ভোর এখনো পুরোপুরি জাগেনি।
আকাশের পূর্বদিকে হালকা লালচে রেখা, যেন সূর্য উঠবার আগে পৃথিবী একটু লজ্জা পেয়ে থেমে আছে। ঠিক সেই সময়েই উঠে পড়ে রামু। তার অ্যালার্ম লাগে না- অভ্যাসই তাকে জাগিয়ে তোলে। পাশে মাটির মেঝেতে শুয়ে আছে তার দুই সন্তান, আর কোণে অর্ধেক ভাঙা খাটে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে আছে তার স্ত্রী সীতা।
রামু নিঃশব্দে উঠে বসে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ঘরের দিকে- এই ছোট্ট, টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরটাই তার সব। তারপর ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। মুখে পানি দেয়, একটা পুরনো গামছা দিয়ে মুখ মুছে নেয়।
আজও একটা নতুন দিন- কিন্তু তার কাছে প্রতিটা দিনই যেন একই।
রামু একজন নির্মাণ শ্রমিক।
শহরের বড় বড় দালানগুলো যেগুলো দেখে মানুষ বিস্মিত হয়, সেগুলোর ভেতরে তার মতো অসংখ্য মানুষের ঘাম মিশে থাকে। কিন্তু সেই ঘামের গল্প কেউ জানতে চায় না।
সকাল ছয়টার আগেই তাকে বের হতে হয়। আজও হলো তার ব্যতিক্রম নয়। সীতা আধো ঘুমের মধ্যে উঠে পড়ে, হাতে গরম চা ধরিয়ে দেয়।
“আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো,” আস্তে করে বলে সে।
রামু শুধু মাথা নাড়ে। সে জানে- এই কথার ভেতরে কত আশা লুকিয়ে আছে, আর সেই আশা পূরণ করতে না পারার কষ্টও সে জানে।
কাজের জায়গায় পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। ভাঙা রাস্তা, ঠাসা বাস, ঠেলাঠেলি- সবকিছু পেরিয়ে যখন সে নির্মাণস্থলে পৌঁছায়, তখন সূর্য পুরোপুরি উঠে গেছে।
সাইটে ঢুকেই শুরু হয় কাজ। ইট তোলা, বালি টানা, সিমেন্ট মেশানো- কোনো কাজই সহজ নয়। মাথার ওপর রোদের তাপ, শরীরে ঘাম, পায়ে ক্লান্তি- সবকিছু মিলিয়ে দিনটা যেন একটা দীর্ঘ যুদ্ধ।
রামু কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে থেমে যায়। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল দালানটার দিকে তাকায়। ভাবতে থাকে- একদিন এই দালানে হয়তো বড় বড় মানুষ থাকবে, এয়ারকন্ডিশনের ঠান্ডা হাওয়ায় বসে থাকবে। কিন্তু সে? সে তো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে, রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে।
দুপুরে একটু বিরতি মেলে। একটা শুকনো রুটি আর আলুর তরকারি খায়। পাশে বসে থাকা আরেক শ্রমিক, গোপাল, হঠাৎ বলে ওঠে -
“ভাই, এত কষ্ট করি, তবুও কিছুই বদলায় না কেন?”
রামু একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে -
“আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না, ভাই। আমরা শুধু কাজ করি, আর বাকিরা ফল ভোগ করে।”
দুপুরের পর আবার শুরু হয় কাজ। শরীর তখন আর সায় দিতে চায় না, কিন্তু থামার উপায় নেই। দিন শেষে মজুরি না পেলে ঘরে খাবার উঠবে না।
বিকেলের দিকে হঠাৎ একটা ছোট দুর্ঘটনা ঘটে। একজন শ্রমিক পা পিছলে পড়ে যায়। সবাই ছুটে আসে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার সবাই কাজে ফিরে যায়। কারণ এখানে থামার সুযোগ নেই। কষ্ট, ব্যথা- সবকিছু চাপা দিয়ে কাজ করে যেতে হয়।
রামু এই দৃশ্য দেখে ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। ভাবে- যদি একদিন তার সাথেও এমন কিছু ঘটে? তার পরিবার তখন কী করবে? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।
দিন শেষে যখন কাজ শেষ হয়, তখন শরীর যেন আর নিজের থাকে না। তবুও সে হাঁটে- ধীরে ধীরে, ক্লান্ত পায়ে বাড়ির দিকে।
বাড়ি পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। ঘরে ঢুকতেই দুই সন্তান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। এই মুহূর্তটাই তার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
“বাবা, তুমি আজ কী এনেছো?” ছোট ছেলেটা জিজ্ঞেস করে।
রামু হাসে। পকেট থেকে একটা ছোট বিস্কুটের প্যাকেট বের করে দেয়। ছেলেটার মুখে হাসি ফুটে ওঠে-এই ছোট্ট হাসিই তার দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
রাতের খাবার খেতে বসে সীতা জিজ্ঞেস করে -
“আজ কত পেলেন?”
রামু একটু থেমে বলে -
“আজ পুরোটা দেয়নি… বলেছে কাল দেবে।”
সীতার মুখটা একটু ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু সে কিছু বলে না। কারণ সে জানে- এই কথাগুলো বলার মধ্যেই রামুর কতটা অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রামু একা বসে থাকে। বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে, কিন্তু তার ভেতরে যেন অন্ধকার।
সে ভাবে -
তারও তো স্বপ্ন ছিল। ছোটবেলায় পড়াশোনা করবে, ভালো একটা কাজ করবে। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে সেই স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
আজ সে শুধু একজন শ্রমিক- যার নাম নেই, পরিচয় নেই, আছে শুধু পরিশ্রম।
কিন্তু তবুও, তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে। প্রতিদিন নতুন করে শুরু করার শক্তি। নিজের কষ্ট ভুলে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর শক্তি।
সে জানে - তার গল্প কেউ লিখবে না। তার কষ্ট কেউ বুঝবে না। কিন্তু তবুও সে থামে না।
কারণ সে জানে -
তার থেমে যাওয়া মানেই তার পরিবারের থেমে যাওয়া।
রাত গভীর হয়। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার।
কাল আবার ভোর হবে, আবার শুরু হবে সেই একই লড়াই।
কিন্তু সেই লড়াইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার ভালোবাসা, দায়িত্ব আর বেঁচে থাকার এক নিরন্তর সংগ্রাম।
এই হলো একজন মেহনতি শ্রমিকের না বলা গল্প -
যেখানে কষ্ট আছে, বঞ্চনা আছে, তবুও আছে অদম্য জীবনের জেদ।
আর হয়তো একদিন,
এই নীরব ঘামের গল্পগুলোই বদলে দেবে পৃথিবীর ভাষা।

1 টি মন্তব্য:
এই তো ওদের জীবন !
চমৎকার লিখেছেন 👌
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন