সকাল থেকেই আকাশের মুখটা ভারি করে আছে, মনে হচ্ছে অনেক ক্ষোভ জমে গেছে এবং যেকোনো মূহুর্তে ক্রোধের বিস্ফোরণ হতে পারে। খড়ের চালে গুঁজে রাখা টিয়াপাখির খাঁচাটি বাতাসের অবগাহনে নৃত্যশিল্পীর ন্যায় দুলছে মাঝে মাঝে। ঈশান কোণে জমা মেঘেরা আরও কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করে ঘনীভূত হতে থাকল৷ ছোট্ট টুনটুনি শাবক নিয়ে মা টুনটুনির বাসা ঠিক করার অর্থ বুঝি খুব শীঘ্রই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আগত। দলেদলে ধুলো উড়িয়ে বলদের দল চোখে একরাশ ভীতি নিয়ে গোয়ালে ফিরছে। কলের পঁচা গর্তে বসবাসকারী কুনোব্যাঙেরা বৃষ্টির আবেদনে ধর্মঘট ডেকেছে। তাই অজ পাড়া গাঁয়ের প্রতিটি বাড়িতেই নিজের তল্পিতল্পা গুছিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান চলছে।
হঠাৎ দমকা হাওয়া উঠল.....
গায়ের একদম শেষ প্রান্তে যেখানে নদীটা বাঁক নিয়েছে, ওখানেই থাকে প্রস্ফুটিত তুলোর মত শুভ্র চুল আর স্পষ্ট বলিরেখা যুক্ত অচল বৃদ্ধা সোহাগি দেবী। বয়স আশির ঘরে পা দিয়েছে। এগারো ভাইয়ের একমাত্র বোন হওয়ায় বড্ড আদর করে নামটা রাখে। কিন্তু ভাগ্যের কুদৃষ্টিতে জন্মের বছর চারেক পর বড় লরির ধাক্কায় বাবা-মায়ের অপমৃত্যু হয়। জীবনের সকল সোহাগ মুছে কাগজ কুড়ুনির জীবন শুরু হয়। লেখাপড়া বলতে ঐ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার। ভাইদের বোঝা সোহাগির জন্য চিন্তার ভাঁজ মুছতে এগারো বছরেই ভ্যানচালক কাজলের সাথে বিয়ে হয়। পণ বাবদ একটা নতুন ভ্যান উপহার নিয়ে তবেই সোহাগিকে ঘরে তোলে। আর্থিক টানাপোড়েনের সংসারে গৃহকর্মের পাশাপাশি সোহাগিকে কচু শাঁক, ঢেঁকিশাক, হেলেঞ্চা শাক প্রভৃতি বিক্রি করে বাজার সদাই করতে হত। বড় বাজারে যাওয়ার পথটি আজও মেঠোপথ হওয়ায় বর্ষা ঋতুতে ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকে, তাই এই সময়ে সোহাগিকে এক হাতেই সংসার চালাতে হয়। তাছাড়াও স্বামীর দেশি মদের দাবি পূরণেও কিছু অর্থ ব্যয় হয়।
সে জনার অশেষ কৃপায় দশ বছরের দাম্পত্য জীবনে দুই ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়েটা সবার ছোট ছিল। দু'বছর আগে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। ছেলে দুটোকে মানুষ করতে সোহাগি দেবীকে মাঠের কাজও করতে হয় ; এই যেমন, ধান রোপন করা, ধান কাটা, তুলো তোলা, লঙ্কা তোলা, গম কাটা, রজনীগন্ধা ফুল তোলা প্রভৃতি। প্যারালাইসিস হওয়ার দরুন আজকাল স্বামী কাজলের আর ভান টানার সামর্থ্য নেই, তাই দুই ছেলের লেখাপড়া আর সংসার চালানো পুরোটাই সোহাগির ঘাড়ে। পড়াশোনায় বেশ মেধাবী হওয়ায় দুই ছেলে সরকারি বৃত্তি পায়। এক বছরে ছোট-বড় হওয়ায় পড়াশোনার খরচ বেশ অনেকটাই।
উচ্চমাধ্যমিকে ভালো নম্বর পেয়ে ছেলে দুটো এখন শহরের কলেজে পড়ে। হাতখরচ বার করতে একজন টিউশনি করে আর একজন রেস্তোরাঁয় কাজ করে। একদিন সকালে মালিকের রজনীগন্ধা ফুল সংগ্রহ শেষে বাড়ি ফিরে সোহাগি দেখল পিপড়েরা দলবেঁধে তাদের ঘরের মাচার দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং কিছু মাছি উল্লাসের সুরে কাজলের শরীরের উপর নৃত্য করছে। অশ্রুসিক্ত নয়নে সোহাগি ছুটে গেল গাঁয়ের একমাত্র বদ্যি অলক রায়ের বাড়ি। তড়িঘড়ি তাকে ডেকে নিয়ে বাড়ি ফিরেও কোনো লাভ হলো না, তিনি বললেন গতরাতে তিনি মারা গেছেন। সরাসরি কোনো যোগাযোগ ছিল না এবং সামনে চাকরি পরীক্ষা থাকায় চিঠি লিখে ছেলেদের কাছে এই দুঃসংবাদ দিল না। গ্রামের কিছু প্রতিবেশীদের নিয়ে কাজলের শেষকৃত্য সম্পন্ন করল।
সোহাগি দেবীর একমাত্র সম্বল তথা বেঁচে থাকার অবলম্বন ছেলে দুটো। চাকরির পরীক্ষা ভালো হল এবং একজন ছেলে হাইস্কুলের মাস্টার আর একজন বি.ডি.ও অফিসে চাকরি পেল। বেশ মোটা অঙ্কের বেতন পায় ছেলেরা, কাজের সুবাদে গাঁয়ের মাতব্বর শমিক মুখার্জি শহুরে গেলে নাকি ছেলেদের সাথে দেখা হয়। বড় খোকা আবার গোপনে বিয়েও করে নিয়েছে আর তার বৌ বিদ্যুৎহীন গ্রামে থাকতে চায় না, ছোট খোকার অফিসের এখন অনেক চাপ, তাই তাদের আর আসার সময় হয় না। শেষবার দুই ছেলে যখন কোচিং এ ভর্তির জন্য টাকা নিতে এসেছিল তখনই সোহাগি দেবীর একটি পা প্রায় অচল, সঞ্চয় ভাণ্ডার ভেঙে দুই ছেলেকে দেওয়ার পর একদম নিঃস্ব হয়ে যায়। আস্তে আস্তে দ্বিতীয় পায়ের ব্যামো বেড়ে যায় এবং সেও চলতে অক্ষম জানিয়ে দেয়। অচল হলেও ভিক্ষাবৃত্তিরও কোনো সুযোগ নেই, পাড়াগাঁয়ের বেশিরভাগ লোকেরই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, তাই কে কে ভিক্ষা দেবে! শহরের স্টেশনের পাশে একটা লঙ্গরখানা আছে, আর ওনাকে দুস্থদের খেতে দেওয়া হয় কিন্তু যাওয়ার সামর্থ্য কোথায়?
গত চার বছর আগে, যেবার আকাশ একেবারে নির্জলা ছিল, আর মাঠ একদম ফসলশূন্য, সেবার দুই ছেলে আর বড় বৌমা এসেছিল গাঁয়ে। তাদের হাজার ব্যস্ততার কথা বলে কিছু টাকা দিয়ে চলে যায়। সোহাগিকে ভালো থাকতে বলে, আর তাদের এভাবে আসার সময় হবে না এটা স্পষ্ট জানায়। নিজের নাড়িছেঁড়া সন্তান দূরে রেখে নিঃস্ব হয়ে স্মৃতির গারদে বন্দী থেকে কিভাবে ভালো থাকবে সোহাগি। তবু সন্তানের মঙ্গল চেয়ে আজ শুধু যমদূতের পথ চেয়ে বসে থাকে।
সেদিন সন্ধ্যায় আবার ভীষণ আকাশ ডাকতে শুরু করল, কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যাওয়ায় চারিদিকে অন্ধকারে গিলে নিল৷ ভাঙা জানলায় দমকা বাতাস এসে জানান দিল, জোর বৃষ্টি আসছে। ছিদ্র খড়ের ঘরে জলবিন্দুর নিঃসরণ বুঝি, বিদায়ের বার্তা। উল্টোপাল্টা হাওয়া এসে মাচার নিচে জ্বালানো মোমবাতিটা নিভিয়ে দিল। স্মৃতির ভয়াল আর্তনাদে সোহাগির গলাটা শুকিয়ে এল। বিকট শব্দে পাড়াময় গভীর আতঙ্ক তৈরি হল৷ ঘরের পিছনে ছিল শতবর্ষী পুরানো এক শেওড়া গাছ। দুটো বজ্র ধেয়ে আসল গাছের উপর এবং নিজের তেজ দেখিয়ে পুরো গাছটিকে কবজা করে নিল, মুহুর্তে ঝলসে গেল গাছটি এবং নিজের অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
বৃষ্টি থেমে গেলে পাড়ার মধ্যে হৈ-চৈ পড়ে গেল। বৃদ্ধার বাড়িতে এক ছিন্নভিন্ন গাছের শোকের আবহে নিস্তব্ধতা বিরাজ করল!
 |
| সালাম মালিতা |
1 টি মন্তব্য:
শব্দ শুধু উচ্চারণ নয়,
মায়ের কান্না,, শক্তি ত্যাগ বোধ উপলব্ধি এই গল্পে।
শেষ অংশ আমাকে বাকরুদ্ধ করলো 🙏🏻🙏🏻
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন