মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬

অক্ষরের ঘরবাড়ি (লেখক- আকাশ আহমেদ)

অক্ষরের ঘরবাড়ি
লেখক- আকাশ আহমেদ

শহরের শেষ প্রান্তে, রেললাইনের ধারে একটা ছোট্ট ঘর ছিল। টিনের চাল, একপাশে মরচে ধরা জানালা, আর দরজার গায়ে বহু বছরের পুরোনো পোস্টার—কোনোটায় কবিতার লাইন, কোনোটায় কোনো সাহিত্য সভার আহ্বান। ঘরটার নাম কেউ জানত না, কিন্তু আশপাশের মানুষ একে ডাকত—

“ওই লেখার ঘরটা।”

এই ঘরেই থাকত নীলয় সরকার। নীলয় কোনো নামী লেখক ছিল না। কোনো পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্টও না। তার বই প্রকাশ পায়নি কোনো বড় প্রকাশনায়। তবু নীলয়ের ঘরে প্রতিদিন আলো জ্বলত—অক্ষরের আলো।

সে বিশ্বাস করত,
সাহিত্য মানে বিখ্যাত হওয়া নয়, সাহিত্য মানে বেঁচে থাকার আরেকটা ভাষা।

সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকলে নীলয় প্রথমে তাকাত তার বইয়ের তাকটার দিকে। তাক নয় আসলে—ইট আর কাঠের তক্তা জুড়ে বানানো একটা অস্থায়ী আলমারি। সেখানে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, মানিক, মহাশ্বেতা—সবাই পাশাপাশি। কারো গায়ে নতুন বাঁধাই, কারো মলাট ছেঁড়া, পাতায় পাতায় দাগ।

নীলয় বইগুলোকে মানুষ মনে করত।
সে প্রায়ই বলত—
“মানুষ যেমন কথা বলতে না পারলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে যায়, বইও তেমনই—পড়া না হলে তারা নিঃশ্বাস নিতে পারে না।”

তার জীবিকার নাম ছিল টিউশন। সকালে দুটো, বিকেলে তিনটে। বাকিটা সময়—লেখা, পড়া, ভাবা।
একদিন বিকেলে, টিউশন শেষে ফিরতে ফিরতে সে দেখল, রেললাইনের পাশে একটা ছেলে বসে আছে। বয়স বড়জোর দশ-এগারো। চোখে অদ্ভুত একটা শূন্যতা।

নীলয় জিজ্ঞেস করল,
“কি রে, এখানে বসে আছিস কেন?”
ছেলেটা চুপ করে রইল।
নীলয় আবার বলল,
“বই পড়তে পারিস?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল—না।
নীলয় হাসল।
“ভয় নেই। আমিও প্রথমে পারতাম না।”

ছেলেটার নাম ছিল রাহুল। বাবা নেই, মা লোকের বাড়িতে কাজ করে। স্কুলে যায় ঠিকই, কিন্তু পড়া তার কাছে বোঝা।

নীলয় রাহুলকে নিয়ে এল তার ঘরে।
সেই প্রথম রাহুল বইয়ের ঘর দেখল।
ওর চোখ বড় হয়ে গেল।
“এত বই!”
“এগুলো কি বিক্রি করো?”
নীলয় বলল,
“না। এগুলো আমার বন্ধু।”
রাহুল অবাক হয়ে তাকাল।
“বই আবার বন্ধু হয় নাকি?”

নীলয় একটা বই নামাল। পাতাটা খুলে পড়ল—
“এই তো বন্ধু। যখন কেউ কথা শোনে না, তখন এরা শোনে।”

সেই দিন থেকেই রাহুল প্রায় প্রতিদিন আসতে লাগল। প্রথমে শুধু বসে থাকত। তারপর ছবি দেখত। ধীরে ধীরে অক্ষর চিনল। তারপর শব্দ।
একদিন রাহুল হঠাৎ বলল,
“দাদা, আমি একটা গল্প লিখতে চাই।”
নীলয় চুপ করে তাকিয়ে রইল। চোখে জল চলে এল।

এই শহরে নীলয় একা ছিল না। কিন্তু সাহিত্যচর্চায় সে প্রায় একাই পড়ে গিয়েছিল। চারদিকে তখন দ্রুততার উৎসব—ভিউ, লাইক, ভাইরাল। সাহিত্য যেন ধীরে হাঁটা কোনো বৃদ্ধ।

একদিন পৌরসভার এক কর্মকর্তা এল।
“এই ঘরটা ভেঙে দিতে হবে। এখানে রাস্তা হবে।”
নীলয় জিজ্ঞেস করল,
“বইগুলো কোথায় যাবে?”
লোকটা হেসে বলল,
“বই দিয়ে রাস্তা বানানো যায় না, মাস্টারমশাই।”

সেই রাতে নীলয় ঘুমোতে পারল না। সে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে রইল। প্রতিটা বই যেন কিছু বলতে চাইছে।
রবীন্দ্রনাথ যেন বললেন—
“যেখানে ভয় নেই…”
জীবনানন্দ ফিসফিস করে বললেন—
“আবার আসিব ফিরে…”
নীলয় সিদ্ধান্ত নিল—
এই ঘর ভাঙলেও, সাহিত্যের ঘর ভাঙতে দেবে না।

পরদিন সে এলাকার ছেলেমেয়েদের ডাকল।
বলল—
“এখানে আমরা পড়ব, লিখব। যে যেমন পারে।”
প্রথম দিন এল তিনজন।
দ্বিতীয় দিন সাতজন।
এক সপ্তাহে—পঁচিশ।

কেউ কবিতা পড়ল, কেউ নিজের জীবনের কথা বলল। কেউ প্রথমবার কলম ধরল।
রাহুল সেদিন তার লেখা পড়ল—
“আমার বাবা নেই
কিন্তু আমার একটা গল্প আছে
যেখানে বাবা রোজ ফিরে আসে।”
সবার চোখ ভিজে গেল।

পৌরসভা আবার নোটিশ পাঠাল।
এবার লোকজন দাঁড়াল নীলয়ের পাশে।
একজন বলল—
“এই ঘর আমাদের বাচ্চাদের পড়তে শিখিয়েছে।”
আরেকজন বলল—
“এখানে আমার ছেলে কথা বলতে শিখেছে।”
মিডিয়াও এল। ছোট্ট খবর বেরোল—
“রেললাইনের ধারে সাহিত্যের আলো।”
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল—ঘরটা থাকবে। রাস্তা ঘুরে যাবে।

নীলয় সেদিন কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল তার বইগুলোর দিকে।

বছর কেটে গেল।
রাহুল এখন কলেজে পড়ে। মাঝে মাঝে এসে বসে।
একদিন সে বলল—
“দাদা, আমার প্রথম গল্প ছাপা হয়েছে।”
নীলয় হাসল।
বলল—
“দেখলি, সাহিত্য কাউকে বড় করে না,
কিন্তু কাউকে একা থাকতে দেয় না।”
সন্ধ্যেবেলায় ঘরের আলো জ্বলে ওঠে।

রেললাইন দিয়ে ট্রেন চলে যায়।
কিন্তু অক্ষরের ঘরটা স্থির থাকে।
কারণ...
যেখানে সাহিত্য থাকে, সেখানে মানুষ ফিরে আসে।

৩টি মন্তব্য:

নামহীন বলেছেন...

স্যার আপনার অসাধারণ একটি লেখা পড়বার সৌভাগ্য হলো। ভীষণ ভালো লাগলো লেখাটা। আপনার লেখা সবসময়ই অসাধারণ, এটাও তাক লাগিয়ে দিলো🌹🙏

নামহীন বলেছেন...

অপূর্ব, অপূর্ব। এরকম আরো অনেক লেখা চাই।

নামহীন বলেছেন...

ভালো লাগল

জনপ্রিয় পোস্ট