শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

লাভের কড়ি - দীপ্তি নন্দন

- দীপ্তি নন্দন 

লাভের কড়ি
- দীপ্তি নন্দন 


সেদিন সন্ধেবেলা তার ঘরের  দাওয়ায় হরিশ খুব মনমরা হয়ে বসেছিল। একটু আগেই  সুকুলের ঠেক-এ গিয়ে কয়েক গেলাস ধেনো চড়িয়ে এসে তারই নেশায় নিজের পোড়া কপালের কথা ভাবছিল বসে বসে।সেই দুপুরে এক মুঠো ভাত খেয়েছিল সে তারপর আর পেটে কিছু পড়েনি। উপরন্তু বৌ -এর লুকোনো টাকা থেকে পয়সা নিয়ে সে মনের দুঃখে ধেনোর ঠেক -এ গিয়েছিল।

খালি পেটে নেশাটা যেন ভীষণ জোরদার হয়েছে মনে হচ্ছে তার।
এখন ভরা বর্ষায় মাছ ধরার মরশুম চলছে, কিন্তু তার নৌকোর তলাটা ফেঁসে অকেজো হয়ে পড়ে আছে বেশ কিছুদিন ধরে। হাতে এমন  পয়সা নেই যে সারাবে। এসময় কেউ চট করে নৌকো ব্যবহার করতে দিতেও চাইবেনা।এখন তার নৌকো নেই ,টাকাও নেই তাই এবার নদীতে মাছ ধরার পারমিটও নেওয়া হয়নি। তাই সে এখন বেকার হয়ে ঘরে বসে আছে আর দুবেলা বৌ - এর মুখ ঝামটা শুনছে। কারণ বৌ এখন অন্যের বাড়ির ধান, চিঁড়ে কুটে, মুড়ি ভেজে সংসার চালাচ্ছে।

মনের দুঃখে একপেট ধেনো খেয়ে সে দাওয়ায়  বসে থেকে থেকে একসময় শুয়েই পড়ে ছিল। এমন সময়,শোনে একটা চাপা গলা --

" এ্যাই হরিশ আজ একটু বেশি রাতে যাবি নাকি মাছ ধরতে? "

এটা কালুর গলা না! 'হরিশ লাফিয়ে উঠল। 

সাগ্রহে বলল," কোথায় রে?"

  কালু বলে, " কেন, নদীতে ! অনেক মাছ  পাওয়া যাবে এখন গেলে । যাবি তো বল্!
---   "সে কি রে? ওখানে রাতে পাহারা থাকে না?"

---" হ্যাঁ থাকে তো। কিন্তু আমার কাছে খবর আছে, জল পুলিশের পাহারার লঞ্চ আজ এদিকে থাকবে না,  অন্য দিকে থাকবে।কাল সকালের আগে ফিরবে না। "

 ---"  তাই নাকি? আচ্ছা তবে চল্ ! "হরিশ চুপিচুপি দাওয়ার একধারে রাখা মাছ ধরার সরঞ্জামের ঝোলা আর খেপলা জালটা নিয়ে বলে,-- 

" চল এবার দেখি কটা মাছ নিয়ে আসতে পারি। "

কালু, হরিশের মাছ ধরার নানা কৌশলের কথা জানতো। জানতো তার অব্যর্থ কোঁচ দিয়ে গেঁথে মাছ ধরার দক্ষতার কথা। তাই আজকের এই পাহারাহীন নদীতে মাছ ধরে কিছু বেশি লাভের কড়ি গোনবার জন্যই তো তার হরিশকে সঙ্গে নেওয়া! 

একটুক্ষণ পরেই অন্ধকারে দুটি ছায়া মূর্তি সকলের অগোচরে নদীর দিকে রওয়ানা হয়।একটা নিরিবিলি অন্ধকার ঘাটে কালুর নৌকোটা বাঁধা ছিল। দুজনে নিঃশব্দে নৌকোয় গিয়ে ওঠে। ঘাটের ধারের বড় গাছটায় বাঁধা রশি খুলে ঠেলে জলে নামিয়ে দিতেই নৌকোটা নদীর স্রোতে তরতরিয়ে চলতে থাকে।একটু পরে ঘন অন্ধকারের মধ্যে বিশাল বড়ো নদীর অথৈ কালো জলে নিঃশব্দে কালু তার নৌকো বাইতে থাকে আর হরিশ তার খেপলা জালটা ফেলে মাছ ধরার তোড়জোড় করতে গিয়ে দ্যাখে ,ঠিক নৌকোর পাশেই বড়ো বড়ো মাছ খলবল করছে ।  

সে বুঝল,এত কাছ থেকে মাছ ধরতে এই জালে কোনো কাজ হবে না।সে তার জাল গুটিয়ে রেখে মোক্ষম অস্ত্র  কোঁচটি বের করে  হাতে কোঁচ চালিয়ে  মাছ গেঁথে  তোলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ধেনোর নেশায় হাত ঠিক মতো না চালাতে পেরে  খুব একটা বেশি মাছ গেঁথে তুলতে পারলনা। কালু ,হরিশের এই  বিশেষ গুণের কথা জানত বলেই, তাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু নেশার ঘোরে এই হঠাৎ পাহারাহীন নদী থেকে ফায়দা তুলতে সে অপারগ হচ্ছে দেখে রেগে গিয়ে বলল, --  

