নীরবতার সৌন্দর্য (একটি মননশীল নিবন্ধ)
- জয়দীপ বসু
আমাদের এই স্বপ্ন সুধাময় স্বর্ণদ্যুতি সুবলিত পৃথিবীতে যারা সাফল্যের সুউচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নীরবে, নিভৃতে কাজ করেছেন।তাদের এই নিঃশব্দ সাধনাই তাদের কাজের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। জীবনের অমৃতরসে অভিসিঞ্চিত করে। সাফল্যের জন্য সর্বাগ্ৰে প্রয়োজন মনঃ সংযোগ, একাগ্ৰ সাধনা, নীরবতা ও সঠিক কর্ম পরিকল্পনা। আগেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে, লোকজনকে জানিয়ে অধিকাংশ কাজেই চূড়ান্ত সফল হওয়া যায় না। কিছু দূর এগিয়ে থেমে যেতে হয়।
পড়াশোনার ক্ষেত্রে দেখেছি যারা জীবনে চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেছেন তাঁরা নীরবে সাধনা করে একের পর এক কঠিন ধাপ অতিক্রম করে গিয়েছেন। তারপর সাফল্যের সুউচ্চ শৃঙ্গ স্পর্শ করেছেন। আর যারা সামান্য পথ অতিক্রম করেই তা নিয়ে ঢাকঢোল পেটাতে থাকেন তাদের চূড়ান্ত সাফল্য অধরাই থেকে যায়। শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই সাফল্যের অভিমন্ত্র হলো সঠিক পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে নীরবতা। নীরবতাই সৌন্দর্য।
জীবনে সাফল্য লাভের সব ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।
সভ্যতার ইতিহাসের দিকে আলোকপাত করলে দেখি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত সাধকরা নীরবে, নিভৃতে সুরের সাধনা করে গিয়েছেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত জেগে সাধনা করেই তাঁরা শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। বড় খেলোয়াড়রা নীরবে নিরলসভাবে অনুশীলন করে যান। একইভাবে বড় শিল্পী কিন্তু নিভৃতে কঠিন শিল্প সাধনায় ডুবে যান। বড় চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, স্থাপত্য বিশারদ, কবি, লেখক সকলেই কিন্তু নীরবে সুকঠিন সাধনায় নিজেকে নিমজ্জিত রাখেন। আসলে ফুল নীরবে ফোটে, তার ঐশ্বর্য, সৌরভ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
এবার আসি প্রকৃতির জগতে। সুপ্রাচীন কাল থেকে হিমালয় পর্বত নীরবে ভারতকে রক্ষা করে চলেছে। তাই ভারতকে হিমালয়ের দান বলা হয়। তার অপার্থিব সৌন্দর্যের ইন্দ্রজাল মানুষকে মোহসিক্ত করে চলেছে। অনেক নদীই খুব ধীর ছন্দে বয়ে চলে। কিন্তু তাদের অপার ঐশ্বর্য। আর শ্যাম বনানী তো একেবারেই নীরবে সৌন্দর্য সুধা পান করায়।
তাদের রূপের অনাবিল মায়াদ্যুতি, সবুজ রাগ মূর্ছনা মানুষকে অপরূপতার অবগাহন করায়। চিন্তা চেতনায় অস্ফুট মায়াবী চিত্রধ্বনি তৈরি করে।
আমরা দেখেছি সৃষ্টির সেই অনাদি লগ্ন থেকে আধ্যাত্মিক জগতে যারা সিদ্ধিলাভ করেছেন তাঁরা কি কঠিন সাধনা নীরবে করে গিয়েছেন। তবেই তাঁরা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী / অধিকারিণী হয়েছেন। এই অলৌকিক ক্ষমতা জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নীরব সাধনাই অলৌকিক ক্ষমতার জন্ম দেয়। তার সাফল্যের মধু কিরণ সকল হৃদয়কে প্লাবিত করে যায়।
অতএব জীবনে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে গেলে নীরবে সাধনা করে যেতে হবে। যার সাধনা যত বেশি তার সিদ্ধিলাভ তত বেশি।

২টি মন্তব্য:
ভালো লাগল
নিঃশব্দ সাধনা ও ধৈর্যই যে প্রকৃত সাফল্য ও সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি, তা প্রকৃতির ও জীবনের নানা উদাহরণে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা একটি চমৎকার মননশীল লেখা!
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন