রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

প্রজাতন্ত্র দিবস ও সংবিধান (লেখিকা- সর্বানী দাস)

প্রজাতন্ত্র দিবস ও সংবিধান
(লেখিকা- সর্বানী দাস)

ভারতের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে ২৬ শে জানুয়ারি গণতন্ত্রের জয়ের দিন হিসেবে একটি মাইলফলক। সংবিধানসভা গঠিত হয় ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬ এবং প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯। ভারতীয় সংবিধান ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ তারিখে কার্যকর হয়। ভারতে এই দিনটিকে গণতন্ত্র দিবস (Republic Day) হিসেবে পালন করা হয়। এই দিনে ভারত একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। 

প্রজাতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক জাতীয় উৎসব নয়। জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক নৈতিকতার  একটি প্রক্রিয়া। প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতের রাষ্ট্রগঠনে  মূল ভিত্তি। ভারতীয় সংবিধান, জনগণের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্রের নীতির এক অনন্য অধ্যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে, সাংবিধানিক শাসনের সূচনার ইতিহাস রচনা করে প্রজাতন্ত্র দিবস।আব্রাহাম লিংকনের বিখ্যাত উক্তি "Government of the people, by the people, for the people" এর বাংলা অর্থ হলো—"জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা (নির্বাচিত/পরিচালিত) এবং জনগণের জন্য (নিবেদিত)" । এটি গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র, যেখানে সরকার জনগণের অংশগ্রহণ, তাদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং তাদের কল্যাণে কাজ করে থাকে।

ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে ২৬ শে জানুয়ারি  অজ্ঞানিকভাবে যুক্ত। ১৯২৯ সালের লাহোর কংগ্রেসের অধিবেশনে "পূর্ণ স্বরাজ" এর প্রস্তাব গৃহীত হয়। এবং ২৬ শে জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

সংবিধানকে কার্যকর করার জন্য ২৬ শে জানুয়ারি দিনটি ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ডঃ বি. আর আম্বেদকর এর নেতৃত্বে  ন্যায় সাম্য ও স্বাধীনতার নীতিগুলোকে স্পষ্ট ভাবে লিখিত আকারে তুলে ধরেন। গ্র্যানভিল অস্টিন এর মতে  ভারতীয় সংবিধান একটি "সামাজিক বিপ্লবের দলিল "। তিনি আরও বলেন ভারতীয় সংবিধানের লক্ষ্য গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজের বৈষম্যমূলক কাঠামো দূরীকরণ। 

২৬ শে জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের তাৎপর্য হলো জনগণের সার্বভৌমত্বের বাস্তবতা কে রূপায়ণ করা। সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত করা। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা নির্দিষ্ট করা সংবিধানের মূল লক্ষ্য। প্রজাতন্ত্র দিবসের রাষ্ট্রীয় আচার অনুষ্ঠান ভারতীয় জনগণকে সংবিধান সম্পর্কে সচেতন করতে ও জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে সাহায্য করে।

ডঃ বি আর আম্বেদকর ' সাংবিধানিক নৈতিকতা 'র উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং গণতন্ত্র কেবল আইনি কাঠামোর উপর নয়, নাগরিকদের নৈতিক চর্চার ওপরও নির্ভরশীল, এই কথা সুস্পষ্ট করেছিলেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড জে লাস্কি বলেছিলেন" একটি রাষ্ট্রকে শুধু তার ভূখণ্ড বা জনসংখ্যা দিয়েছে চেনা যায় না, রাষ্ট্রকে চেনা যায় সেই নীতির মাধ্যমে, যার ওপর ক্ষমতা সংঘটিত হয় "।  প্রজাতন্ত্র বলতে বোঝায় এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে জনগণ সর্বোচ্চ ক্ষমতার উৎস।

সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের প্রবর্তক জঁ বোদান বলেন -- " সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ও স্থায়ী ক্ষমতা "। ভারতের ক্ষেত্রে এই চূড়ান্ত ক্ষমতা কোন রাজা সাম্রাজ্য বা শাসক গোষ্ঠীর হাতে নয়, সংবিধানের মাধ্যমে জনগণের হাতে ন্যাস্ত। ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় ব্যবহৃত " আমরা ভারতের জনগণ " এই বাক্যটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনগণের সার্বভৌমত্ব ধারণায়  অনন্য।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতাকে  ১) প্রথাগত বৈধতা, ২) ক্যারিশ মাটিক বৈধতা, ৩) আইনগত - যুক্তি নির্ভর বৈধতা, এই তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন "-- আধুনিক রাষ্ট্রের বৈধতা মূলত আইন ও যুক্তি নির্ভর কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত। আইন এবং যুক্তি নির্ভর বৈধতার কেন্দ্রবিন্দু হল সংবিধান।

প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতের গণতান্ত্রিক চেতনার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। ২৬শে জানুয়ারী প্রজাতন্ত্র দিবস ভারতের রাষ্ট্রতত্ব, সার্ভভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক নৈতিকতার প্রতীক। এই দিনটি ভারতীয় জনগণের ক্ষমতা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের পুনঃঅঙ্গীকারের দিন। তাই প্রজাতন্ত্র দিবস আত্মসমালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

৩টি মন্তব্য:

Sarbani Das বলেছেন...

অসংখ্য ধন্যবাদ 🙏🏻বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ কে জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা 🙏🏻

নামহীন বলেছেন...

ভালো লাগল

Sarbani Das বলেছেন...

ধন্যবাদ

জনপ্রিয় পোস্ট