শোভাদেবী বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রোজ পাশের বাড়ির ভদ্রলোক দিবাকর বাবুর চালচলন খেয়াল করেন। আর ভাবেন কি অদ্ভুত জীবন মানুষের। দিবাকর বাবুর দোতলা বাড়ি, দু'খানা গাড়ি, কি নেই ? সব আছে কিন্তু নিজের নয়, আবার ধরতে গেলে নিজেরও বলা যায়।
কেননা এই গাড়ি, বাড়ি' তো তার ছেলেদের। ছেলের মানে'তো তার নিজের তাই না? কিন্তু এতে সাচ্ছন্দ বোধ করতে পারেন না দিবাকর বাবু, কেমন জানি একটা হীনমন্যতা কাজ করে। এই বাড়ি গাড়ি তার নিজের বলতে কোথায় যেন বাধে তার হৃদয়ে। কারণ এতো তার নিজের রোজগারের নয়, ছেলেদের।
দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেন দিবাকর বাবু।
এসব দেখে শোভাদেবীর মনে পড়ে অনেক বছর আগের সেই দিবাকর বাবুকে। যাকে তার কোন এক দাদা তাঁর ব্যবহৃত একটা সাইকেল দিয়ে বলেছিলেন -
"ধর দিবাকর এই সাইকেলটা আজ থেকে তোর। তুই এটা নিয়ে যা খুশি করতে পারিস। তোর প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারিস। এটার মালিক এখন তুই।"
খুশি মনে দিবাকর বাবু সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
বউকে এসে বলে দেখ রমেন'দা এই ভাঙ্গাচোরা সাইকেল খানা আমাকে দিল।
রমেন'দার এত টাকা, প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও আমাকে একটা পুরনো সাইকেল দিল!
বউ দিবাকর বাবুকে বলে -
"তুমি কেন এত রাগ করছ? হোকনা পুরনো, তবুও তো রমেন'দা দিলেন! তোমার মতো তুমি ব্যবহার করার জন্য।
পরেরদিন থেকে দিবাকর বাবু সাইকেলে করে দোকানে যেতেন, হাটবাজার করতেন। দিবাকরের একটা কি যেন ব্যবসা ছিল, মানুষের বাড়ি গিয়ে জিনিস পৌঁছে দেওয়া, সব এই সাইকেলে চড়ে করতেন। কিন্তু সবাইকে বলে বেড়াতেন -
- ঐ বড়লোক দাদা তাঁর এত টাকা তবুও এই ভাঙ্গাচোরা একটা সাইকেল আমাকে দিল!
শোভাদেবী সে দিনও মনে মনে হেসে ছিলেন, আজও তিনি হাসছেন দিবাকর বাবুর এই অজ্ঞতা, এই অদ্ভুত কান্ড দেখে!
সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল দিবাকর বাবুর, একটু লং ড্রাইভে যাবে, কিন্তু সংকোচের কারণে কিছুতেই ছেলেদের বলতে পারলেন না ,মনের এই ছোট্ট আকাঙ্ক্ষার কথা।
আজ মনে মনে রমেন'দার কথা ভাবে, পুরনো হলেও সেই সাইকেলটির সম্পূর্ণ মালিক ছিলাম আমি।নির্দ্বিধায় যেখনে খুশি, যখন খুশি সাইকেলে চড়ে বেড়িয়ে যেতে পারতাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করেন দিবাকর বাবু।
বেলকনি থেকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন শোভাদেবী।
কি আজব মানুষের মন!
কি বিচিত্র এই জীবন!
সব আছে কিন্তু নিজের বলতে কিছুই নেই!
![]() |
| লেখিকা - সুবর্ণা দাশ |


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন