণে বাঁচিবার রসদ-
শ্যামা সঙ্গীত গানে সঞ্জীবনী তৃষা। 

গান গল্প কবিতা গীতে কত যে সৃষ্টির ঝুলিতে 
বেদনার হৃদয়ে সন্তাপ ঘুচিয়েছো, 
অমোঘ সৃষ্টিধারার সত্য সেতার বন্ধন নীড়ে 
খুশিতে আত্মহারা মনুষ্যত্বে গেয়েছো।

হে নজরুল, কবিগুরুও দিয়ে গেছে সম্মান
মেনেছে তোমায় শ্রেষ্ঠ কুলের কবি,
দু'জনেই বিশ্বে করেছো রাজ রচনা সমুদ্রে
গানে ভুবন ভরিয়ে আজ শুধু ছবি।

হে মহীরূহ, বৃষ্টি চেতনায় অমলিন চিরদিন-
চন্দ্র সূর্যের মতনই দেখাবে সু-পথে
দিশাহীন নাবিক পাবে পরিত্রাণ ধ্রুবতারায় 
শিল্প কলা চিরজীবী সততার রথে।

সুখ বিলাস... - রতন চক্রবর্তী

রতন চক্রবর্তী


 সুখ বিলাস
- রতন চক্রবর্তী 

আর কত ছোট হবে? আর কত 
নিজেকে গুটিয়ে নেবে বিভ্রান্ত সুখের বলয়ে!
আত্মকেন্দ্রিক সীমানার গন্ডিতে একাকী জীবন।
ছোট হতে হতে একান্নবর্তী আজ পরমাণু পরিবার।
চার দেয়ালে বন্দি সুখী গৃহ কোণে 
অসুখে দিন যাপন। 
একের বেশি দুই নয়,
সম্ভোগে,সাশ্রয়ে বিলাসী জীবন। 
একদিন, সেই একমাত্রও একাকী ফেলে
দূরে চলে যায় জীবন থেকে তোমার দেখানো পথে।
সকলেই আঁকে গন্ডি 
আপন সুখের এক পরমাণু বৃত্ত ;
 তারপর - কেউ নেই চার পাশে,
নিঃসীম শূন্যতা; সব সুখ হারিয়ে যায়।
সবাই যে যার মত ছোট হতে হতে একদিন -
বন্ধ ঘরে বাসি মরা তুমি সুখের বিছানায়।

শুদ্ধ মনের কোরবানি... - হাসিনা খাতুন

 
হাসিনা খাতুন


শুদ্ধ মনের কোরবানি
- হাসিনা খাতুন


শুধু কি পশুর রক্ত ঝরালে কোরবানি দেওয়া হয়?
মনের পশুটি না মরলে তো ত্যাগ বৃথা হয়ে যায়।
লোকদেখানো এই আয়োজনে মেতে আছি আমরা সবাই,
ভেতরের নোংরা চিন্তাগুলোর কোনো পরিবর্তন নাই।

মনের ভেতর লুকিয়ে আছে হিংসা ও বিদ্বেষ,
পরনিন্দা আর পরচর্চাতে জীবন করছি শেষ।
অন্যের ভালো দেখলে পরে নিজের মনে জ্বলে আগুন,
এই কুৎসিত মানসিকতাই নষ্ট করে সব গুণ।

কোরবানির আসল অর্থ হলো আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগ,
অহংকার সব দূর করে দাও, মুঁছে যাক অনুরাগ।
মুখের ভাষায় থাকবে না আর কোনো অপবাদ,
ভালোবাসায় মিটিয়ে দেবো সব রকমের বিবাদ।

নিজের ভেতরের স্বার্থপরতায় চালাও ত্যাগের ছুরি,
তবেই তো মন শান্ত হবে, সুখ পাবে ভুরি ভুরি।
গরীবের হক ফিরিয়ে দিয়ে মেলাও আজ হাত,
তবেই সফল হবে পবিত্র এই কোরবানির রাত।

ভালো মানুষের ছদ্মবেশে থেকো না আর কেউ,
মনের নদী থেকে দূর করো নোংরা চিন্তার ঢেউ।
মিথ্যা কলঙ্ক রটিয়ে যারা সময় কাটায় রোজ,
কোরবানির এই পবিত্র দিনে নিক তারা নিজের খোঁজ।

শুদ্ধ করো নিজের মন, ধুয়ে নাও সব পাপ,
অন্যের নামে দিও না আর কোনো অভিশাপ।
ক্ষমা করতে শেখো আজ, মনে রাখো বল,
তবেই তো জীবনে আসবে শান্তির সুশীতল জল।

ঘৃণা নয়, ভালোবাসায় ভরিয়ে দাও এই ধরা,
তবেই তো সার্থক হবে কোরবানি দেওয়া সারা।
অন্যের ভালো দেখে তুমি খুশি হতে শেখো ভাই,
সুন্দর এক পৃথিবীর চেয়ে বড় তো কিছু নাই।

বিসর্জন দাও আজ মনের যত কলুষিত রূপ,
আলোয় আলোয় ভরে উঠুক হৃদয়ের ঐ কূপ।
মাংস বিলানো নয় শুধু, বিলিয়ে দাও প্রীতি,
ইসলামের এই তো আসল সুন্দর এক রীতি।

মানুষের জয় হোক, ঘুচে যাক সব কালো,
প্রতিটি মনের ভেতর জ্বলুক সত্যের আলো।
এই হোক আমাদের কোরবানির অঙ্গীকার,
সুন্দর মনে বাঁচুক সবাই, ঘুচুক অন্ধকার।

ছাড়তে হবে ভবের সংসার... - শামীমা তালুকদার

শামীমা তালুকদার 




ছাড়তে হবে ভবের সংসার 
- শামীমা তালুকদার 


তিন কাপড়ে পুরুষ বিদায় 
পাঁচ কাপড়ে নারী,
টিকিট হাতে এসেও 
তবুও কেন করো বাহাদুরি? 
দুইদিনের এই দুনিয়াতে 
কিসের এতো অহংকার?
মাটির দেহ মাটি খাবে 
মরলে পরে দেহ পচবে। 
দেহের বলে সাজাও তরী 
কথার ছলে করো বেইমানি , 
মরণকালের যাত্রায় 
সবাই হবে পিছন ফেরি। 

হাতের ইশারায় নাচাও সবি 
মুখে তোমার মিথ্যে বাণী, 
মৃদু হেসে নীরবে করো খুন 
 ছাড়তে হবে ভবের সংসার 
গড়াও কেন পাপের ভবন? 
নোটিশ এলে যেতে হবে 
নগ্ন দেহে  রইবে সাদা কাফন।

তোমার কল্পনায়... - ত্রিদিবেশ দে

ত্রিদিবেশ দে 




 তোমার কল্পনায়
- ত্রিদিবেশ দে 

তীব্র আলিঙ্গনে বুকে টেনে নিয়ে 
তোমার কী প্রেম পায় না?
দিব্যি দিন কেটে যাচ্ছে,
ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছেরা তোমায় পাচ্ছে না।

হতাশার অতলে তলিয়েও 
ডুবে থাকি তোমার কল্পনায়। 

তোমার চুলে, শরীরের ঘ্রাণে, 
চোখের কাজলে মাতোয়ারা হয়ে থাকি, 
উন্মাদ হয়ে থাকি। 

কিন্ত কই? 
তুমি তো কাছে ডাকো না।

রাখিও তোমার নীড়ে... - বাসন্তী দাশ বাসনা

 
বাসন্তী দাশ বাসনা



রাখিও তোমার নীড়ে
- বাসন্তী দাশ বাসনা

প্রকৃতি মোরে রাখিয়াছো টানিয়া,
যেতে নাহি মন চায়।
কত আদর-যত্নে বেড়িয়া রাখিয়াছো,
ঐ দেখ প্রকৃতির মায়।

দিয়াছো আলো, দিয়াছো ছায়া,
দিয়াছো নদীভরা জল।
দিয়াছো মাটি, দিয়াছো পাহাড়,
দিয়াছো কত ফুল-ফল।

খাইবার জন্য দিয়াছো খাদ্য,
দিয়াছো গাছ, লতা-পাতা।
মানবের লাগি সব দিয়াছো বিলাইয়া,
কোথাও নেই কৃপণতা।

তাই তো তোমার চরণে ঠেকাই মাথা,
যেতে নাহি চাই পরপারে।
আদর-সোহাগে রাখিও, মাগো,
রাখিও তোমার নীড়ে।

ভক্তের প্রতিকী... - মোঃ সোহরাব হোসেন খান অনন্ত মৈত্রী

মোঃ সোহরাব হোসেন খান অনন্ত মৈত্রী 


 ভক্তের প্রতিকী
- মোঃ সোহরাব হোসেন খান অনন্ত মৈত্রী 


ভক্তের প্রতিকী
হনুমান বলে জানি,
অনুধাবন হীন যারা
হনুমানই জ্ঞান করে তারা,
প্রভুত্ব অর্জনের শ্রেষ্ঠ প্রতিকী
হনুমান চরিত্রটি,
ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে 
পথ চলে যদি এইভাবে,
পৌঁছাবে আপন লক্ষ্যে
বলছি দিব্য প্রত্যয়ে।।

ভক্ত হবে যদি
দেখো তবে হনুমান চরিত্রটি,
গুরুর আদেশ কি বা পালন করে 
হনুমানই শ্রেষ্ঠ এই ধরিত্রীতে,
হনুমান প্রতিকী অর্থে 
সংঘাত সৃষ্টি করো না সমাজে,
ভক্তের ধর্ম গুরুই হয় জানি
ভক্তের জন্যই মূলতঃ এই চরিত্রটি,
ভক্তকে উদ্দেশ্য করেই এই রচনা
ভক্ত যেন কভুও না হয় পথহারা......

ভাগ্যের ইশতেহার - সালাম মালিতা

সালাম মালিতা 

 
ভাগ্যের ইশতেহার 
- সালাম মালিতা 

চাঁদিফাটা হাঁসফাঁস গরম
কৃষকের দৃঢ় প্রত্যয় অপেক্ষা ভঙ্গুর,  
জৈষ্ঠ্য মাসের সূর্য
কৃষাণীর পরিশ্রমের কাছে পরাজিত। 
বোরো ধানের আঁটি 
ড্রামের উপর শপাং শপাং শব্দ,
মুক্তো ঝরা হাসিতে 
গোলায় ওঠে।

শুষ্ক বাতাস 
মুখের চামড়া পোড়াতে দ্বিধাবোধ করে না,
নবযৌবনে বেড়ে ওঠা পাটগাছ 
খেটে-খাওয়া মানুষের উপর ভর করে। 
পান্তায় একটু লঙ্কা হলেই যথেষ্ট 
কপালের নোনাজল-
বাসি ভাতে পড়তে সদাই ব্যস্ত। 

রজনী ফুলের আগাছারা
নিজের সৈন্য-সামন্ত বৃদ্ধি করে নেয়,
খোঁয়াড়ে বেঁধে রাখা গাভীর 
বাছুরের জন্য প্রাণপনে হাম্বা-হাম্বা ডাক।
দীঘির জলে পাতিহাঁসের জলকেলি 
মাছরাঙার মাছের প্রতীক্ষা,
কাকের কা-কা-কা তীক্ষ্ণ চিৎকার 
কুকুরের লালাক্ষরণ-সবই বেড়ে যায়। 

দলবদ্ধ মহিষের জলে ডুবে থাকা 
শালিকের কিচিরমিচির, 
আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, জামরুল 
পাকার বড্ড তোড়জোড়। 
জলীয়বাষ্পহীন খণ্ড মেঘ
হঠাৎ থমথমে পরিবেশ, 
তীব্র ঝড়ের ফলে ছিন্নভিন্ন জনজীবন-
মুষলধারে বৃষ্টিতে জলাশয় পূর্ণ, 
বিদ্যুৎ বিভ্রাট...বিনিদ্র নিশিযাপন! 

বিধির বিধান সংরক্ষিত ললাটে 
ঘোষনা বিহীন সাইরেন, 
ভাগ্যের ইশতেহার পূর্ব নির্ধারিত 
সুকর্মে প্রাপ্তি ঘটে...!

লুকানো পাপের ঘ্রাণ... - মুন্নাফ সেখ

- মুন্নাফ সেখ




 লুকানো পাপের ঘ্রাণ
- মুন্নাফ সেখ


স্রষ্টার দয়া অন্যায়ের কোনো গন্ধ ছড়ায় না,
নইলে এ ধরায় কেউ তো বাঁচতে পারত না।
চারিদিকে শুধু পচা দুর্গন্ধে ভরে যেত বাতাস,
লুকিয়ে থাকত না মানুষের কোনো কালো ইতিহাস।

যে জন সেজেছে সমাজে আজ পরম সাধু সাধক,
তার গা থেকেও বের হতো তীব্র বিষাক্ত মাদক।
বিচারালয়ে জজের আসনে বসা যে বিচারক,
ঘুষের গন্ধে সেও হয়ে যেত নরকের এক কীটক।

নেতার মঞ্চে সুবাসের বদলে ছুটত তীব্র ঘেন্না,
মুখোশধারী ভালো মানুষদের চিনে নিত সর্বজনা।
উচ্চ অট্টালিকা থেকে আসত যে দুর্গন্ধের ঢেউ,
লজ্জায় তখন মুখ দেখাতে পারত না তো কেউ।

মিথ্যা কথার দুর্গন্ধ যদি ছড়াত বাতাসে তীব্র,
চেনা চেনা সব আপন মানুষ হয়ে যেত অতি ক্ষিপ্র।
পাপের ভারেতে বাতাস হতো যে ভীষণ ভারী,
নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতো রে দুনিয়াতে সবারই।

লোভ আর হিংসার কুৎসিত সেই উৎকট বাসে,
মানুষ পালাত মানুষ দেখলেই আতঙ্কে ত্রাসে।
প্রেমের আড়ালে লুকিয়ে থাকা যে স্বার্থের বিষ,
গন্ধ পেলেই চমকে উঠত মনের চাতক দীশ।

বিধাতা তাই তো দয়া করে মোদের ঢেকেছেন লজ্জায়,
অন্যায়ের কোনো গন্ধ দেননি মানুষের মজ্জায়।
নইলে এ বিশ্ব এক নিমেষেই হয়ে যেত শ্মশান,
বাস অযোগ্য হতো ধরণী, হারাতে হতো প্রাণ।

তাই তো মানুষ বুক ফুলিয়ে আজও হাঁটে এ পথে,
পাপের গন্ধ লুকিয়ে রেখে চলে মিথ্যার রথে।
যদি কোনোদিন প্রকাশ পেত সেই লুকানো ঘ্রাণ,
মানুষের থেকে দূরে পালাত মানুষেরই পরান।

স্রষ্টার দয়া অন্যায়ের কোনো দূরগন্ধ নেই,
নইলে পৃথিবী থমকে যেত আজ এই খানেতেই।
লজ্জাহীন এই মানবজাতি পেত না কোনো ঠাঁই,
মানুষের মাঝে মানুষের আর অস্তিত্ব থাকত নাই।

ছুটি... - উজ্জ্বল কান্তি দাশ

- উজ্জ্বল কান্তি দাশ



 ছুটি
- উজ্জ্বল কান্তি দাশ


এই কোলাহল নিত্য পাঁচালী, 
এসব আর ভালো লাগে না। 
কোন কিছুতেই নেই মনোযোগ, 
কারো প্রতি নেই কোনো অভিযোগ। 
প্রতি দিন বাড়ি ফিরে
নিজেই ঘরের তালা খুলে, 
আপন মনে বকতে থাকা। 
সবই যেন বেকার খাটা, 
এটা ওটা সাজিয়ে রাখা! 
চমকে গিয়ে হঠাৎ ভাবি
কত দিন আর
হয় না কবিতা লেখা, 
যেটুকু লিখেছি হয়নি কখনো
উল্টে পাল্টে দেখা। 
কি হবে লিখে? 
পড়বে বলো কে তা? 
যা কিছু লিখেছি 
সবই মনে হয় বৃথা! 
খাতা কলম কোথায় কোথায়
গেছে হারিয়ে? 
প্রিয় বইগুলো এখানে 
ওখানে ছড়িয়ে! 
পড়া হবে না, 
পড়বো না হয়তো আর, 
কোনো আগ্রহ,নেই কিছুতে বাকী, 
বুঝে গেছি সব শুভঙ্করের ফাঁকি। 
একঘেয়েমি ছন্নছাড়া জীবন, 
একটু দূরে মুচকি হাসে মরণ, 
সব বুঝি এসে 
মিশেছে শেষের পথে, 
এবার বুঝি চড়তে হবে
স্বর্গ পাড়ির রথে! 
কোনো ব্যথা নেই, 
দুঃখ নেই আমার, 
যা কিছু ভাঙ্গার 
তা ভেঙ্গে যাক এবার। 
সব থমকে গেলেও
কিচ্ছু যায় আসে না আর-
আলোর মাঝে থেকেও দেখি
ভীষণ অন্ধকার। 
চেনা কন্ঠের সুর 
একলা দুপুর, বৃষ্টির নূপুর, 
দিগন্তের হাতছানি, 
টানে না তো আর, 
ডাকে না আমায়! 
বলে না তো ছুটে আয়! 
ইট পাথরের শহর, 
নানান গাড়ির বহর, 
হৃদয় হীন ভালোবাসা, 
প্রেয়সীর ছুঁয়ে থাকা, 
মিথ্যে স্বপ্ন আঁকা, 
কোন কিছুতেই নেই কোনো তৃষা,
পেতেও চাই না , 
নতুন কোনো দিশা। 
এখন শুধু বাকি আমার
পঞ্চভূতে মিশা। 
ধীরে ধীরে একটু একটু করে
সবকিছুই গেছে আমার টুটি,
এবার আমি বিদায় নেবো, 
নিয়েই নেবো জীবন হতে 
চিরস্থায়ী ছুটি।

হরষের প্রণয় ! - রকিবুল ইসলাম

রকিবুল ইসলাম


 হরষের প্রণয় !
- রকিবুল ইসলাম


যদি মোর অন্তর চিৎকার করে বলে
ভালবাসি,ভালবাসি অহর্নিশি!
সে নৈঃশব্দের বীণার গীত ঝংকার,
সে তাল,লয়,সুর লহরীর মূর্ছনা
ধ্বণিত হবে কি তব কর্ণমূলে?
পাব কি চির আরাধ্য সান্নিধ্য তোমার?
না কি হারাবে পুনরায় সবকিছু যথারীতি!
তবে,কই তোমারে সখি!
শোন হৃদয়ের কর্ণে!
পুনশ্চ:,পুনশ্চ: আসব ফিরে
ব্যথার বাঁশরী হাতে,
তোমার হৃদয় দ্বারে।
জ্যোৎস্নারা নামত নীরব স্বপ্নের তীরে,
হৃদয় ভাসত সুখের অমৃত নীড়ে,
বেদনারা হারাত গোপন আলোর ভাঁজে,
তোমারে লয়ে বাঁচিতাম অনন্ত সাজে।
কতই না মধুর হত!
ব্যথায় জর্জর অনুভূতিগুলো
মুছে দিয়ে যদি সহসাই
হরষের প্রণয়ে আলিঙ্গণাবদ্ধ হতে!

বিশ্বজুড়ে খিদের জ্বালা... - সর্বানী দাস




 বিশ্বজুড়ে খিদের জ্বালা 
- সর্বানী দাস

ওরা ভাতের গান গায়,
আদুল গায়ে ঘোরে ওরা মাঠে ঘাটে—
নিঃস্ব কাঙাল সর্বহারা বাঁচে ধুঁকে,
পথের ধারে কুড়ায় অন্ন ডাইনি উদর।

বিশ্বজুড়ে খিদের মেলা রঙ্গলিলায়,
লাইন দিয়ে কঙ্কালরা খিদের ত্রাসে;
দু-মুঠো ভাতের প্রতিশ্রুতি বড্ড চাপে,
স্বপ্ন দেখে ফ্যান গড়িয়ে মাখছে হাঁড়ি।

পেটের ভেতর দুষ্টু ছুঁচো মারছে লাথি,
খিদে রাক্ষস গিলছে ওদের, শিশুরা কাঁদে;
বস্ত্র ছাড়া কিশোরীটির পেটের জ্বালা,
খিদের সাথে আপোষ করে যায় কি বাঁচা?

বাঁচুক ওরা আজন্মকাল লড়ুক খিদেয়,
তুলবে তুফান একটি দিনেই কলম কালি -
হাততালি দিয়ে দেখছে ওরা অবাক দৃষ্টি -
ঘৃণায় বেঁচে সারাবছর আজকে রাজা

অন্য নদী... - ড.তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়

ড.তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়  


 অন্য নদী
ড.তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়   

 আজ সাত ঘণ্টার উপর
এই পথ দিয়ে যাওনি ,
তোমাকে একবার দেখার তরে
ঠায় বসে জানালার ধারে ,
কি শরীর খারাপ নয় তো ?
বাড়ির কারোর কিছু হয়েছে ?
না আমার জন্যে 
পথটাই পাল্টে ফেললে ?
তুমি বিশ্বাস করো
আজ সারাদিন শুধু চা
আর সিগারেটেই কাটলো  ,
না, কিছু খাওয়া হয় নি ,
শুধু তোমাকে একবার দেখবো বলে  ।

আমি মানুষ টা
খুব খারাপ বলে মনে হয় তোমার ?
একে একে মা বাবা সবাইকে
হারিয়ে বসে আছি ,
দিদিটারও বিয়ে হয়েছে কোন ছোটবেলায় ,
মাঝেমধ্যে বড় একা লাগে  ।
আজ আমার অফিসের ছুটি ,
একা বাড়িতে ভালো  লাগছে না ।
সকালে একবার তোমায় দেখলে
মনটা বেশ ভালো লাগে ,
নাই বা হল কথা ,
ওই  মিষ্টি হাসিটাই যথেষ্ট যে  !

হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ ,
দরজা খুলতে দেখি তুমি !
বললে ভিতরে আসতে বলবে না ,
বলি হ্যাঁ এসো ,
ঘরের ভিতরে চেয়ারে বসলে তুমি ,
আমরা সবাই চলে যাচ্ছি ।
বাবার বদলির চাকরি ,
এবারে জামশেদপুর  ।
বললে তোমাদের অফিসের ব্রাঞ্চ 
জামশেদপুরে আছে না ?
তুমি ওখানে বদলি নাও ।
বলি কেন ?
তুমি বললে জানি না যাও ,
বদলি অবশ্যই নিও কিন্তু  ,
শুধু আমার জন্যে  ।

"সিংহাসনের চরিত্র এক" - অরবিন্দ সরকার

- অরবিন্দ সরকার




 "সিংহাসনের চরিত্র এক"
- অরবিন্দ সরকার


শাসকের শ্রেণী চরিত্র সদা নির্মম নিষ্ঠুর,
দাবি দাওয়া আদায়ে যেতে হবে বহুদূর,
         তাদের দেবতা ভাবলে ভুল 
         হারাবে পরম্পরা জ্ঞাতিকুল
বাহিনীর পাহারার ঘেরাটোপে অন্তঃপুর,
স্বৈরাচারীর বিসর্জনে আঘাতটা জরুর।

সেনা ছাউনির বেষ্টনী পেরিয়ে কোহিনুর,
তাকে ছোঁওয়া অসাধ্য সাধন দিন দুপুর,
          ফটকে প্রহরী নেই হেলদুল
          তাক্ করা বন্দুকে মসগুল
পরিবেষ্টিত নিশ্ছিদ্র বলয়ে তার ঘুরঘুর,
স্তাবকেরা শ্রীপদতলে গীত গায় সুমধুর।

বিরুদ্ধাচারণে উপযুক্ত দাওয়াই শ্রীপ্রভুর,
পারিষদবর্গের চাবুক মারতে সয়না সবুর,
         করের বোঝা ঘাড়ে বিলকুল 
         রাজাদেশ নড়বেনা এক চুল
ভয়হীন সবহারা মানুষের কণ্ঠে একই সুর,
হারিয়ে সবকিছু আজ তারা বীর বাহাদুর।

শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (চতুর্থ পর্ব)




ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি
লেখক - আকাশ আহমেদ

চতুর্থ পর্ব: 
নীরবতার কান্না


রাত যত গভীর হয়, মানুষের ভেতরের সত্যগুলো তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দিনের ব্যস্ততা মানুষকে অনেক কিছু ভুলিয়ে রাখে - কাজ, দায়িত্ব, মানুষের ভিড়, ফোনের শব্দ - সব মিলিয়ে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাত ?

রাত কাউকে লুকাতে দেয় না।
রাত মানুষকে তার নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আকাশ এখন প্রতিটা রাতেই নিজের সামনে দাঁড়ায়।
আর প্রতিটা রাতেই সে একটু একটু করে ভেঙে পড়ে।
সেদিন রাতেও সে ঘুমাতে পারেনি।
ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় তিনটা ছুঁইছুঁই।

ঘরের সব আলো নিভানো, শুধু জানালার পাশে রাখা ছোট্ট ল্যাম্পটা জ্বলছে। সেই ম্লান আলোয় আকাশ চুপচাপ বসে ছিল।

বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু তার ভেতরে যেন ঝড় চলছে।
সে ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল।
কনট্যাক্ট লিস্ট খুলল।
অসংখ্য নাম।
ব্যবসার পার্টনার।
কর্মচারী।
সংগঠনের মানুষ।
পরিচিত।
বন্ধু।

কিন্তু সে হঠাৎ বুঝতে পারল - এই এত মানুষের ভিড়েও তার একজন মানুষ নেই।
এমন একজন নেই, যাকে সে এখন ফোন করে বলতে পারে -

“আমার খুব একা লাগছে।”

এই উপলব্ধিটা তার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল।
সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর ধীরে ধীরে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।
অনেকক্ষণ।

কোনো শব্দ নেই।
শুধু নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ।
হঠাৎ তার মনে হলো - সে ক্লান্ত।
খুব ক্লান্ত।
শরীর নয়।
হৃদয় ক্লান্ত।

বছরের পর বছর নিজের অনুভূতিগুলোকে চাপা দিতে দিতে, নিজেকে শক্ত দেখাতে দেখাতে, সব দায়িত্ব একা কাঁধে নিতে নিতে - সে ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে গেছে।

তার মনে পড়ল একটা কথা।
একবার তার মা বলেছিলেন -

“মানুষ যত বড়ই হোক, তার জীবনে একটা মানুষ দরকার, যার কাছে সে ছোট হয়ে থাকতে পারবে।”

তখন আকাশ কথাটার গুরুত্ব বুঝতে পারেনি।

আজ বুঝছে।
আজ তার মনে হচ্ছে - সে কোনোদিন কারও কাছে ছোট হতে পারেনি।
কোনোদিন মাথা রেখে বলতে পারেনি -

“আজ খুব কষ্ট হচ্ছে।”

তার চোখ ভিজে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
যেন কেউ দেখে ফেলবে।
অথচ ঘরে সে একা।

এই একাকীত্বটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
যেখানে মানুষ কাঁদলেও কেউ দেখে না।
চুপ থাকলেও কেউ বোঝে না।
সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা খুলল।

অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকল।
তারপর লিখতে শুরু করল -

“আজ হঠাৎ মনে হলো, আমি হয়তো কোনোদিন সত্যিকারের বাঁচিনি।”
“আমি শুধু দায়িত্ব পালন করেছি।”
“মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, কাজ করেছি, সফল হয়েছি।”
“কিন্তু নিজের হৃদয়ের পাশে কোনোদিন দাঁড়াইনি।”

কলম থেমে গেল।
তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
সে আবার লিখল -

“আমি জানি না ভালোবাসা কেমন।”
“কেউ কোনোদিন আমার হাত ধরে বলেনি -‘আমি আছি।’”
“আমিও কাউকে বলিনি -‘থেকে যাও।’”
“হয়তো এটাই আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।”

একফোঁটা জল ডায়েরির পাতায় পড়ে দাগ হয়ে গেল।
আকাশ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দাগটার দিকে।
তার মনে হলো - এই দাগটা যেন তার পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি।

অস্পষ্ট।
নিঃশব্দ।
অপূর্ণ।

সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ভয় পেল।
কারণ আজ সে বুঝতে পারছে - এই শূন্যতা শুধু একা থাকার নয়।
এই শূন্যতা অনুভূতি হারিয়ে ফেলার।

পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চোখের নিচের কালো দাগ দেখল।
ক্লান্ত মুখ।
অবসন্ন চোখ।
সে নিজেকে দেখে মনে মনে বলল -

“মানুষ আমাকে শক্ত ভাবে।”
“কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভাঙা, সেটা কেউ জানে না।”

সেদিন তার অনেক কাজ ছিল।
একটার পর একটা মিটিং।
ফোন কল।
লেনদেন।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।

কিন্তু সে লক্ষ্য করল - আজ তার হাসিটা আরও বেশি কৃত্রিম লাগছে।
সে কথা বলছে, কিন্তু মন নেই।
মানুষের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু অনুভব করছে না।
একসময় দুপুরে সে নিজের কেবিনে একা বসেছিল।
হঠাৎ বাইরে একটা ছোট্ট বাচ্চার হাসির শব্দ শুনতে পেল।
তার এক কর্মচারী তার মেয়েকে নিয়ে এসেছে।
ছোট্ট মেয়েটা বাবার হাত ধরে হাসছে।
বাবাও হাসছে।

সেই দৃশ্যটা দেখে আকাশের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
কারণ তার মনে হচ্ছিল - সে এমন একটা জীবনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেটা তার কোনোদিন হবে না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ অন্ধকার ঘরে বসে ছিল।
কোনো আলো জ্বালায়নি।
অন্ধকারের ভেতরে বসে থাকতে তার ভালো লাগছিল।
কারণ তার মনে হচ্ছিল - এই অন্ধকারটাই তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী।
হঠাৎ সে খুব গভীর একটা সত্য অনুভব করল।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার একা থাকা নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো -
কারও অভ্যাস না হয়ে ওঠা।
সে কখনো কারও প্রয়োজন হয়ে উঠতে পারেনি।
কেউ তার অপেক্ষায় ঘুম হারায়নি।
কেউ তার কষ্ট বুঝে নীরবে পাশে বসেনি।
কেউ তার অনুপস্থিতিতে শূন্যতা অনুভব করেনি।
এই উপলব্ধিটা তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিল।
সে আবার ডায়েরি খুলল।
এইবার তার হাত কাঁপছিল।
সে লিখল -

“আমি আজ বুঝলাম, ভালোবাসাহীন হৃদয় শুধু নিঃসঙ্গ হয় না - একসময় অনুভূতিহীনও হয়ে যায়।”
“আমি হাসি, কথা বলি, মানুষের পাশে দাঁড়াই।”
“কিন্তু আমার ভেতরে যেন কিছুই আর নড়ে না।”
“আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি ?”

প্রশ্নটা লিখেই সে থেমে গেল।
তার মনে হলো - এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না।
রাত আরও গভীর হলো।
বাইরে বাতাস বইছে।
জানালার পর্দা দুলছে।

আকাশ ধীরে ধীরে মাথাটা দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হচ্ছিল- তার পুরো জীবনটা যেন একটা দীর্ঘ করিডোর।
যেখানে অনেক মানুষ এসেছে, গেছে, কথা বলেছে -
কিন্তু কেউ থেমে থাকেনি।

আর সেই করিডোরের একেবারে শেষে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজে।
একটা ভালোবাসাহীন হৃদয় নিয়ে।

যে হৃদয় আজ প্রথমবার নিজের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছে।
সেই রাতের শেষে ডায়েরির শেষ পাতায় সে শুধু একটা লাইন লিখল -

“আমি কখনো কাউকে বলিনি আমাকে ভালোবাসতে… হয়তো এ কারণেই কেউ থাকেনি।”

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
কিন্তু আকাশের ভেতরে এখনো গভীর রাত।


(চলবে - পঞ্চম ও শেষ পর্বে আকাশ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের মুখোমুখি হবে, যেখানে সে বুঝবে - সব ভালোবাসা পাওয়া যায় না, কিছু ভালোবাসা শুধু অনুভব করেই বেঁচে থাকতে হয়…)

কফিনের বিচার চাই ... - সালাম মালিতা

 
লেখক - সালাম মালিতা 



কফিনের বিচার চাই 
- সালাম মালিতা 


ছিন্ন মস্তক, কব্জি দু’ভাগ 
কাটাছেঁড়া শরীর, 
নাসারন্ধ্র চিরতরে বন্ধ করতে 
তুলোর পুঁটলি-
লাশ ঘরে কেন আমি...?

আমি তো স্কুলে যেতে চেয়েছিলাম 
পড়তে চেয়েছিলাম-
মানুষের মত মানুষ হতে চেয়েছিলাম
তাহলে আমার এমন দশা কেন?
আট বছর বয়সে
যোনি দিয়ে রক্তপাত-
পায়ুপথের তীব্র যন্ত্রণায় বেহুঁশ, 
গলাটিপে শেষ আকুতি 
চিরতরের জন্য বন্ধ করা হল।
আমার অপরাধ কী ছিল?

একজন মা যিনি সন্তান জন্ম দেন
তার কাছেও আজ সন্তান সুরক্ষিত নয়,
আমি অবলা, আমি নিষ্পাপ 
আমি কার কাছে আশ্রয় খুঁজবো? 
পিতামাতার কনিষ্ঠ সন্তান হয়েও
সবার আগে দুনিয়া ছাড়া করা হল,
ভালো করে পৃথিবী দেখার আগেই 
কলঙ্ক দিয়ে চিরবিদায় করল..!
এই আধুনিক সভ্যতা....!
এই শিক্ষিত সমাজ...!
এই মানুষের বিবেক...!
এই শান্তিপ্রিয় মানবিকতা? 

সহপাঠীদের সঙ্গে কোমল শরীরে 
খেলাধুলা করছিলাম-
স্কুলে পড়াশোনা করছিলাম, 
সেই দেহ হায়নার শিকারের কবলে
পিঁপড়ে আর মাছিতে দখল নিয়েছে। 
আমার স্তনবৃন্ত পরিস্ফুটের আগেই
তাকে ভোগ করা হল,
পৃথিবীর আবাদ করতে না দিয়ে 
মাতৃত্বের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল।
ধিক্কার এমন সমাজের...!
ধিক্কার এমন বিচারের...!
ধিক্কার এমন আইনের....!
ধিক্কার এমন বিবেকের....!
যেখানে নির্মম যৌনাচারে হত্যার পরেও
মানুষ দোষীর পক্ষ নেয়,
টাকায় বিক্রি হয়ে 
তার অপরাধকে ধামাচাপা দিতে চায়!

আমার শক্তিসামর্থ্য মত
চিৎকার করে আমি হেরে গেছি,
আমার দুর্বল কণ্ঠস্বর 
বাবা-মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।
দূর গগনে তারা হয়ে
তাদের আহাজারি দেখছি আজ,
তাদের চোখের জলে 
শুকনো মাটি ভিজে যাচ্ছে!

শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বিবেকবান মানুষের কাছে 
একটাই দাবি-
আমার শৈশব, আমার হাসি, আমার শিক্ষা
আমার স্বপ্ন, আমার ভবিষ্যৎ-
শেষমেশ আমার জীবন কেড়ে নিয়ে 
বিনিময়ে শুধু সাদা কফিন দেওয়ার জন্য-
আমি আজ বিচার চাই!
আমার বিচার দেওয়া হোক....!

আমার চোখে নজরুল... - নন্দিতা গাঙ্গুলী

 
লেখিকা - নন্দিতা গাঙ্গুলী



আমার চোখে নজরুল  
- নন্দিতা গাঙ্গুলী

আমার চোখে নজরুল মানে শিকল ভাঙার গান,  
রক্তে লেখা দ্রোহের অক্ষর, বুকে বিদ্রোহী প্রাণ।  
তিনি শুধু কবি নন, তিনি ঝড়, তিনি প্রলয়-নাচন,  
আঁধার রাতের বুক চিরে আনা নতুন দিনের প্লাবন।  

আমার চোখে নজরুল মানে ধূলির ধূসর মাঠে  
একলা এক ফুল হয়ে ফোটা, কাঁটার সাথে হেঁটে।  
যে ফুলের গন্ধে ঘুম ভাঙে কুলি-মজুরের,  
যে সুরে জেগে ওঠে হার না মানা মন জমিদারের।  

তাঁর কলমে আগুন জ্বলে, আবার জোছনাও ঝরে,  
‘বিদ্রোহী’তে বাজ পড়ে, ‘বুলবুল’ এসে ঘর করে।  
এক হাতে তাঁর বিষের বাঁশি, অন্য হাতে প্রেমের,  
মসজিদের ওই আজান আর মন্দিরের ঘণ্টা যেন একের।  

আমার চোখে নজরুল মানে না-মানা পাখির ডানা,  
শাসন-ত্রাসন ভেঙে যার আকাশ ছোঁয়ার মানা।  
দারিদ্র্যকে বুকে টেনে বলা, “আমি কবি, আমি রাজা”,  
ভাতের থালায় কান্না লুকিয়ে লেখা “চল্ চল্ চল্” সাজা।  

তিনি প্রেমিক, তিনি দরবেশ, তিনি সৈনিক, তিনি গাজী,  
শ্যামা-সংগীতের সুরে কাঁদেন, গজলে হাসেন কাজী।  
হিন্দু-মুসলিম দুই চোখে তাঁর একই মায়ের ছবি,  
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, এই ছিল তাঁর হবি।  

আজও যখন নিয়মের দেয়াল চাপা দেয় নিঃশ্বাস,  
যখন ধর্মের নামে চলে বিভেদের চাষ,  
আমার চোখে নজরুল এসে কানে কানে বলেন,  
“মাথা উঁচু করে বাঁচ রে, তুই কারো দাস নোস”।  

তিনি মরেননি, তিনি আছেন মিছিলের ওই ভিড়ে,  
আছেন প্রতিবাদী স্লোগানে, আছেন প্রেমের নীড়ে।  
আমার চোখে নজরুল মানে হার না মানা এক আশা,  
শিকল পরা এই পৃথিবীর মুক্তির ভালোবাসা।  

আমার চোখে নজরুল মানে দ্রোহ আর প্রেমের একসাথে বাস। 
তিনি শুধু কবি নন, আমার সাহস।

সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস  সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার - সর্বানী দাস  লাশ হয়ে যাইনি এখনো মা'গো,  আমি এখনো ছটফট করছি ব্যথায়- ভাঙা হাড়ের টুকরোগুলো  বিঁধছে ...

জনপ্রিয় পোস্ট