গল্পধারা বুধবার 🔰
বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত -
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন
সম্পাদক - আকাশ আহমেদ
প্রকাশঃ ২০ ই মে ২০২৬ (বুধবার)
প্রচ্ছদ ডিজাইনঃ সর্বানী দাশ
------------------------------------------------------------------------------------
ধারাবাহিক গল্প:
অচেনা ঠিকানায় শেষ বিকেলের চিঠি
লেখিকা: সাদিয়া চৌধুরী রুনা
পর্ব – ২
(স্মৃতির সিন্দুক ও একটি অসম্পূর্ণ ডায়েরি)
বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছে -
শমসের সাহেব অরণির সাথে একটা পুরনো ট্যাক্সিতে করে শহরের শেষ সীমানার দিকে যাচ্ছেন। ট্যাক্সির কাঁচের ওপাশে ঝাপসা হয়ে আসা রাস্তার আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে শমসের সাহেবের মনে হচ্ছিল, তিনি যেন বর্তমান থেকে পঁচিশ বছর আগের কোনো এক অতীতে ফিরে যাচ্ছেন। অরণি চুপচাপ বসে আছে। তার হাতের আঙুলগুলো নীলুফার মতোই লম্বা আর সরু।
ট্যাক্সিটা এসে থামল একটা জীর্ণ দোতলা বাড়ির সামনে।
বাড়ির চারপাশটা ঝোপঝাড়ে ঘেরা, আর গেটের ওপর লতাগুল্মের এক অদ্ভুত রাজত্ব। ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের সেঁতসেঁতে সোঁদা গন্ধ নাকে এলো। অরণি ড্রয়িং রুমের কোণ থেকে একটা পুরনো ট্রাঙ্ক বের করে আনল। ধুলো আর মাকড়সার জালে ঘেরা সেই ট্রাঙ্কটির ঠিক মাঝখানে একটা পিতলের তালা।
অরণি বলল -
- "শমসের জেঠু, এই সেই সিন্দুক। মা মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে আমাকে বলেছিলেন, এই তালার চাবিটা আপনার কাছে আছে।
- মা বলেছিলেন— 'এই সিন্দুকটা খোলার অধিকার শুধু তাঁরই আছে, যিনি আমার সব নীরবতাকে ভাষা দিতে পারতেন'।"
শমসের সাহেব পকেট থেকে সেই মরচে ধরা চাবিটা বের করলেন। চাবিটা ঘুরাতেই একঘেয়ে এক শব্দ করে তালাটা খুলে গেল। সিন্দুকটা খুলতেই শমসের সাহেব যা দেখলেন, তাতে তার দীর্ঘদিনের জমানো ধৈর্য বাঁধ মানল না।
ভেতরে কোনো হিরে-জহরত নেই।
আছে শুধু শত শত চিঠির খাম। নীল, সাদা আর হলদেটে রঙের চিঠির স্তূপ।
প্রতিটি খামের ওপর লেখা—
*'শমসেরের জন্য'*।
শমসের সাহেব একটি নীল রঙের খাম তুলে নিলেন। চিঠির তারিখটা আজকের থেকে ঠিক কুড়ি বছর আগের।
নীলুফা লিখেছে -
"আজ আকাশটা মেঘলা, শমসের। তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। আমি জানি তুমি ভাবছো আমি তোমাকে ঠকিয়েছি। আমি হঠাৎ কেন উধাও হলাম, সেই কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ আমার বাবা আমাকে দেননি। যে রাতে আমরা পালানোর কথা ভেবেছিলাম, তার আগের রাতেই আমাকে একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। তারপর জোর করে বিয়ে দিয়ে পাঠানো হলো এই সুদূর শহরে। আমার অপরাধ ছিল আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, আর তোমার অপরাধ ছিল তুমি একজন সামান্য ডাকপিয়ন। সমাজ আর আভিজাত্যের লড়াইয়ে আমার ভালোবাসাটা হেরে গেল, শমসের।"
চিঠিটা পড়তে পড়তে শমসের সাহেবের চোখের জল চিঠির কাগজের ওপর টপটপ করে পড়তে লাগল। তিনি জানতেন না, পঁচিশ বছর ধরে তিনি যে নীলুফাকে ঘৃণা করে এসেছেন, সেই নীলুফা প্রতিদিন তার সাথে মনে মনে কথা বলেছে।
সিন্দুকের ভেতর আরও একটা জিনিস ছিল—একটি ছোট ডায়েরি। ডায়েরিটা খুলতেই শমসের সাহেব দেখলেন, সেখানে নীলুফা প্রতিদিনের রুটিন লিখে রাখত। ডায়েরির পাতায় পাতায় বকুল ফুলের শুকনো পাপড়ি লেপ্টে আছে। ডায়েরির শেষ পাতায় নীলুফা লিখেছে -
"শমসের,
আমি জানি এই চিঠিগুলো কোনোদিন ডাকবক্সে জমা হবে না। আমি জানি তুমি কোনোদিন এগুলো বিলি করতে আসবে না। কিন্তু আমি তো ডাকপিয়নের প্রেমিকা। আমি বিশ্বাস করি, একদিন ঠিক কোনো এক অলৌকিক উপায়ে এই কথাগুলো তোমার কাছে পৌঁছাবে। আমার চাবিটা তোমার কাছেই আছে। চাবিটা দিয়ে তুমি শুধু এই সিন্দুক নয়, আমার জীবনের সেই অন্ধকার ঘরটাকেও মুক্ত করে দিও।"
অরণি শমসের সাহেবের কাঁধে হাত রাখল -
- "জেঠু, মা আপনাকে কোনোদিন ভুলতে পারেননি। বাবার সাথে মার কোনোদিনও বনিবনা হয়নি। মা শুধু আপনার চিঠির প্রতীক্ষায় জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।"
শমসের সাহেব সিন্দুকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ভাবলেন, পঁচিশ বছর ধরে তিনি কত শত মানুষের চিঠি বিলি করেছেন, কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান চিঠিগুলো তার সামনেই ছিল, অথচ তিনি তা জানতে পারেননি।
হঠাৎ অরণি বলল -
"জেঠু, এই সিন্দুকের নিচে একটা গোপন কম্পার্টমেন্ট আছে। সেখানে আরও একটা জিনিস আছে যা দেখে আপনি চমকে যাবেন। ওটা মা আপনার জন্যই বিশেষভাবে বানিয়েছিলেন।"
শমসের সাহেব সিন্দুকের তলানিটা সরাতেই এক অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলেন। সেটা ছিল একটা হাতে তৈরি কাঠের নকশা।
কিন্তু সেটা কীসের নকশা ?
শমসের সাহেবের মনে হলো, এই নকশাটা যেন একটা মানচিত্র।
কিন্তু কোথায় যাওয়ার মানচিত্র ?
-------------------------------------------------------------------
![]() |
| লেখিকা: সাদিয়া চৌধুরী রুনা |
সাদিয়া চৌধুরী রুনা (পিতা: আবদুস সোবহান) একজন স্বপ্নবাজ লেখিকা। পড়াশোনা করেছেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে। ফেসবুকের পরিচিত মুখ সাদিয়া নিয়মিত লেখালেখি করছেন এবং তাঁর কবিতা ইতিপূর্বেই বেশ কিছু যৌথ কাব্যগ্রন্থে স্থান করে নিয়েছে।


1 টি মন্তব্য:
ভালো লেখা
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন