প্রজাতন্ত্র দিবস
লেখক: আল মাওয়াকিফ (ছদ্ম নাম)
উৎসবের মুখোশ ও রাষ্ট্রের নয় এটি রাষ্ট্রের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর। এই দিন রাষ্ট্র নিজেই নিজের দিকে তাকায় যদি তাকাতে সাহস করে।পতাকা উত্তোলনের আড়ালে যে আয়নাটি সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়, সেখানে রাষ্ট্রের নৈতিক মুখচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উৎসব তখনই অশোভন হয়ে পড়ে, যখন ন্যায় কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকে, আর বাস্তব জীবনে তা অনুপস্থিত।
প্রজাতন্ত্র কেবল শাসনের কাঠামো নয় এটি একটি নৈতিক প্রতিশ্রুতি। রাষ্ট্র নাগরিকের উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করবে কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। সংবিধান সেই সীমারেখা, যেখানে রাষ্ট্র নিজেকে সংযত করতে বাধ্য হয়। যে রাষ্ট্র এই সংযম হারায়, সে শক্তিশালী হতে পারে কিন্তু ন্যায়পরায়ণ থাকে না।
আমরা প্রজাতন্ত্র উদ্যাপন করতে জানি, কিন্তু তার দায় বহন করতে ভয় পাই। সংবিধান পাঠ করি, কিন্তু তার সামাজিক প্রয়োগ এড়িয়ে যাই। রাষ্ট্র যখন দুর্বল নাগরিককে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রজাতন্ত্র একটি শব্দে পরিণত হয় একটি শূন্য প্রতীক, যার ভেতরে কোনো মানবিক স্পন্দন থাকে না।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা হলো এটিকে কেবল ভোটাধিকার হিসেবে কল্পনা করা। অথচ গণতন্ত্র একটি দৈনন্দিন নৈতিক অনুশীলন। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, ভিন্নমতের সহনশীলতা এবং ন্যায়বিচারের অবিচল দাবি এই তিনটি অনুপস্থিত হলে গণতন্ত্র কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক নাটক হয়ে ওঠে। যেখানে প্রশ্নকারী নাগরিক রাষ্ট্রের অস্বস্তিতে পরিণত হয়, সেখানে গণতন্ত্র আগেই পরাজিত।
প্রান্তিক মানুষের জীবনে প্রজাতন্ত্র কোনো তত্ত্ব নয় এটি বেঁচে থাকার শেষ নৈতিক আশ্বাস।
যে মানুষটি ভূমিহীন, যে শ্রমিকটি অদৃশ্য, যে নারীটি প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে বসবাস করে তাদের কাছে সংবিধান মানে রাষ্ট্র এখনো সম্পূর্ণরূপে মানবিকতা বিসর্জন দেয়নি এই ক্ষীণ বিশ্বাস। এই বিশ্বাস ভেঙে গেলে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না তখন সে কেবল ক্ষমতার এক নির্মম কাঠামো।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার স্মৃতিতে। স্মৃতি রাষ্ট্রকে নৈতিক রাখে কারণ স্মৃতিই অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি রোধ করে। রাষ্ট্র যখন নিজের ভুলগুলো ভুলে যায়, তখন সে ক্ষমতাবান হয় কিন্তু মানবিক থাকে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় স্মৃতিহীন রাষ্ট্র কখনো ন্যায়বান হতে পারে না।
প্রজাতন্ত্র দিবসে আমার কোনো উল্লাস নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিক আনন্দ। আমার কাছে এই দিনটি আত্মজিজ্ঞাসার দিন। প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু ভয়ংকর
রাষ্ট্র কি আজও সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটির পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক সক্ষমতা রাখে?
রাষ্ট্র কি প্রশ্নকে ভয় না পেয়ে তাকে নিজের সংশোধনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে পারে?
যদি রাষ্ট্র এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াতে না পারে, তবে পতাকা উত্তোলন কেবল একটি অভ্যাসে পরিণত হবে আর প্রজাতন্ত্র থাকবে, কিন্তু তার আত্মা অনুপস্থিত থাকবে।
আজ প্রজাতন্ত্র দিবসে আমার কোনো উৎসব নেই। আছে কেবল একটি অনড় দাবি সংবিধান শ্লোগান হয়ে নয়, জীবনের নৈতিক অনুশাসন হয়ে উঠুক।
রাষ্ট্র শাসন করুক কিন্তু আগে ন্যায়ের কাছে জবাবদিহি করুক।
1 টি মন্তব্য:
অসাধারণ লিখেছেন 🙏🏻
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন