(১ম পর্ব)
নীরব এক শুরুর গল্প...
মানুষের জীবন সবসময় শব্দে ভরা থাকে না। কিছু জীবন আছে, যেগুলো বাইরে থেকে স্বাভাবিক, সফল, এমনকি প্রশংসনীয়- কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। সেই ভাঙার শব্দ কেউ শোনে না, কারণ সেটা কেবল হৃদয়ের ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হয়।
আকাশের জীবন ঠিক তেমনই।
ছোটবেলা থেকেই আকাশ ছিল অদ্ভুত রকমের শান্ত। পাড়ার ছেলেরা যখন হৈচৈ করত, ক্রিকেট খেলত, ঝগড়া করত, তখন আকাশ হয়তো কোনো এক কোণে বসে বইয়ের পাতা উল্টাত, অথবা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। তার ভেতরে একটা আলাদা জগত ছিল- যেখানে শব্দ কম, ভাবনা বেশি।
তার মা প্রায়ই চিন্তিত হয়ে বলতেন,
“এই ছেলে এত চুপচাপ কেন? কারও সাথে মিশতে চায় না কেন?”
আকাশ কোনো উত্তর দিত না। সে নিজেও জানত না কেন সে এমন।
স্কুলজীবন তার কেটে গেল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততায়। সে ভালো ছাত্র ছিল, শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করতেন, সহপাঠীরা তাকে সম্মান করত- কিন্তু কেউ তার খুব কাছের ছিল না। বন্ধুত্ব যেন তার জীবনে কখনো গভীরভাবে প্রবেশ করতে পারেনি।
আর প্রেম?
সেটা তো তার জীবনে কোনোদিন আসেইনি।
যখন তার বন্ধুরা প্রেমে পড়তে শুরু করল, চিঠি লিখল, লুকিয়ে দেখা করল- আকাশ দূর থেকে সব দেখেছে। কিন্তু তার মনে কখনো তেমন কোনো অনুভূতি জাগেনি।
না, সে পাথর ছিল না।
কিন্তু সে নিজের অনুভূতিগুলোকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি।
হয়তো সে ভয় পেত।
হয়তো সে বুঝত না।
হয়তো সে নিজেকে সেই জায়গায় কল্পনাই করতে পারত না।
সময় পেরিয়ে গেল।
জীবনের বাস্তবতা সামনে এসে দাঁড়াল।
অনেকে চাকরি নিল, কেউ বিদেশে গেল, কেউ সংসার গড়ল।
আকাশ অন্য পথ বেছে নিল।
সে নিজের একটি ট্রেড ব্যবসা শুরু করল।
শুরুর সময়টা ছিল কঠিন। পুঁজি কম, অভিজ্ঞতা কম, মানুষের বিশ্বাস কম- সব মিলিয়ে তাকে প্রতিটা পদক্ষেপে লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু আকাশের একটা জিনিস ছিল- ধৈর্য।
সে চুপচাপ কাজ করে গেছে।
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত- সে নিজের ব্যবসাকে দাঁড় করিয়েছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্য সংগ্রহ, আবার বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ- ধীরে ধীরে তার কাজের পরিধি বাড়তে লাগল।
মানুষ তাকে চিনতে শুরু করল।
তার ফোন ব্যস্ত থাকতে শুরু করল।
তার নামের সাথে “বিশ্বাসযোগ্য” শব্দটা জুড়ে গেল।
কিন্তু জীবনের এই সাফল্যের মাঝেও একটা জিনিস একই রয়ে গেল -
তার ব্যক্তিগত শূন্যতা।
আকাশের জীবনে কোনো প্রেম নেই।
কোনো সম্পর্ক নেই।
কোনো বিশেষ মানুষ নেই, যে তার জন্য অপেক্ষা করে।
দিন শেষে যখন সে বাড়ি ফেরে, তখন তার জন্য কেউ দরজা খুলে দেয় না।
কেউ বলে না- “আজ এত দেরি কেন?”
কেউ তার ক্লান্ত মুখ দেখে জিজ্ঞেস করে না- “তুমি ঠিক আছো তো?”
তার ঘরটা পরিপাটি, কিন্তু নির্জন।
একটা টেবিল, কিছু বই, একটা ল্যাম্প, আর একটা জানালা- যেখান দিয়ে সন্ধ্যার আলো ঢোকে। সেই আলোয় বসে আকাশ মাঝে মাঝে নিজের সাথে কথা বলে।
একদিন রাতে সে ডায়েরি খুলল।
অনেকদিন পর।
কলম হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর লিখল-
“আমি জানি না আমি কী হারিয়েছি। কিন্তু আমি অনুভব করি- আমার ভেতরে কিছু একটা নেই। এমন কিছু, যা অন্যদের আছে।”
সে থেমে গেল।
এই কথাটা লিখে সে নিজেই অবাক হলো।
কারণ সে প্রথমবার নিজের শূন্যতাকে স্বীকার করল।
পরদিন আবার তার ব্যস্ত জীবন শুরু হলো।
কিন্তু এবার তার ভেতরে একটা প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে।
“আমি কি সত্যিই সম্পূর্ণ?”
এই প্রশ্নটা তাকে তাড়া করতে লাগল।
কাজের মাঝে, মানুষের সাথে কথা বলার মাঝে, একা থাকার সময়- সবসময় এই প্রশ্নটা তার মাথায় ঘুরতে থাকে।
সে উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে।
কিন্তু কোনো উত্তর পায় না।
একদিন সে সামাজিক কাজের জন্য একটি বস্তিতে গেল।
সে আগে থেকেই কিছু সামাজিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিল। গরিবদের সাহায্য করা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো- এই কাজগুলো সে করে।
সেদিন তারা খাবার বিতরণ করছিল।
মানুষের ভিড়, বাচ্চাদের হাসি, হাত বাড়িয়ে দেওয়া মানুষ- এইসবের মাঝে আকাশ নিজেকে ব্যস্ত রাখল।
হঠাৎ তার চোখে একটা দৃশ্য ধরা পড়ল।
একজন মা তার ছোট ছেলেটাকে কোলে বসিয়ে খাওয়াচ্ছে।
খাবার খুব সামান্য।
কিন্তু মায়ের চোখে যে মমতা, সেটা অমূল্য।
ছেলেটা হাসছে, মায়ের গলায় জড়িয়ে ধরছে।
আকাশ স্থির হয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটা দেখল।
তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অচেনা অনুভূতি জাগল।
সে বুঝতে পারল না এটা কী।
কিন্তু সে জানল- সে এই অনুভূতিটা আগে কখনো পায়নি।
সেই রাতে সে আবার লিখল -
“আজ আমি ভালোবাসা দেখলাম। খুব কাছ থেকে। কিন্তু আমি সেটা অনুভব করতে পারলাম না। আমি শুধু দেখলাম। আমি একজন দর্শক- নিজের জীবনেরও, অন্যের জীবনেরও।”
তার হাত কাঁপছিল।
কিন্তু সে লিখে গেল।
দিনগুলো আবার চলতে লাগল।
কিন্তু এখন আকাশ বদলাতে শুরু করেছে।
সে মানুষের দিকে তাকায়।
তাদের হাসি, তাদের কথা, তাদের সম্পর্ক- সবকিছু সে খেয়াল করে।
সে বুঝতে শুরু করেছে- ভালোবাসা শুধু একটা অনুভূতি নয়, এটা একটা সংযোগ।
আর সেই সংযোগ তার জীবনে নেই।
একদিন রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল।
আকাশ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
বৃষ্টির শব্দ, ঠান্ডা বাতাস- সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা।
সে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল।
নিজেকে দেখে তার মনে হলো- এই মানুষটাকে সে চেনে না।
সে ধীরে ধীরে বলল-
“আমি কে?”
প্রশ্নটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।
কোনো উত্তর এল না।
সে আবার ডায়েরি খুলল।
এইবার সে লিখল-
“আমার জীবনে কোনো প্রেম নেই। কোনো স্মৃতি নেই, যেখানে কারও হাত ধরেছিলাম। কেউ আমাকে ভালোবেসে ডাকেনি, আমিও কাউকে ডাকি নি। আমি জানি না ভালোবাসা কেমন।”
“আমি শুধু জানি- আমি একা।”
সেই রাতটা ছিল তার জীবনের এক মোড়।
কারণ সেই রাতে সে প্রথমবার নিজের একাকীত্বকে পুরোপুরি অনুভব করল।
আকাশ এখনো একই মানুষ।
ব্যবসায়ী।
সামাজিকভাবে সক্রিয়।
মানুষের কাছে সম্মানিত।
কিন্তু তার ভেতরে এখন একটা যাত্রা শুরু হয়েছে-
নিজেকে খুঁজে পাওয়ার যাত্রা।
(লেখা চলমান থাকবে, ২য় পর্ব খুব শীঘ্রই প্রকাশ পাবে...)

1 টি মন্তব্য:
২য় পর্বের অপেক্ষায় 🙏🏻
কলম অমূল্য তার প্রতিটি শব্দে উচ্চারিত
ছোটগল্পের প্রতীক্ষায় মন
ভালো থাকুন 🙏🏻
ভালো লিখুন 🙏🏻
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন