সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস 

সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার
- সর্বানী দাস 

লাশ হয়ে যাইনি এখনো মা'গো,
 আমি এখনো ছটফট করছি ব্যথায়-
ভাঙা হাড়ের টুকরোগুলো
 বিঁধছে মজ্জায়,
বিঁধছে শিরায়-উপশিরায়...

উপড়ে নেওয়া চোখের কোটর
 গলগল করে নামছে রক্ত-
লোহার রডে ফালাফালা হওয়া যোনি— 
ভীষণ যন্ত্রণা মা'গো -
পারছি না.. আর সহ্য করতেপারছি না..

আজ এই নরকের শেষ তখতো রক্তাক্ত...
বুকের ভেতরে বাতাস ফুরিয়ে আসছে..
জিভটা জড়িয়ে যাচ্ছে মা..
পশুগুলো ভীষণ জোরে কামড় দিচ্ছিল-
আমার ছটফটানি দেখে 
ওরা উল্লাস করেছে মা..

আমার গোঙানি শুনে ওরা হাসছিল, 
বলছিল— "উচ্ছন্নে যাক মেয়েমানুষ!
এরা করবে দেশের সেবা দশের সেবা...
"আজ ওদের ঘরেও তো বোন আছে , 
তবে কেন..
কেন ওরা এত  জানোয়ার ?

ধিক্কার দিই এই নপুংসক সমাজকে...
 ঘৃণা করি এই কাগজের চাটুকারিতাকে..
যে দেশে মেয়েরা বাঁচে কুকুরের মতো, 
আর মরে অসুরের হাতে 
 বিচার আটকা পড়ে ফাইলে-বিয়ানে!
সেই দেশে নারীর যোনি চেরা আর্তনাদ শোনা যায় কি?

আইন নাকি অন্ধ? 
ওরে শোন! 
আইন অন্ধ নয়, 
আইন আসলে পঙ্গু আর ভীরু,
যেখানে ধর্ষক বুক ফুলিয়ে ঘোরে, 
আর মরে যায় আমার মতো সব জেনে ফেলা মেয়েরা বা -
কোনো ছোট্ট আট বছরের বাচ্চা...

কোনো মায়ের কোল খালি করার আগে, 
এবার হাত কাঁপবে তোদের- শকুনের দল!
তোদের বীরত্ব শুধু নারীর দেহে?
 তোদের পুরুষত্বে বিষাক্ত গরল?
 আজ মরার আগে 
এই ফালাফালা যোনি থেকে এক অভিশাপ ছুঁড়ে দিয়ে গেলাম—
তোদের যেন চরম শাস্তি হয় -
তোদের জীবনে যেন নামে চিরকালের নিকষ অন্ধকার -
যদি সমাজ পাল্টাতে চাও,
 তবে মোমবাতির নাটক এবার বন্ধ করো,
আদালতের নেতার আড়ালে ন্যায়ের ভিক্ষা নয়, 
ধর্ষকের গলা টিপে ধরো!
ফাঁসি দিয়ে হবে না রেহাই, 
তবু বিশ্বাস আজ জন্মেছে মা -
 সংবিধানের আবার সঠিক ব্যবহার হবে -
আমার শেষ স্বপ্ন অধরাই রইলো 
মা'গো... 

ওই তো! ওই তো তোমার হাত...
 তোমার আঁচলের গন্ধ পাচ্ছি বাতাসে,
আর কয়েকটা সেকেন্ড মাত্র...
 তারপর আমি হারিয়ে যাবো 
ওই দূর আকাশে।
আমি চলে যাচ্ছি মা, 
কিন্তু এই বন্ধ চোখে 
আমি এক নতুন আগুন জ্বেলে গেলাম,
এই নড়বড়ে নরক সমাজকে এক নারীর আর্তনাদ শোনালাম !
আমি মরছি না মা! 
আমি প্রতিটা ঘাতকের রাতের ঘুম কাড়তে আসবো,
সমাজের ওই অন্ধ আইনের মুখে নরকের রক্তমাখা হাতে।

নীরবতার সৌন্দর্য (একটি মননশীল নিবন্ধ) - জয়দীপ বসু

জয়দীপ বসু

নীরবতার সৌন্দর্য (একটি মননশীল নিবন্ধ)
- জয়দীপ বসু

আমাদের এই স্বপ্ন সুধাময়  স্বর্ণদ্যুতি সুবলিত পৃথিবীতে যারা সাফল্যের সুউচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নীরবে, নিভৃতে কাজ করেছেন।তাদের এই নিঃশব্দ সাধনাই  তাদের কাজের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। জীবনের অমৃতরসে অভিসিঞ্চিত করে। সাফল্যের জন্য সর্বাগ্ৰে প্রয়োজন মনঃ সংযোগ, একাগ্ৰ সাধনা, নীরবতা ও সঠিক কর্ম পরিকল্পনা। আগেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে, লোকজনকে জানিয়ে অধিকাংশ কাজেই চূড়ান্ত সফল হওয়া যায় না। কিছু দূর এগিয়ে থেমে যেতে হয়।

পড়াশোনার ক্ষেত্রে দেখেছি যারা জীবনে চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছেন তাঁরা নীরবে সাধনা করে একের পর এক কঠিন ধাপ অতিক্রম করে গিয়েছেন। তারপর সাফল্যের সুউচ্চ শৃঙ্গ স্পর্শ করেছেন। আর যারা সামান্য পথ অতিক্রম করেই তা নিয়ে ঢাকঢোল পেটাতে থাকেন তাদের চূড়ান্ত সাফল্য অধরাই থেকে যায়। শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই সাফল্যের অভিমন্ত্র হলো সঠিক পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে নীরবতা। নীরবতাই সৌন্দর্য।
জীবনে সাফল্য লাভের সব ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।

সভ্যতার ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করলে দেখি শ্রেষ্ঠ  সঙ্গীত সাধকরা নীরবে, নিভৃতে সুরের সাধনা করে গিয়েছেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত জেগে সাধনা করেই তাঁরা শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। বড় খেলোয়াড়রা নীরবে নিরলসভাবে অনুশীলন করে যান। একইভাবে বড় শিল্পী কিন্তু নিভৃতে কঠিন শিল্প সাধনায় ডুবে যান। বড় চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, স্থাপত্য বিশারদ, কবি, লেখক সকলেই কিন্তু নীরবে সুকঠিন সাধনায় নিজেকে নিমজ্জিত রাখেন। আসলে ফুল নীরবে ফোটে, তার ঐশ্বর্য, সৌরভ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।

এবার আসি প্রকৃতির জগতে। সুপ্রাচীন কাল থেকে হিমালয় পর্বত নীরবে ভারতকে রক্ষা করে চলেছে। তাই ভারতকে হিমালয়ের দান বলা হয়। তার অপার্থিব সৌন্দর্যের ইন্দ্রজাল মানুষকে মোহসিক্ত করে চলেছে। অনেক নদীই খুব ধীর ছন্দে বয়ে চলে। কিন্তু তাদের অপার ঐশ্বর্য। আর শ্যাম বনানী তো একেবারেই নীরবে সৌন্দর্য সুধা পান করায়।
তাদের রূপের অনাবিল মায়াদ্যুতি, সবুজ রাগ মূর্ছনা মানুষকে  অপরূপতার অবগাহন করায়। চিন্তা চেতনায় অস্ফুট মায়াবী চিত্রধ্বনি তৈরি করে।

আমরা দেখেছি সৃষ্টির সেই অনাদি লগ্ন থেকে আধ্যাত্মিক জগতে যারা সিদ্ধিলাভ করেছেন তাঁরা কি কঠিন সাধনা নীরবে করে গিয়েছেন। তবেই তাঁরা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী / অধিকারিণী হয়েছেন। এই অলৌকিক ক্ষমতা জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নীরব সাধনাই অলৌকিক ক্ষমতার জন্ম দেয়। তার সাফল্যের মধু কিরণ সকল হৃদয়কে প্লাবিত করে যায়।

অতএব জীবনে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে গেলে নীরবে সাধনা করে যেতে হবে। যার সাধনা যত বেশি তার সিদ্ধিলাভ তত বেশি।

রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

প্রবন্ধ : একটি গাছ একটি প্রাণ - সর্বানী দাস


 প্রবন্ধ :
 একটি গাছ একটি প্রাণ 

- সর্বানী দাস 


"পৃথিবী আমরা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাইনি; 
আমরা এটি আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।”
- নেটিভ আমেরিকান প্রবাদ

ভূমিকা 🌴

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী অভূতপূর্ব পরিবেশ সংকটের মুখোমুখি। যে প্রকৃতি একদিন মানুষকে দিয়েছিল নির্মল বাতাস, শীতল ছায়া, উর্বর মাটি ও জীবনের অফুরন্ত সম্ভার, আজ সেই প্রকৃতিই মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডে বিপন্ন। বনভূমি উজাড় হচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, বায়ু দূষিত হচ্ছে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক উন্নয়নের নামে আমরা প্রকৃতির বুক থেকে সবুজ কেড়ে নিচ্ছি, অথচ ভুলে যাচ্ছি—প্রকৃতি ধ্বংস মানেই মানবসভ্যতার ভিত্তি দুর্বল করে দেওয়া।

এই বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ কেবল পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম।


সবুজ হারানোর করুণ বাস্তবতা 🌴

একসময় গ্রামবাংলার পথঘাট, মাঠ, বনভূমি এবং নদীতীর সবুজে আচ্ছাদিত ছিল। শাল, তমাল, বট, অশ্বত্থ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় মানুষ যেমন আশ্রয় পেত, তেমনি অসংখ্য পাখি ও প্রাণী খুঁজে পেত নিরাপদ আবাস। কিন্তু আজ নগরায়নের বিস্তার, অবাধ বৃক্ষচ্ছেদন এবং শিল্পায়নের ফলে সেই সবুজ পৃথিবী দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।

ইট-পাথরের অট্টালিকা বাড়ছে, কিন্তু কমছে বৃক্ষের সংখ্যা। ফলে শহরগুলো ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মানুষের তৈরি কংক্রিটের জঙ্গল প্রকৃতির স্বাভাবিক শীতলতাকে গ্রাস করছে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই নয়, মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও পড়ছে।


গ্রিনহাউস গ্যাস ও উষ্ণায়নের বিপদসংকেত 🌴

পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। শিল্পকারখানা, যানবাহন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। এই গ্যাসগুলো সূর্যের তাপকে পৃথিবীর চারপাশে আটকে রাখে এবং ধীরে ধীরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে।

ফলস্বরূপ মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা এবং দাবানলের মতো দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে এক অজানা বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে।


আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বাস্তবতার ফারাক 🌴

পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রিও সম্মেলন, কিয়োটো প্রোটোকল এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল পরিবেশ দূষণ কমানো এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় অনেক দেশ এখনও পরিবেশগত অঙ্গীকার যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো অনেক সময় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এই পরিস্থিতিতে কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।


কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন 🌴

বৃক্ষ কেবল অক্সিজেনের উৎস নয়; কৃষি ও জীববৈচিত্র্যেরও প্রধান সহায়ক। বনভূমি বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে, মাটির উর্বরতা রক্ষা করে এবং ভূগর্ভস্থ জলের ভারসাম্য বজায় রাখে। যখন বনভূমি ধ্বংস হয়, তখন প্রকৃতির এই স্বাভাবিক চক্রও ব্যাহত হয়।

ফলে কৃষক খরার কবলে পড়েন, ফসল উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখা দেয়। পাশাপাশি অসংখ্য পাখি, প্রাণী ও উদ্ভিদ তাদের আবাসস্থল হারায়। জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষয় ভবিষ্যতের পৃথিবীকে আরও অনিরাপদ করে তুলছে।


দাবানল ও মরুকরণের আশঙ্কা 🌴

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এবং বনভূমি ধ্বংসের ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। লক্ষ লক্ষ গাছপালা এবং প্রাণীর জীবন বিনষ্ট হচ্ছে।

অন্যদিকে বহু উর্বর অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে, জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।


বৃক্ষরোপণ : আশার সবুজ দিশা 🌴

পরিবেশ সংকটের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ প্রতিরোধ হলো বৃক্ষরোপণ। একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না; এটি বাতাসকে বিশুদ্ধ করে, কার্বন শোষণ করে, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং পরিবেশকে পুনরুজ্জীবিত করে।

বিদ্যালয়, কলেজ, গ্রাম, শহর, রাস্তার ধারে কিংবা বাড়ির আঙিনায়—যেখানেই সুযোগ আছে, সেখানেই বৃক্ষরোপণ করা উচিত। পাশাপাশি রোপিত গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একটি চারাগাছকে বড় করে তোলার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে রক্ষা করার সম্ভাবনা।


উপসংহার 🌴

আজ পৃথিবী আমাদের কাছে একটি প্রশ্ন রেখেছে—আমরা কি ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাব, নাকি সবুজের পথে ফিরে আসব? উত্তরটি আমাদের হাতেই। যদি আমরা এখনই সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্মকে একটি উষ্ণ, দূষিত ও বিপর্যস্ত পৃথিবী উপহার দিতে হবে। কিন্তু যদি আমরা বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে পারি, তবে এখনও সময় আছে পরিস্থিতি বদলানোর।

তাই আসুন, অঙ্গীকার করি—একটি গাছ কাটা হলে অন্তত কয়েকটি গাছ লাগাব। প্রকৃতিকে ভালোবাসব, বনভূমি রক্ষা করব এবং সবুজ পৃথিবী গড়ার অভিযানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করব। কারণ একটি চারাগাছের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের নির্মল বাতাস, শান্ত ছায়া এবং মানবসভ্যতার নিরাপদ ভবিষ্যৎ।

🌴----------------------------------------------🌴

- সর্বানী দাস 


নীরব দর্শক - ড.তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়

ড.তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়

নীরব দর্শক 
- ড.তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়

তোমার নিঃশব্দ আঘাতে
শুধু কষ্ট পেয়েছি তাই নয় ,
হৃদয়ে রক্ত  ঝরেছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে ,
নির্বাক মৌন করেছে মোরে ,
তাই তো নিঃসঙ্গ একাকী হয়ে
চুপচাপ থাকা ।

বাইরে কত হই হুল্লোড়  ,
কত আনন্দ  ,
তবু মানুষগুলো ভিতরে ভিতরে
কত নিঃসঙ্গ কত একা ,
ঠিক যেন আমার মতো  !

এই রকম তো হবার কথা ছিল না ,
আমার জীবন টা আমাদের জীবন টা
পাল্টে যেতে তো পারতো ,
পারতো পাল তোলা নৌকার মতো
নিস্তরঙ্গ  নদীতে বয়ে যেতে ,
শীতল সমীরণে হৃদয় মন তো
শান্ত হতে পারতো  !

কিন্তু তা তো হোল না ,
নদীর দুই পাড়ে দুই জন ,
ওপারের ঝড় এপাড়ে আলোড়ন তোলে ,
এপাড়ের ঢেউ ধীর গতিতে
ওপারে ধাক্কা মারে  হয়তো ,
নিঃসঙ্গ একাকী চুপচাপ থেকে
দুই জনের দুই পাড়ে থাকা
নীরব দর্শক হয়ে  ।

কালো দুধের দেশ - সালাম মালিতা

সালাম মালিতা 

কালো দুধের দেশ 
- সালাম মালিতা 

কেমন একটা উল্টো রাজার দেশে
উল্টো দিকে মুখ করে হেঁটে চলেছি,
না না-নাক,কান, মুখ সবই আছে 
কিন্তু সবগুলোই উল্টো। 
আর বিবেকের কথা বলছেন 
সে-তো বহু আগেই মারা গিয়েছে-
এতদিনে সেটা ফসিল। 

দামি দামি শার্ট-প্যান্ট, কোট পরি
সাথে লম্বা টাই ঝোলায়,
তবে সবকিছুই উল্টো থাকে..!
দিনে নিয়ম করে তিনবেলা খায়
শুধু পার্থক্য হল-
খাবারের পরিবর্তে-গরীবের হক,
রাতে যথারীতি ঘুমায় 
কারো না কারো চোখের ঘুম কেড়ে। 

ডিগ্রির কোনো অভাব নেই 
শুধু নেতানো বিবেক,
লেবাসধারী ধার্মিক আমরা
মানুষকে কষ্ট দিয়ে-
উল্টো পথে আয় করি।
তৃষ্ণা পেলে তরল পান করি
তবে জলের পরিবর্তে-
শোষনের কালো দুধ,
লেখালেখির বেশ শখ আছে
সাধুর বেশ ধরে তোয়াজ করে-
দোষীর গায়ে হাত বুলিয়ে চলি।

আমাদের দেশে চাঁদ, তারা, সূর্য 
ফুল-ফল, পাখি,নদী-সবই আছে
শুধু আকাশটা কালো মেঘে ঢাকা, 
চারদিকে ধোঁয়াশা, কুয়াশা 
আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। 
এখানে আইন-কানুন, পুলিশ-কোর্ট
সবই আছে....
সবকিছুই আছে, 
তবে সবার চোখে কালো পটি-
আর আইন নিজেই লালসায় কারাবন্দি!

বিপ্লবী কথা - রত্না রায়


 বিপ্লবী কথা
 - রত্না রায় 

বিপ্লবী গণ প্রাণ দিয়েছে দেশকে স্বাধীন করতে।
ব্রিটিশ দল ফাঁসি দিলো শাসন শোষণ চালাতে।
ক্ষুদিরাম বসু,সূর্যসেন ( মাস্টার দা), 
কানাই লাল দত্ত,তারকেশ্বর দস্তিদার ... 
ফাঁসির যন্ত্রণা সইলো,
ইংরেজদের বিচার এড়াতে প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করলো।

স্বাধীনতা যাঁরা ছিনিয়ে এনেছে, তাঁরা আছে , থাকবে অন্তরে,
ভারত মাতার সন্তান ত্যাগের শোক, ব্যথা আজও ওড়ে প্রান্তরে।

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বিপ্লবী সংগ্রাম দেখেছে বিশ্ব নিখিল,
রণবীর শৌর্য,ইতিহাসে অলংকৃত  করেছে অখিল।
ভগৎ সিং,উধাম সিং আরও বহু শ্রদ্ধেয় প্রাণ ,
জীবন করেছে উৎসর্গ ,চায়নি দেশের অপমান।

বিপ্লবীদের বিপ্লবে পেয়েছি মোরা স্বাধীনতার জয়,
ভুলিনি সে নিঠুর কথা,,
পাঠ্য বইতে হোক উদয়।
উল্লাস কর দত্তের সাহসী কর্ম যজ্ঞ ভীত করেছে ব্রিটিশ দলকে,
কাবু করতে অপারগ ব্রিটিশ  পাগল বানিয়ে মেরেছে পলকে।

বিপ্লবীদের বিপ্লব কান্তি দিয়েছে স্বাধীকার,
পাঠ্য বইতে শোভিত হোক বিপ্লবী যোদ্ধাদের কীর্তি ,অগ্রাধিকার।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার মাতঙ্গিনী হাজরা আরও আছে বহু শ্রদ্ধেয়া গুণী,
ইতিহাসের পাতায় ভরা জীবন যন্ত্রণা পড়েছি, হৃদয়ে রেখেছি বুনি।

ভেঙো না মেঘ ! - মেফ্তাহুল জান্নাত


 ভেঙো না মেঘ ! 
- মেফ্তাহুল জান্নাত 

তোমায় আমি ভাঙতে চাইনা মেঘ!
জানি এমন বাঁধন জুড়ে, দু’খানা মন আটকে পড়ে—
আমিই তোমায় মুক্ত করার করেছিলাম পণ?
সেই কথাতে রাত পোহালো, আবেগ নদী কুল হারালো;
মেঘ-বৃষ্টির এবার পালা ভীষণ বিসর্জন!
তাই তো ভয়, এ সংশয়– ভীষণতর কষ্ট হয়!
তোমার বুকে বিঁধবে কী-না আমার ভুলের ক্ষয়?
আমার বুকের ব্যথায় এখন কীসের অবক্ষয়! 
মেঘ— যেও না দূরে, মেঘ? বৃষ্টি এমনই হয়?

ওই যে জল ঝর্ণা হতে, যায় যে ঝরে মুক্ত হতেই
দেখায় অমন অক্লেশে সে; 
আনন্দতেই বয়—
তাও কি বলো পাহাড়-ছোঁড়া’র;
এই বেগতিক অশ্রুধারার— হয়েছে অপচয়?
হয়তো প্রেম এমনই অন্ধ,
হয়তো রাতের জীবন কারাবন্ধ!
তাও তো হাতের কড়ায় গোনা অগণন স্বপ্ন বয়?
জানি হঠাৎ প্রস্থান ভয়, আছে যে তা–নিঃসংশয়!
মুষড়ে পড়বে হাজার স্মৃতির দালান-কোঠার দেহ, 
ভিত্তি গড়া এসব রাত, আগ্নেয়গিরি ও শীতকাল!
অনিঃসীম প্রলয়!
প্রলয়… প্রলয়…

তোমায় আমি ভাঙতে চাইনা মেঘ, চাইনি জানো!
তবুও এমন কাছে টেনে, বৃষ্টি মেঘের রাগভাঙানো,
বিষাদ ও প্রেম গাল মেলালো— দুঃখমনে স্বপ্ন এলো,
এইযে এমন সুতোয় বাঁধা,
শাড়িতে– আঁচলে অনেক কথা— হারায় বেখবর!
বৈরাগ্যতার অনেক ব্যথা—- প্রেমও স্বার্থপর?

দুঃখ জেনেই ভালোবাসে, মেঘ-বৃষ্টি অবিনাশে,
কষ্টগুলো মেঘলা রাতের ঝড়ের মতো ওই আকাশে…
ছেঁড়া ফুলের গন্ধ মাখা, চাঁদের রাতের আলোকপাতে
ভুলিয়ে মারে সকল ভয়, যুক্তিরা সব হারিয়ে লয়—
বোকাপ্রেমে বোকা সাজে কবিতারই ছন্দতে!

তোমার ভাঙন, আমার মরণ–মৃত্যু আনে এসব স্মরণ!
রক্তক্ষরণ, অন্তীমতা— বুকে বিঁধে বিদায়কাঁটা।
কষ্ট তোমার মুছে দিতেই তটস্থ খুব হই…
তাও যদি ওই শমন আসে, এই ব্যপ্তির বলয় নাশে?
তখন আমার শুনবে বারণ? করবে জীবন অনুসরণ? 

জীবন কেনও এমনতর?
ভাগ্যবিধির ভয়ের চাদর, জোড়াতালির সুতোয় আদর?
আসে আবার ভয় ও ভাঙ্গন, খণ্ডবিখণ্ডন…

তবুও এসো কোলটি ঘেঁষে, এই আবহ ভালোবাসে;
কাছে এসে— কাছে এসে—
জুড়াও ততক্ষণ।

ভাঙন তোমার আসলে পরে, মুদবো নয়ন দূরে সরে,
তোমার ভাঙন ভয়ের তোড়ে, এই জানলা আছড়ে পড়ে!
ভুলের মাশুল না-কী সুখের? ভয়ের নাকি এই অসুখের? 
কীসের মাশুল তোমায় ডাকে? মৃত্যু আপোষের?

তোমায় আমি ভাঙতে চাইনা আজও,
তুমি বাঁচো..  তুমি বাঁচো… শুধুই বাঁচো!! 
জীবনে বাঁচো, প্রেমে বাঁচো
আঁচে বাঁচো, ওমে বাঁচো, সকল ভুলে আবার বাঁচো.. 

আছি কাছে। আছি আজও।
ভেঙোনা মেঘ, ভাঙনে বড় ভয়।

💢-----------------------------💢

মেফ্তাহুল জান্নাত 


আমার শপথ - শিশির হুদা



আমার শপথ 
- শিশির হুদা 

আমি ফিরবো বলে শপথ নিয়েছি
ঘুরে দাড়ানোর জন্য আত্নসম্মান আকড়ে ধরেছি, 
যারা বলছে আমার মনে নেই জোর
ফিরব আমি আলো হাতে পাবো কোন এক ভোর।

আমি জিতবো বলে শপথ নিয়েছি 
ময়দানে লড়বো চোখে রেখে চোখ বলে রেখেছি
সবাই হয়তো বলবে সামনে ঘোর অন্ধকার 
আমার কাছে  আছে বিশ্বাস যা হবে অঙ্গীকার।

আমি হাসবো বলে শপথ নিয়েছি 
যা আমাকে দেবে ভরে দু:হাত যা আমি পেয়েছি
বলবে সবাই করিনি আশা এতোদুর যাবো আমি
বলবো আমি ওরে বড় স্বপ্ন জীবনে আমার জানে অন্তর্যামী।

ব্যঙ্গে লেখা... -দেবাশীষ হালদার

দেবাশীষ হালদার 

ব্যঙ্গে লেখা
-দেবাশীষ হালদার 

রঙ্গকরে ব্যাঙ্গে লেখায় লাগে  বেজায় কেরামতী
সাহিত্যে কি পড়ে এ লেখা যেথায় কথার যাদুকরী ।

সুকুমার বা অন্নদাশঙ্কর, রায কি পেলেন বড়কবি ?
সাহিত্যের মানে এসব লেখা বড় আজগুবি !

কঠিন কথা বলতে সোজা ব্যাঙ্গে যদি রাখো
রাজা-উজির ধরে না তা যতই তাদের বলো ।

হেসে হবেন লুটোপুটি যেন কত মজার কথা
এই মজাতেই রাজা- উজির কাটে প্রজার মাথা ।

বুদ্ধি করে শোনায় কবি রাজা-প্রজার কাহিনী
সাহিত্য তার নয়তো লক্ষ্য, কথা বলাটা জরুরী ।

এসব পড়েই চিত্রকর চিত্রশিল্পী পায় অনুপ্রেরণা
ক্যানভাসে আঁকা ছবি,চলৎচিত্রে পাই প্রচুর নমুনা ।

থাকুক বেঁচে অল্প-স্বল্প সোজা কথা বলার লোক
সাহিত্যে থাক পাশে , নীচুমাথা উঁচু করাই হোক ।

বর্ষার ছন্দে... - সৌরভী করমহাপাত্র


বর্ষার ছন্দে
- সৌরভী করমহাপাত্র

মেঘলা আকাশ শীতল বাতাস
পাগল মনে দেখা, 
তপ্ত ধরায় তৃপ্তি ভরায়
ফোটে হাসির রেখা।

গাছের দোলা আপন ভোলা
সিক্ত ধরার মাটি, 
বর্ষণ মুখর মেঘের গরগর
ফলবে ফসল খাঁটি।

পুকুর নদী ভরে যদি
বাঁচবে তবে সৃষ্টি, 
আপন বেগে নয়তো রেগে
ঝরছে ক্রমে বৃষ্টি।

স্বচ্ছ পাতা তরুর ছাতা
দুলে দুলে নড়ে,
বোটা খসে পাকল রসে
আম ও জামরুল পড়ে।

খেজুর কুলে হৃদয় ভুলে
হলুদ রঙে গাছে,
কাঁদি ধরে বর্ষা ঝরে
পাকতে দেরি আছে।

বৃষ্টির সুরে সৃজন ঘুরে
গজায় কচি চারা,
সৃষ্টি সুখে খুশি মুখে
ধরা পাগল পারা।

💦----------------------------------------------------------💦


সৌরভী করমহাপাত্র


শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

লাভের কড়ি - দীপ্তি নন্দন

- দীপ্তি নন্দন 

লাভের কড়ি
- দীপ্তি নন্দন 


সেদিন সন্ধেবেলা তার ঘরের  দাওয়ায় হরিশ খুব মনমরা হয়ে বসেছিল। একটু আগেই  সুকুলের ঠেক-এ গিয়ে কয়েক গেলাস ধেনো চড়িয়ে এসে তারই নেশায় নিজের পোড়া কপালের কথা ভাবছিল বসে বসে।সেই দুপুরে এক মুঠো ভাত খেয়েছিল সে তারপর আর পেটে কিছু পড়েনি। উপরন্তু বৌ -এর লুকোনো টাকা থেকে পয়সা নিয়ে সে মনের দুঃখে ধেনোর ঠেক -এ গিয়েছিল।

খালি পেটে নেশাটা যেন ভীষণ জোরদার হয়েছে মনে হচ্ছে তার।
এখন ভরা বর্ষায় মাছ ধরার মরশুম চলছে, কিন্তু তার নৌকোর তলাটা ফেঁসে অকেজো হয়ে পড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে। হাতে এমন  পয়সা নেই যে সারাবে। এসময় কেউ চট করে নৌকো ব্যবহার করতে দিতেও চাইবেনা।এখন তার নৌকো নেই ,টাকাও নেই তাই এবার নদীতে মাছ ধরার পারমিটও নেওয়া হয়নি। তাই সে এখন বেকার হয়ে ঘরে বসে আছে আর দুবেলা বৌ - এর মুখ ঝামটা শুনছে। কারণ বৌ এখন অন্যের বাড়ির ধান, চিঁড়ে কুটে, মুড়ি ভেজে সংসার চালাচ্ছে।

মনের দুঃখে একপেট ধেনো খেয়ে সে দাওয়ায়  বসে থেকে থেকে একসময় শুয়েই পড়ে ছিল। এমন সময়,শোনে একটা চাপা গলা --

" এ্যাই হরিশ আজ একটু বেশি রাতে যাবি নাকি মাছ ধরতে? "

এটা কালুর গলা না! 'হরিশ লাফিয়ে উঠল। 

সাগ্রহে বলল," কোথায় রে?"

  কালু বলে, " কেন, নদীতে ! অনেক মাছ  পাওয়া যাবে এখন গেলে । যাবি তো বল্!
---   "সে কি রে? ওখানে রাতে পাহারা থাকে না?"

---" হ্যাঁ থাকে তো। কিন্তু আমার কাছে খবর আছে, জল পুলিশের পাহারার লঞ্চ আজ এদিকে থাকবে না,  অন্য দিকে থাকবে।কাল সকালের আগে ফিরবে না। "

 ---"  তাই নাকি? আচ্ছা তবে চল্ ! "হরিশ চুপিচুপি দাওয়ার একধারে রাখা মাছ ধরার সরঞ্জামের ঝোলা আর খেপলা জালটা নিয়ে বলে,-- 

" চল এবার দেখি কটা মাছ নিয়ে আসতে পারি। "

কালু, হরিশের মাছ ধরার নানা কৌশলের কথা জানতো। জানতো তার অব্যর্থ কোঁচ দিয়ে গেঁথে মাছ ধরার দক্ষতার কথা। তাই আজকের এই পাহারাহীন নদীতে মাছ ধরে কিছু বেশি লাভের কড়ি গোনবার জন্যই তো তার হরিশকে সঙ্গে নেওয়া! 

একটুক্ষণ পরেই অন্ধকারে দুটি ছায়া মূর্তি সকলের অগোচরে নদীর দিকে রওয়ানা হয়।একটা নিরিবিলি অন্ধকার ঘাটে কালুর নৌকোটা বাঁধা ছিল। দুজনে নিঃশব্দে নৌকোয় গিয়ে ওঠে। ঘাটের ধারের বড় গাছটায় বাঁধা রশি খুলে ঠেলে জলে নামিয়ে দিতেই নৌকোটা নদীর স্রোতে তরতরিয়ে চলতে থাকে।একটু পরে ঘন অন্ধকারের মধ্যে বিশাল বড়ো নদীর অথৈ কালো জলে নিঃশব্দে কালু তার নৌকো বাইতে থাকে আর হরিশ তার খেপলা জালটা ফেলে মাছ ধরার তোড়জোড় করতে গিয়ে দ্যাখে ,ঠিক নৌকোর পাশেই বড়ো বড়ো মাছ খলবল করছে ।  

সে বুঝল,এত কাছ থেকে মাছ ধরতে এই জালে কোনো কাজ হবে না।সে তার জাল গুটিয়ে রেখে মোক্ষম অস্ত্র  কোঁচটি বের করে  হাতে কোঁচ চালিয়ে  মাছ গেঁথে  তোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ধেনোর নেশায় হাত ঠিক মতো না চালাতে পেরে  খুব একটা বেশি মাছ গেঁথে তুলতে পারলনা। কালু ,হরিশের এই  বিশেষ গুণের কথা জানত বলেই, তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু নেশার ঘোরে এই হঠাৎ পাহারাহীন নদী থেকে ফায়দা তুলতে সে অপারগ হচ্ছে দেখে রেগে গিয়ে বলল, --  

" তুই যে নেশা করে আছিস আগে আমাকে বললি না কেন?   আজকের দিনটাই তো মাটি করে দিলি একেবারে। আমার তো সবটাই ক্ষতি।এতক্ষণ ধরে  নৌকো চালিয়ে লাভ কি হলো! ঐ দুএকটা মাছ বিক্রি করে ক'টা টাকা পাওয়া যাবে ? এর চেয়ে আমি একা এলে তবুও লাভ থাকত কিছু! "

রাগে সে গজগজ করতে লাগল। হরিশ অনেকক্ষণ ধরে  কালুর কথাগুলো শুনছিল।  তারও তো পরিশ্রম হয়েছে যথেষ্ট। ক্লান্ত হয়ে সে নৌকোর গলুই- এ বসে হাঁফাচ্ছিল। একেই কদিন তার কোনো আয় নেই। তেমন খাওয়াও জুটছে না, তার ওপরে রয়েছে ধেনোর নেশার প্রভাব।তাই ক্লান্তির মাত্রাটা একটু বেশিই ছিল হরিশের।

কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করার পর কালু নৌকোর একেবারে ধারে বসে ঢুলতে লাগল ঘুমে। তার আগেই সে পাড়ের কাছাকাছি একটা খুঁটিতে তার নৌকোটা বেঁধে রেখেছিল।

হরিশ ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়ে শুতেই যাচ্ছিল। তখনি হঠাৎ একটু আগে বলা কালুর কথাগুলো ভেবে তার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল।

তখন হঠাৎই হরিশের মনে হলো, আচ্ছা আর তো কেউ জানে না, আজ কালুর আর তার রাতের অভিযানের কথা !এখন যদি সে কালুকে তার রাস্তা থেকে হটিয়ে দেয়, তাহলে কেউই তো  কিছু জানতে পারবে না।খোলের মধ্যে যে পরিমাণ মাছ আছে , কাল সকালে নদীর ঘাটে কিংবা হাটে বিক্রি করতে পারলে, কিছু তো পাওয়া যাবে! 

সে নৌকোর পাশে বসে ঘুমে ঢুলতে থাকা  কালুর গলায় পেছন থেকে তার হাতের কোঁচটা চালিয়ে দিয়ে, ঠেলে ফেলে দিল তাকে জলের মধ্যে। হরিশ দেখল তার কোঁচের ঘায়ে, কালুর গলাটা প্রায় পুরোটাই কেটে দুই টুকরো হয়ে গেছে। এবার সে খুব নিশ্চিন্ত হয়ে নৌকোর মধ্যে শুয়ে  পড়ল, আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়েও পড়ল। 

অল্পক্ষণ পরেই তার মনে হলো যেন নৌকোর পাশেই একটা বড়ো মাছের খলবলানির শব্দ আসছে। সে উঁকি মেরে দেখে একটা বিশাল মাছ নৌকোর ঠিক পাশেই খলবল করছে। সে হাতের কোঁচটা চালিয়ে দিয়ে সেটাকে একবারেই গেঁথে , অনেক কষ্টে সেই বৃহৎ মাছকে নৌকোর খোলে তুলে রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। 

ভোরের আলো ফুটে গেলেও তার সেই ঘুম ভাঙলো না। এদিকে উপকূল রক্ষী বাহিনীর লঞ্চ এদিকে ততক্ষনে চলে এসেছিলো। তারা কালুর নৌকায় হরিশকে অঘোরে ঘুমোতে দেখে তাকে ওঠাতে গেলো।

জল পুলিশের লোকের লাঠির খোঁচা  খেয়ে  ঘুম ভাঙল হরিশের। বেআইনি ভাবে পারমিট ছাড়া মাছ ধরার অপরাধে তাকে ধরতে গেলে, সে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে ,-- 

" হুজুর যে মাছ ধরেছি তার  থেকে কটি মাছ আপনার বাড়িতে পাঠিয়ে দিই! " 

পুলিশের লোক কিছু বলার আগেই ঝামেলা থেকে ছাড় পেয়ে যাবার আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সে নৌকোর খোল থেকে মাছ বের করতে গেল। 

পাশ থেকে পুলিশ ইন্সপেক্টর  উঁকি মেরে দেখতে গেলেন কত মাছ রয়েছে সেখানে , কিন্তু  তাঁরা অনেক মাছের বদলে দেখলেন, নৌকোর খোলের মধ্যে কালু, তার প্রায়  দু ফাঁক করা গলা নিয়ে সেখানে শুয়ে আছে!


বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

মা যখন লাশ - সালাম মালিতা

সালাম মালিতা 

মা যখন লাশ 
- সালাম মালিতা 

শরীর জুড়ে ভীষণ দুর্গন্ধ 
পচা-গলা মাংসপেশিগুলো খুলে খুলে পড়ছে,
ঈদের আনন্দে পুরো দেশ যখন 
সেমাই-পায়েস, মাংস-পোলাও খেতে ব্যস্ত-
মাছি,পিঁপড়ে,আরশোলা, মাইটেরা তখন
মহাতাণ্ডব চালিয়ে আমার শরীর দখল নিয়েছে।
মানুষের ঘরে ঘরে যখন
আতর-পারফিউমের সুগন্ধে ম-ম করছে,
তখন আমার ঘরটা লাশ পঁচার বিটকেল গন্ধে
নাসারন্ধ্রকে উত্যক্ত করতে শুরু করেছে।

দশমাস উদরে সযত্নে রেখে
যে সন্তানদের লালন-পালন করলাম, 
তাদের উচ্চ শিক্ষার কাছে 
আমার সেই প্রাচীন মমত্ব বড্ড অসহায়। 
শিক্ষক, প্রফেসর, প্রবাসী 
নামকরা মানুষ হলেও শিকড় ভুলে গেলো ,  
ইয়াব্বড় বড় ডিগ্রি আর নামি-দামি কোর্ট-প্যান্ট 
তারা সব মেকি জেন্টলম্যান...!

জীবনের পঁচাত্তরটা বসন্ত কেটেছে
সন্তানদের নিয়ে একটু সুখের আশায়, 
সন্তানেরা বড় হল, বড় চাকরি পেল
অনেক অর্থ উপার্জন করল-
কিন্তু এক টুকরো সুখ আর মাকে দিতে পারলো কই...!
ঘরের ব্যয়বহুল আসবাবপত্রের মাঝে 
মৃতপ্রায় বুড়িটাই ছিল সর্বনিম্ন পণ্য, 
তাই গৃহবন্দি করে জীবনের অন্তিম মুহুর্ত কাটল
নির্জলা হয়ে। 
জল পিপাসায় বুকের পাঁজর 
দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও 
আর্তনাদ শোনার মত কেউ ছিল না,
তথাকথিত শিক্ষিত সভ্যতার ভাগাড়ে
কুসন্তান শকুনেরা শেষ বয়সে আর খুবলে ছিঁড়ে খেল!

সন্তানের জন্য সকল খুশির জলাঞ্জলি দিয়ে 
সকল চাওয়ার বলিদান দিয়ে..
আবেগ-অনুভূতি সব বিসর্জন দিয়ে...
তাহলে এই ছিল আমার কপালে..! 
পৃথিবীর আবাদকারী একজন মায়ের ভালে
সৃষ্টিকর্তা এই বিধান লিখেছিলেন..? 

যমদূতের অনাগ্রহ সত্ত্বেও 
পৃথিবীর বুকে সন্তানরূপী যমদূতরা-
টেনে-হিঁচড়ে দমটা বার করে নিল,
এই তাদের শিক্ষিত বিবেক...!
এই তাদের আধুনিকতা...!
এই তাদের সভ্যতা...!
এই তারা আধুনিক মানুষ..? 

যে মায়ের পায়ের নিচে সৃষ্টিকর্তা 
এক টুকরো স্বর্গ রেখেছেন, 
হায়! সেই মায়ের শেষ পরিণতি হল এতটাই নির্মম...!
নিজের পুরো জীবনটা সন্তানের জন্য উৎসর্গ করেও
নিজের দুধের ঋণ পরিশোধে-
রক্তমাখা কলিজা খেয় নিল ঐ নরখাদকেরা-
আর জনমদুখিনী মা হল এক লাশ....!!

চেতনার ভাঙা আয়নায়.... - মুন্নাফ সেখ


চেতনার ভাঙা আয়নায়
- মুন্নাফ সেখ

যে মাটির বুকে মিশে আছে আজও বীর শহীদের রক্ত,
সে মাটি ভুলেছে আপন ইতিহাস, আজ শুধু ধর্মের ভক্ত।
হিন্দু-মুসলিমে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল সেই রণে,
দেশমাতা ছিল সবার উপরে, ভেদ ছিল না কো মনে।
তিতুমীর আর মঙ্গল পাণ্ডে গড়েছিল একই ধারা,
ক্ষুদিরাম, আশফাকুল্লাহ দেশের জন্য হয়েছিল আত্মহারা।
নেতাজির ডাক, আজাদের জেদ কাঁপিয়েছিল ব্রিটিশের ঘর,
এক থালায় খেয়ে এক সাথে সবে তাড়ালো বিদেশী পর।
সেই স্বাধীনতা আজ ধুলোয় মেশে একাকী কাঁদে এক কোণে,
দেশপ্রেমের সেই খাঁটি আগুন আর জ্বলে না কারো মনে।

সেই ভারত আজ টুকরো হয়েছে রাজনীতির বিষাক্ত চালে,
ক্ষমতার লোভের বিষ ঢালা হচ্ছে ভাইয়ে-ভাইয়ের গালে।
ব্রিটিশ আমলে শত্রু ছিল শুধু ওই শ্বেতাঙ্গ দল,
আজ ঘরে ঘরে শত্রু বানায় নেতার স্বার্থের বল।
তখন সাধারণ মানুষ লড়েছে দেশের স্বাধীনতার তরে,
আর আজ তারা লড়ছে কেবল রুটি আর রুজির ঘরে।
সাধারণের পেটে ভাত নেই আজ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য শেষ,
তবু ধর্মের নামে জল্লাদ সেজে পুড়ছে স্বাধীন দেশ।
নেতার লোভের অনলে পুড়ছে আজ মানুষের বিশ্বাস,
স্বাধীন দেশের বাতাস কেড়েছে সাধারণের দীর্ঘশ্বাস।

সবচেয়ে বড় আজব তামাশা আজকের এই মিডিয়া,
সত্য বিকিয়ে ক্ষমতার পায়ে ধরেছে চামচাগিরি বাছিয়া।
যে চাটুকার দল গদি মিডিয়া নামে পরিচিত আজ ভুবনে,
তারা বিষ ঢেলে যায় দিন আর রাত মানুষের কানে কানে।
বেকারের কান্না, কৃষকের ফাঁসি দেখায় না টিভির পর্দায়,
শুধু হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাঁধিয়ে টিআরপি বাড়ে সস্তায়।
ভোটব্যাংকের নোংরা খেলায় মেতেছে শাসক দল,
আর মূর্খ মিডিয়া ঢাক-ডোল পিটিয়ে বাড়ায় তাদের বল।
কলম বিক্রি, বিবেক বন্ধক, সত্য আজ নির্বাসিত,
মিডিয়ার ঘরে টাকার পাহাড়ে সমাজ আজ কলঙ্কিত।

একটা সময় হিন্দু-মুসলিম ছিল যে প্রাণের মিতা,
আজ মিডিয়ার বিষে একজন অন্যজনের চিতা।
প্রতিবেশীর ঘরে উৎসব হলে আসত যে আনন্দের বান,
আজ সেখানে সন্দেহের চোখে খোঁজা হয় ধর্ম আর স্থান।
ধিক্কার জানাই সেই সরকারকে, ধিক্কার সেই রাজে,
যে রাজা নিজের আসন বাঁচাতে ধর্মের ফায়দা খোঁজে।
মানুষের রক্তে গদি রাঙানো এ কেমন রাজনীতি?
মানবতার চেয়ে বড় হতে পারে না কোনো দিন কোনো নীতি।
ধর্মের নামে ক্ষমতার লোভ ডেকে আনে শুধু ধ্বংস,
এই কুৎসিত নোংরা খেলায় মরে যে সাধারণের অংশ।

পিয়নের চাকরিতেও দেশে লাগে ডিগ্রির সংশাপত্র,
অথচ মূর্খ-অশিক্ষিতে ভরে গেছে আজ রাজতন্ত্র!
চোর-ডাকাত আর মূর্খের হাতে সোনার দেশের চাবি,
যোগ্যতাহীন নেতা-মন্ত্রী তাড়াতে আজ উঠেছে দাবি।
পাস করতে হবে নতুন আইন, আনতে হবে সংস্কার,
উচ্চ ডিগ্রি ছাড়া মিলবে না ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার।
যে নিজে বোঝে না শিক্ষার আলো, বোঝে না সংবিধান,
তার হাতে কেন সঁপে দেওয়া হবে কোটি মানুষের জান?
মূর্খ নেতা-মন্ত্রীর চাটুকারিতায় দেশ আজ তলিয়ে যায়,
শিক্ষিত যুব সমাজ আজ তাই যোগ্য নেতার হাত বাড়ায়।

যেখানে হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ-জৈন-পারসিক-মুসলমান-খ্রিস্টানি,
এক হয়ে সুর মেলাবে শুনে দেশমাতার সেই উদার বাণী।
সেই বাণীতে মিশে আছে ত্যাগের আর একতার মহান গান,
যার ছায়াতলে এক হয়ে যায় কোটি মানুষের জাতি ও প্রাণ।
কিন্তু আজকের রাজারা করেছে সেই সুরকে খণ্ড খণ্ড,
সিংহাসনে বসে চালায় শুধু ভেদাভেদের খেলা ভণ্ড।
আমরা আবার এক করব সেই হারিয়ে যাওয়া সুরের মেলা,
ভেঙে চুরমার করে দেব নেতার এই স্বার্থের নোংরা খেলা।
একতাই হবে আমাদের মন্ত্র, একতাই হবে আমাদের বল,
এক সাথে লড়বে দেশের যুব শক্তি আর শ্রমিক দল।

ওগো সাধারণ মানুষ, তোমরা এবার চোখ দুটো মেলে চাও,
নেতার মুখের মিছে প্রতিশ্রুতি ছুড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দাও।
কেন বলির পাঁঠা হচ্ছ তোমরা অন্যের স্বার্থের তরে?
যে নেতা দাঙ্গার উস্কানি দেয়, সে তো এসি রুমে মরে।
রক্ত তো সবার লাল রঙের হয়, ধর্ম তো শুধু মনে,
তবে কেন ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি মারো খামোখা খনে?
ভাঙতে হবে এই মিডিয়ার মিথ্যে কথার জাল,
রুখে দাঁড়াতে হবে আমাদের, বদলাতে হবে হাল।
জেগে ওঠো আজ শোষিত মানুষ, ভাঙো এই মোহের ঘুম,
নেতাদের ঘরে যেন নেমে আসে প্রতিবাদের চণ্ডীধুম।

আমাদের ভবিষ্যৎ এমন হোক, যেখানে থাকবে না কোনো ভয়,
মন্দিরে জপ আর মসজিদে আজান একসাথে শান্তিময়।
ভবিষ্যৎ হোক শিক্ষার, ভবিষ্যৎ হোক কাজের,
দূর হয়ে যাক সব কলঙ্ক এই ভণ্ড ধূর্ত রাজের।
তরুণ প্রজন্ম জেগে উঠুক আবার নতুন আলোর খোঁজে,
যে আলোয় মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে মন বুঝে।
আবার ফিরুক সেই সম্প্রীতি, আবার জাগুক দেশ,
ধর্মের নামে রাজনীতি যেন চিরতরে হয় শেষ।
ভারত হোক সেই ভারতের মতো, যা চেয়েছিলেন শহীদেরা,
একতাই হোক আমাদের বল, ভেঙে যাক সব ধর্মের বেড়া।

ধর্ম রক্ষার্থে যুদ্ধ..... - রামকৃষ্ণ পাল

রামকৃষ্ণ পাল

ধর্ম রক্ষার্থে যুদ্ধ
- রামকৃষ্ণ পাল
 
পরিবর্তনের ঝড়ে সুনামি বিশাল,
ভাঙছে তীর ভাঙছে ছুটে গেছে হাল।
সুর অসুরের যুদ্ধে কাঁপছে প্রকৃতি, 
অস্ত্রশস্ত্রে ঝনঝনি রোষে গায় গীতি।

সাধারণ জনার্দন শিক্ষা দেবে বলে,
ভীম সেনের মতন উঠেছিল জ্বলে।
মুহুর্মুহু বজ্রাঘাতে মরে পাপীগণ,
ধর্ম রক্ষার্থে সমরে চলছে নিধন।

জাগরন জনগণে অধিকার বলে, 
প্রতারণা বঞ্চনার বাঁধা যাঁতাকলে।
মেঘমল্লা আগমনে কম্পিত কৌরবে,
বধিবে অসুরে যত জাগিয়া গৌরবে।

ত্রাহি ত্রাহি রবে সদা নিষ্পাপ জনতা, 
দ্রৌপদী বস্ত্রহরণ অশোভন কথা।
শেষকালেতে পাল্টালে রক্ষার্থে স্বধর্ম,
শুভ বুদ্ধির উদয়ে যাচনা সুকর্ম।

সমাজের দরদাম - শিশির হুদা

শিশির হুদা 

সমাজের দরদাম 
- শিশির হুদা 

মরলে পা যাবে কবরে 
মানুষ বাঁচে দুনিয়াতে
 কথার ফাঁপড়ে,
সত্য মিথ্যা করে না যাচাই 
আপন রাস্তা মাপে
সমাজের বাড়ছে দরদাম
 বিরোধিতার চাপে।

দরদামে আছে শুধু 
মিথ্যার হালখাতা,
সত্য কিছু বলতে গেলে 
সমাজ বলে যাতা।

অপরাধী করে অপরাধ 
বুক ফুলিয়ে হাটে,
নিরোপোরাধ মায়ের আর্তনাদে
আধারে বুক ফাঁটে।

বাবার রক্ত ঘামে
 ভেজে সন্তানের জন্য, 
বৃদ্ধকালে মা হয়
বৃদ্ধাশ্রমের পন্য।

কর্মযোগ্যে চায় মালিক 
শ্রম আর কাজ
শ্রমের পাওনা চাইতে গেলে
কপালে চিন্তার ভাঁজ।

সমাজের দরদামে হিসাবকারী আছে 
জবাবদিহি করতে হবে যবে মরে- বাঁচে,
দিনশেষে পৃথিবী থেকে যাবে না সরঞ্জাম 
বাজার নয়, তবেই কেন এতো সমাজের দরদাম?

ব্যস্ত শহরের ক্লান্ত রাত - সঞ্জয় নন্দী

 সঞ্জয় নন্দী 

 ব্যস্ত শহরের ক্লান্ত রাত
  - সঞ্জয় নন্দী 

দিনে শহরটা বড্ড ব্যস্ত, 
হাজারও মানুষের ভিড় 
হাজারও গাড়িঘোড়া। 
চেনা অচেনা মানুষ শহর জুড়ে, 
কোলাহলে কান ঝালাপালা  
তবুও মিলেমিশে পথচলা। 
রাতের শহরটা নির্জীব নিস্তব্ধ, 
মশার কামড়, কনকনে ঠান্ডা, বৃষ্টিতে ভিজে অনাহারে, 
ফুটপাত জুড়ে পড়ে আছে কতো মানুষ! 
জনমানবশূন্য রাস্তা, 
জেগে থাকে-
ঠিকানা বিহীন অচেনা অজানা কতো চিত্র।
ওরা বলতে পারে না আপন ঠিকানা, 
জানেনা কোথা থেকে এসেছে যাবে কেথায়। 
ডাস্টবিনের পরিত্যক্ত খাবার নিয়ে চলছে, 
মানুষ আর কুকুরের লড়াই। 
ওরা সবাই ক্ষুধার্ত-
তাইবলে মানুষের সাথে কুকুরের! 
ক্ষিদে মেটাতে ডাষ্টবিনের পচা খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি, 
হায়রে মানবতা!  
কখনো নিস্তব্ধ রাতে ফায়ার সার্ভিসের সাইরেনের শব্দ-
মানুষ ও মানুষের সহায়সম্বল রক্ষা করতে, 
অতন্দ্র প্রহরী হয়ে জেগে আছে 
শক্তি, সাহস, ত্যাগী জনেরা।   
আবার এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ-
ছুটছে দূরন্ত গতিতে হসপিটালের দিকে। 
হসপিটালের দরজা চব্বিশ ঘণ্টা খোলা-
কেউ ঢুকছে আবার কেউ বেরিয়ে যাচ্ছে, 
সাথে আপন হারানোর আর্তনাদ! 
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনক্রিটের চার দেওয়ালে মধ্যে, 
নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে দিনের ব্যস্ত শহরের মানুষ। 
কেউ খবর রাখে না-
নিশুতি নিস্তব্ধ রাতের ক্লান্ত শহরের কথা!

নিত্যসঙ্গী - অরবিন্দ সরকার

অরবিন্দ সরকার 
বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ


  নিত্যসঙ্গী 
 - অরবিন্দ সরকার 

অভাব ছাড়েনা পিছু অভাবী সংসারে,
ফসল ফলিয়ে দেনা লাভ করে ফড়ে,
জোটেনা দুবেলা ভাত প্রায় অনাহারে,
অভাব মরণে শোধ ঋণ ঘাড় ঝেড়ে।

মালিক শ্রেণী সমাজে টাকা ব্যবহারে,
অকালে দাদন দিয়ে ভাগ নেয় কেড়ে,
ভাগের ফসলে ভাগ দেড়ির ফাঁপরে,
চাষীর ফসল ঢোকে,গোলার ভেতরে।

শ্রমিকের শ্রম চুরি মালিক চতুরে,
বেগার খাটায় তারা গোয়াল খামারে,
পত্নীর আব্দার রক্ষা গৃহে অবসরে,
ফাইফরমাস খেটে নিজ গৃহে ফেরে।

শূন্য বস্তা হাতে চাষী ফসল  উজাড়ে,
লাভের গুড়ে পিঁপড়ে,চাষী মাথা খুঁড়ে।

স্মৃতিচারণ - শামীমা তালুকদার

শামীমা তালুকদার 


স্মৃতিচারণ 
- শামীমা তালুকদার 

স্মৃতিরা সব দিচ্ছে হানা 
চোখ বুজে রই একা, 
মত্তলোকের ধ্যানে মগ্ন 
থাকি আমি সর্বদা। 

ফেলে আসা দিনের কথা 
স্মৃতির পাতায় দিচ্ছে উঁকি,
আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথা 
পাড়ার মোড়ের ওই চায়ের দোকানে, 
শীতের সকালে ধোঁয়া উঠা চা- 
স্কুলে ক্লাসের ফাঁকে -
আম গাছ টা বেয়ে যখন দেয়াল টপকে যাওয়া,
বাংলার সেই প্রিয় আমিনুল স্যারের 
মিষ্টি হাসির উপস্থাপনা।

স্মৃতি রা এখনো দিচ্ছে উঁকি -
কলেজের মোড়ে দাড়িয়ে সিউলি ফুল কুড়ানো, 
কলাগাছের  ভেলায় বিলের জলে শাপলা তোলা, 
মনে পড়ে যায় মায়ের হাতের পিটুনির কথা।

ক্ষাণিক আনমনে হেসে আবার নেমে গেলাম স্মৃতিচারণে-
কত স্মৃতি রয়েছে গাঁথা স্মৃতির পাতায়,  
আজও ম্লান হয়নি কোনকিছু! 
বয়স পেড়োলো চল্লিশে -
আকাশের পানে চেয়ে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে 
আবার চোখ বুজলাম স্মৃতির আবেশে।

হে বীর হৃদয়... - রেজাউল করীম

- রেজাউল করীম



হে বীর হৃদয়
- রেজাউল করীম

হে বীর হৃদয়,
তুমি তরবারি নও—
তুমি ক্ষতের পাশে রাখা নীরব হাত।

তোমার সাহস
চিৎকার করে না,
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আলো জ্বালে।

ভয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
তুমি পেছনে ফেরাও না চোখ,
তবু অহংকার শেখোনি আজও।

পরাজয়ে তুমি ভাঙো না,
জয়ে তুমি উঁচু হও না—
মানুষ হয়ে থাকাই তোমার যুদ্ধ।

হে বীর হৃদয়,
তুমি রক্তে নয়,
দায়িত্বে লেখা ইতিহাস।

যখন সবাই বাঁচতে চায়,
তুমি ঠিক করে নাও
কাকে বাঁচাতে হবে।

মৃত্যুই শেষ ঠিকানা... - মরিয়ম রামলা

- মরিয়ম রামলা

 মৃত্যুই শেষ ঠিকানা
- মরিয়ম রামলা

না আছে ঘর, 
না কোনো ঠিকানা,
এই দুনিয়ায় 
কে-ই বা কার আপন, 
কেউ জানে না।

সবই আজ পর, 
সবই যেন অচেনা,
মন খোঁজে শুধু 
একটুখানি আশ্রয়খানা।

বিয়ে-শাদিতে, বা শেষযাত্রায়,
তখনই সবাই এসে পাশে দাঁড়ায়।
তারপর আবার নিঃশব্দ নীরবতা,
ভিড়ে থেকেও একা, 
মন কেঁদে ওঠে হায়।

রুহ আর দেহ, 
একসময় আলাদা হয়,
স্বপ্নগুলোও ধীরে ধীরে হয় ক্ষয়।
শেষে বুঝি এ জীবন শুধুই মায়া,

মৃত্যুই তো শেষ, 
আসল ঠিকানা।
মৃত্যুই তো শেষ…
আসল… ঠিকানা…

বেকার জীবন - সুকুমার সাউ

সুকুমার সাউ

 বেকার জীবন 
 - সুকুমার সাউ

বিড়ির ধোঁয়ায় আরাম খোঁজে 
সুমন বাবুর সবুজ মন ,
কাজের খোঁজে চিঠি পাঠায়
স্তব্ধ জীবন বাঁচায় ক্ষণ।

ডিগ্রির ভারে ফাইল ছেঁড়ে
খুললে নিজেই ভিমরি খায়,
কাল ছুটিছে আপন গতে 
বেকার জীবন ছুটছে পায় ।

চায়ের ভাঁড়ে চুমুক মারে 
গল্প খোঁজে বলবে আজ,
বাবা মা কে করবে খুসি
ক দিন পরে পাবে কাজ ।

বান্ধবীটা গেল ছেড়ে 
ফোনটা এখন বিষম ভার, 
একলা ঘরে স্মৃতির পাতা 
দিচ্ছে তবু কিছু ধার। 

যা দেখে তাই আঁধার ভাবে 
সূর্য কি রোজ ডুবে রয় ,
উঠবে কবে নতুন রবি 
সেই আশাতেই সুমন রয় ।

আলোর প্রত্যাশায় ! - রকিবুল ইসলাম

রকিবুল ইসলাম

আলোর প্রত্যাশায় !
- রকিবুল ইসলাম

রাতের অসাড় পিনপতন নীরবতা 
আর সকল প্রাণীকূলের - 
ঘুম ঘোরে আচ্ছন্ন হওয়ার মিছিলের সহযাত্রী তো আমিও।
আধো ঘুম আর আধো জাগরণ ক্রীড়ায় মাতে!
নয়ন যুগল তখন অপলক হয়ে থমকে রয়।
না নেমে আসা আর ভেঙে যাওয়া - 
ঘুম ঘুম চোখে অসম্পূর্ণ স্বপ্ন দর্শনে মত্ত হই আমি।
নিস্তব্ধতার গভীরতা যেন আরো দীর্ঘ হতে থাকে ধীরে ধীরে,,,!
চারিদিকে নিঃশব্দের অদৃশ্য এক আবরণ।
সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকে আমার পানে।
দূর আকাশের তারারাও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
রাত্রির দীর্ঘশ্বাস গোপনে এসে ছুঁয়ে যায় আমায়।
নিভু নিভু বাতাসেরাও যেন কিছু বলতে চায়।
কিন্তু শব্দেরা হারিয়ে যায় অজানা কোনো শূন্যতায়।
মন তখন অকারণে পথ হারানো পথিক হয়।
কল্পনারা মেলে ধরে অচেনা ডানার বিস্তার।
অপূর্ণতার মাঝেও খুঁজে ফিরি আমি পূর্ণতার আভাস।
কোনো এক অদেখা প্রত্যাশা নীরবে হাতছানি দেয়।
অত:পর,আবারো আঁখি বন্ধ করি
নব স্বপ্ন দর্শনের প্রত্যয়ে।
অন্তরের গহীনে জমে থাকা আকাঙ্ক্ষাদের সঙ্গে নিয়ে।
নতুন কোনো ভোরের প্রতীক্ষায় থাকি নিরন্তর,,,,!
যদি আলো আসে!

অপূর্ণতা - মীরা চ্যাটার্জী

মীরা চ্যাটার্জী

অপূর্ণতা
 - মীরা চ্যাটার্জী

তুমি সবসময় আমার শরীরের 
খোঁজ নিয়েছো ,
কিন্তু নাওনি কোনোদিন আমার
মনের খোঁজ ।
তাই বুঝি আমাদের একসাথে থাকা হোলোনা ।
আমি যে তোমাকে নিয়ে অনেক
স্বপ্ন দেখেছিলাম ,
বলতে পারো স্বপ্নের জাল বুনেছিলাম,
আমাদের দুজনের একটা স্বপ্নের
সংসার হবে ।
আমার ভালোবাসায় তুমি নিশ্চিন্তে
ভেসে বেড়াবে  ,
যেখানে থাকবে না পরে যাবার ভয় ,
যে ভালোবাসার হবে নাকো কোনোদিন
কোনো ক্ষয় ।
কখনো আকাশের সাদা মেঘের মতো ,
আবার কখনো বা উত্তাল সমুদ্রের
ঢেউয়ের মতো ভেসে বেড়াতাম ।
কিন্তু তুমি আমার মনের কথা
কোনোদিন না জানতে চাইলে ,
না তোমার মনের কথা কোনোদিন বললে ।
তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনোই  
যেতাম না ,
না হয় তোমাকে পেতাম না ।
আজও তুমি নিলে না আমার
মনের খোঁজ ,
কিন্ত আমার মন যে তোমার মনের খোঁজের আশায় ছুটে চলেছে , 
নদীও তো এপার ভেঙে ওপার গড়ছে ।
কিন্তু তুমি সেই এক জায়গাতেই
থেমে আছো ,
প্রতিদিন আমার শরীরের খোঁজ নিচ্ছো।

সবুজ তুমি... - রত্না রায়

রত্না রায়

 সবুজ তুমি
 - রত্না রায়

সবুজ তুমি হারিয়ে গেলে কোথায়!
আমায় কেন একা করে রেখে গেলে হেথায়!
কোথায় গেলো আমার প্রিয় বন বীথিকার ছাওয়া!
যেথায় আছে মন কেমনের হৃদয় সুখ চাওয়া!

কার কুঠারে বলী হলো গাছগুলো সব বলো,
বাগ বাগিচা দেখবো আমি, বাঁচলো নাকি ম'লো!
ওই শোনো গো শাল পিয়ালের বেদন নিনাদ কান্না,
কারা যেন করছে আঘাত ,ঝরছে শ্যামল পান্না!

মানুষগুলো নিঠুর কেন বলো দেখি শুনি,
নিত্য আসে শালের বনে, ডাল কাটবে খুনি।
স্নিগ্ধ কোমল পল্লব সব নেয়গো ওরা কেড়ে,
কোমর বেঁধে কুঠার চালায় বসে থাকে গেঁড়ে!

ধ্বংস করে কাঠগুলো সব বেচে কেনে কেন!
অরণ্য কে উজাড় হতে আর দিওনা যেন।
ফিরিয়ে আনো কানন বীথি ফিরিয়ে আনো সবুজ,
বসে আছি পথপানে , হয়োনা  আর অবুঝ।

রৌদ্র ছায়ার তলে বসে কব বিপুল কথা,
রাখবে গোপন শাল সেগুনে,থাকবে ঝিলিক তথা।
ওই অরণ্যের কোলে বসে শুদ্ধ হবে মন,
কুঠার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবো করবো যুগল পণ।

সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার... - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস  সভ্যতার যোনি চেরা চিৎকার - সর্বানী দাস  লাশ হয়ে যাইনি এখনো মা'গো,  আমি এখনো ছটফট করছি ব্যথায়- ভাঙা হাড়ের টুকরোগুলো  বিঁধছে ...

জনপ্রিয় পোস্ট