" তুই যে নেশা করে আছিস আগে আমাকে বললি না কেন?   আজকের দিনটাই তো মাটি করে দিলি একেবারে। আমার তো সবটাই ক্ষতি।এতক্ষণ ধরে  নৌকো চালিয়ে লাভ কি হলো! ঐ দুএকটা মাছ বিক্রি করে ক'টা টাকা পাওয়া যাবে ? এর চেয়ে আমি একা এলে তবুও লাভ থাকত কিছু! "

রাগে সে গজগজ করতে লাগল। হরিশ অনেকক্ষণ ধরে  কালুর কথাগুলো শুনছিল।  তারও তো পরিশ্রম হয়েছে যথেষ্ট। ক্লান্ত হয়ে সে নৌকোর গলুই- এ বসে হাঁফাচ্ছিল। একেই কদিন তার কোনো আয় নেই। তেমন খাওয়াও জুটছে না, তার ওপরে রয়েছে ধেনোর নেশার প্রভাব।তাই ক্লান্তির মাত্রাটা একটু বেশিই ছিল হরিশের।

কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করার পর কালু নৌকোর একেবারে ধারে বসে ঢুলতে লাগল ঘুমে। তার আগেই সে পাড়ের কাছাকাছি একটা খুঁটিতে তার নৌকোটা বেঁধে রেখেছিল।

হরিশ ক্লান্তির ভারে নুয়ে পড়ে শুতেই যাচ্ছিল। তখনি হঠাৎ একটু আগে বলা কালুর কথাগুলো ভেবে তার মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল।

তখন হঠাৎই হরিশের মনে হলো, আচ্ছা আর তো কেউ জানে না, আজ কালুর আর তার রাতের অভিযানের কথা !এখন যদি সে কালুকে তার রাস্তা থেকে হটিয়ে দেয়, তাহলে কেউই তো  কিছু জানতে পারবে না।খোলের মধ্যে যে পরিমাণ মাছ আছে , কাল সকালে নদীর ঘাটে কিংবা হাটে বিক্রি করতে পারলে, কিছু তো পাওয়া যাবে! 

সে নৌকোর পাশে বসে ঘুমে ঢুলতে থাকা  কালুর গলায় পেছন থেকে তার হাতের কোঁচটা চালিয়ে দিয়ে, ঠেলে ফেলে দিল তাকে জলের মধ্যে। হরিশ দেখল তার কোঁচের ঘায়ে, কালুর গলাটা প্রায় পুরোটাই কেটে দুই টুকরো হয়ে গেছে। এবার সে খুব নিশ্চিন্ত হয়ে নৌকোর মধ্যে শুয়ে  পড়ল, আর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়েও পড়ল। 

অল্পক্ষণ পরেই তার মনে হলো যেন নৌকোর পাশেই একটা বড়ো মাছের খলবলানির শব্দ আসছে। সে উঁকি মেরে দেখে একটা বিশাল মাছ নৌকোর ঠিক পাশেই খলবল করছে। সে হাতের কোঁচটা চালিয়ে দিয়ে সেটাকে একবারেই গেঁথে , অনেক কষ্টে সেই বৃহৎ মাছকে নৌকোর খোলে তুলে রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। 

ভোরের আলো ফুটে গেলেও তার সেই ঘুম ভাঙলো না। এদিকে উপকূল রক্ষী বাহিনীর লঞ্চ এদিকে ততক্ষনে চলে এসেছিলো। তারা কালুর নৌকায় হরিশকে অঘোরে ঘুমোতে দেখে তাকে ওঠাতে গেলো।

জল পুলিশের লোকের লাঠির খোঁচা  খেয়ে  ঘুম ভাঙল হরিশের। বেআইনি ভাবে পারমিট ছাড়া মাছ ধরার অপরাধে তাকে ধরতে গেলে, সে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে ,-- 

" হুজুর যে মাছ ধরেছি তার  থেকে কটি মাছ আপনার বাড়িতে পাঠিয়ে দিই! " 

পুলিশের লোক কিছু বলার আগেই ঝামেলা থেকে ছাড় পেয়ে যাবার আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে সে নৌকোর খোল থেকে মাছ বের করতে গেল। 

পাশ থেকে পুলিশ ইন্সপেক্টর  উঁকি মেরে দেখতে গেলেন কত মাছ রয়েছে সেখানে , কিন্তু  তাঁরা অনেক মাছের বদলে দেখলেন, নৌকোর খোলের মধ্যে কালু, তার প্রায়  দু ফাঁক করা গলা নিয়ে সেখানে শুয়ে আছে!


1 টি মন্তব্য:

মারিয়াম রামলা বলেছেন...

অন্ধ লোভ আর নেশার ঘোরে বন্ধুকে হত্যা করেও হরিশের শেষরক্ষা হলো না, বরং নিজের অজান্তেই সে কালুর লাশ আগলে পুলিশের খাঁচায় বন্দি হলো।

লাভের কড়ি - দীপ্তি নন্দন

- দীপ্তি নন্দন  লাভের কড়ি - দীপ্তি নন্দন  সেদিন সন্ধেবেলা তার ঘরের  দাওয়ায় হরিশ খুব মনমরা হয়ে বসেছিল। একটু আগেই  সুকুলের ঠেক-এ গিয়ে কয়ে...

জনপ্রিয় পোস্ট