শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (দ্বিতীয় পর্ব) - আকাশ আহমেদ




(দ্বিতীয় পর্ব: নীরবতার গভীরতা)

প্রথম পর্বের সেই বৃষ্টিভেজা রাতের পর আকাশের জীবনে বাইরে থেকে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। ব্যবসা আগের মতোই চলছে, কাজের চাপ বাড়ছে, নতুন নতুন যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। মানুষ তাকে আরও বেশি চিনছে, সম্মান করছে।

কিন্তু ভেতরে- খুব নিঃশব্দে- একটা পরিবর্তন শুরু হয়েছে।

এখন আকাশ শুধু বাঁচে না, সে নিজের বেঁচে থাকার দিকে তাকায়।
 
সকালের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে, কিন্তু সেই আলো আর আগের মতো লাগে না। আগে এই আলো তার কাছে ছিল একটা নতুন দিনের শুরু- এখন মনে হয়, একই দিনের পুনরাবৃত্তি।

সে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নেয়। মেসেজ, কল, ব্যবসার আপডেট- সব কিছু দেখে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে দিনের কাজ শুরু করে।

সবকিছু ঠিকঠাক।
কিন্তু কোথাও যেন কিছু নেই।
একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
চোখে চোখ রাখল।
নিজের মুখটা গভীরভাবে লক্ষ্য করল।
ক্লান্তি আছে, দায়িত্ব আছে, অভিজ্ঞতা আছে- কিন্তু কোনো উচ্ছ্বাস নেই।

সে নিজের কাছেই ফিসফিস করে বলল -

“এই আমি? এটাই কি আমার পুরোটা?”

প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু উত্তরটা তার কাছে অজানা।

সেদিন বিকেলে সে তার গুদামে (ব্যবসার জায়গা) বসে ছিল। চারপাশে লোকজন কাজ করছে, কেউ পণ্য তুলছে, কেউ হিসাব লিখছে, কেউ ফোনে কথা বলছে।

সবকিছু চলমান।
হঠাৎ তার এক কর্মচারীর কথা তার কানে এলো-
“হ্যাঁ, আমি একটু দেরি করব… তুমি খেয়ে নিও… না না, আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না…”

সাধারণ একটা কথা।
প্রতিদিন হাজারবার শোনা যায়।
কিন্তু আজ আকাশ থেমে গেল।
কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে না।
এই ছোট্ট সত্যটা হঠাৎ তার কাছে খুব বড় হয়ে উঠল।

সেদিন রাতে সে ডায়েরি খুলল।
লিখল -

“অদ্ভুত লাগে। আমি এত মানুষের সাথে কথা বলি, এত মানুষ আমার ওপর নির্ভর করে- কিন্তু দিনের শেষে কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে না।”
“আমি কি কখনো কারও জীবনের প্রয়োজনীয় মানুষ ছিলাম?”

কলমটা থেমে গেল।
সে অনেকক্ষণ ধরে সেই কথাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েকদিন পর তাকে ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে হলো।

দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা।
জানালার পাশে বসে সে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগল।
সবকিছু ছুটে চলছে- মাঠ, গাছ, নদী, ঘরবাড়ি।
হঠাৎ তার মনে হলো- তার জীবনও ঠিক এমনই।
সবসময় চলমান।
কিন্তু কোথাও থামা নেই।

তার পাশের সিটে বসা এক বৃদ্ধ লোক তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন -
“বাবা, কী কাজ করো?”
আকাশ সংক্ষেপে বলল -
“ব্যবসা করি।”
বৃদ্ধ আবার জিজ্ঞেস করলেন -
“ব্যস্ত থাকো নিশ্চয়ই?”
আকাশ মাথা নেড়ে বলল -
“হ্যাঁ, সবসময়।”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন -
“ভালো। কিন্তু মনে রেখো -শুধু ব্যস্ত থাকলেই মানুষ সুখী হয় না।”
আকাশ তাকাল।
বৃদ্ধ আবার বললেন -
জীবনে কিছু মানুষ দরকার, যাদের কাছে তুমি শুধু ‘তুমি’ হতে পারবে।”

এই কথাটা আকাশের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
সে কিছু বলল না।
কিন্তু তার ভেতরে যেন একটা ঢেউ উঠল।

ফিরে এসে সে নিজেকে আরও বেশি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল।
এখন সে বুঝতে পারছে - সে শুধু একা নয়, সে নিজের ভেতরেও একা।
সে কখনো নিজের সাথে সময় কাটায়নি।
সে সবসময় কাজের আড়ালে লুকিয়ে থেকেছে।

একদিন রাতে সে পুরোনো ছবি দেখতে লাগল।
স্কুলের গ্রুপ ছবি।
কলেজের অনুষ্ঠান।
বন্ধুদের সাথে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকা।
সব জায়গায় সে আছে।
কিন্তু কোথাও যেন সে নেই।
কোনো ছবিতে তার পাশে কেউ নেই, যে তাকে আলাদা করে দেখাচ্ছে।
কোনো স্মৃতি নেই, যা তাকে ছুঁয়ে যায়।

সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
মনে হলো -
“আমার জীবনে কি কোনো গল্পই নেই?”

সেই রাতে সে ঘুমাতে পারল না।
জানালার পাশে বসে ছিল।
বাতাস বইছে, শহর নিঃশব্দ।
সে নিজের সাথে কথা বলতে শুরু করল -

“আমি কি ভালোবাসা চাই?”
“নাকি আমি শুধু একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?”
“যদি এখন কেউ আসে, আমি কি তাকে জায়গা দিতে পারব?”

এই প্রশ্নগুলো তাকে অস্থির করে তুলল।
কারণ সে জানে না।

পরদিন সে একটি বৃদ্ধাশ্রমে গেল।
সামাজিক কাজের অংশ হিসেবে।
সেখানে অনেক বৃদ্ধ মানুষ -কেউ একা, কেউ পরিত্যক্ত, কেউ অপেক্ষায়।
আকাশ তাদের সাথে কথা বলছিল, সাহায্য করছিল।
হঠাৎ এক বৃদ্ধা তার হাত ধরে বললেন -

“বাবা, তুই মাঝে মাঝে আসিস। তোকে দেখলে মনে হয়, আমার ছেলেটা এসেছে।”

আকাশ থেমে গেল।
এই কথাটা তার ভেতরে কোথাও খুব গভীরে গিয়ে লাগল।
সে বুঝতে পারল -
ভালোবাসা শুধু পাওয়া নয়, দেওয়াও।
কিন্তু তার জীবনে সেই ব্যক্তিগত, গভীর, একান্ত ভালোবাসাটা নেই।

ফিরে এসে সে আবার লিখল -
“মানুষ আমাকে ভালোবাসে - সম্মান করে, কৃতজ্ঞতা জানায়। কিন্তু কেউ আমাকে নিজের করে চায় না।” “আমি সবার, কিন্তু কেউ আমার নয়।”

দিনের পর দিন এই উপলব্ধি তাকে আরও গভীরে নিয়ে যেতে লাগল।
সে এখন বুঝতে পারছে -
ভালোবাসাহীনতা শুধু একটা অভাব নয়।
এটা একটা অভ্যেস।
একটা দেয়াল।
যা সে নিজেই তৈরি করেছে।

একদিন রাতে সে ডায়েরির একেবারে নতুন পাতায় লিখল -
“আমি কি বদলাতে চাই?”

প্রশ্নটা খুব সহজ।
কিন্তু উত্তরটা কঠিন।
সে অনেকক্ষণ ভেবে শেষে লিখল -
“হ্যাঁ… কিন্তু আমি জানি না কীভাবে।”

সেই রাতটা ছিল তার জীবনের আরেকটা মোড়।
কারণ সে প্রথমবার স্বীকার করল -

সে শুধু একা নয়, সে একা থাকতে চায়ও না।
আকাশ এখনো একই মানুষ।

ব্যবসায়ী।
দায়িত্বশীল।
সমাজের জন্য কাজ করা একজন মানুষ।

কিন্তু এখন তার ভেতরে একটা দরজা কাঁপতে শুরু করেছে।
যেটা এতদিন বন্ধ ছিল।
হয়তো সেই দরজা একদিন খুলবে।
হয়তো খুলবে না।

কিন্তু সে এখন অন্তত জানে -
দরজাটা আছে।


(চলবে - তৃতীয় পর্বে আকাশ নিজের অতীত, নিজের সিদ্ধান্ত এবং নিজের ভেতরের দেয়ালের মুখোমুখি হবে…)

কোন মন্তব্য নেই:

ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি (দ্বিতীয় পর্ব) - আকাশ আহমেদ

(দ্বিতীয় পর্ব: নীরবতার গভীরতা) প্রথম পর্বের সেই বৃষ্টিভেজা রাতের পর আকাশের জীবনে বাইরে থেকে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। ব্যবসা আগের মতোই চ...

জনপ্রিয় পোস্ট