শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

প্রত্যাশা আছে, প্রাপ্তি নেই (লেখক: আকাশ আহমেদ)

 


জন্মের ভেতরেই শূন্যতা#

আকাশের জন্ম হয়েছিল এক প্রভাবশালী পরিবারে।

তার দাদু ছিলেন জেলার এক বড় মাপের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে আসত তার কাছে। বাড়ির উঠোনে প্রতিদিন মানুষের ভিড়, সিদ্ধান্ত, প্রভাব, ক্ষমতার গন্ধ।

কিন্তু আকাশের বাবা রাজনীতি করতেন না।

তিনি ছিলেন বড় চাকরিজীবী—নিরিবিলি, ভদ্র, দায়িত্ববান একজন মানুষ।

তিনি চেয়েছিলেন সংসারকে রাজনীতির কোলাহল থেকে আলাদা রাখতে।

কিন্তু নিয়তি সেই সুযোগ দিল না।

আকাশ যখন মাত্র ২১ দিনের শিশু, তখনই তার বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

একটি নবজাতক শিশুর কপালে তখনই লেখা হয়ে গেল—

“অপূর্ণতা”।

দাদু তখনো জীবিত।

বাড়িতে শোক এলো, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যস্ততা থামল না।

মানুষ এলো, সমবেদনা জানাল, চলে গেল।

কিন্তু ২১ দিনের সেই শিশুর বুকের শূন্যতা কেউ দেখতে পেল না।


অবহেলার মধ্যে বড় হওয়া#

ছোট থেকেই আকাশ বুঝতে শিখেছিল—

তার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু তার অনুভূতির গুরুত্ব নেই।

সে পরিবারের একমাত্র ছেলে—

কিন্তু আদরের নয়, প্রত্যাশার।

দাদুর চোখে সে ছিল ভবিষ্যৎ।

আত্মীয়দের চোখে সে ছিল বংশের মান।

সমাজের চোখে সে ছিল পরিচয়।

কিন্তু কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে বলেনি—

“তুই শুধু তুই।”

তার মা ছিলেন নীরব যন্ত্রণা।

স্বামীহারা, দায়িত্বে জর্জরিত, সামাজিক চাপের ভেতরে আটকে থাকা এক নারী।

তিনি ভালোবাসতেন, কিন্তু ভাঙা মানুষ সবসময় প্রকাশ করতে পারে না।

আকাশ ছোট থেকেই শিখল—

কাঁদতে হলে চুপচাপ কাঁদতে হয়।


১৩ বছরের এক নির্বাসন#

বয়স যখন ১৩, তখন তার ভেতরের অন্ধকার অসহনীয় হয়ে উঠল।

প্রভাবশালী বাড়ির দেয়ালগুলো তার কাছে কারাগারের মতো লাগতে শুরু করল।

এক ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই,

সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

কেউ তাকে থামায়নি।

হয়তো ভেবেছিল—ছেলেমানুষি রাগ।

হয়তো কেউ খেয়ালই করেনি।

কিন্তু সে আর ফেরেনি।

স্টেশনের বেঞ্চ, অচেনা শহরের ভিড়, ক্ষুধার রাত—

১৩ বছরের কিশোর খুব দ্রুত বড় হয়ে গেল।

অনেক রাত সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছে—

“আমার নাম আকাশ, কিন্তু আমার জন্য কি কোনো আকাশ খোলা আছে?”


চাওয়ার ভিড়ে একা#

সময় তাকে শক্ত করল।

মানুষ তার কাছে এলো—

কেউ সাহায্য চাইতে,

কেউ পরিচয়ের সুবিধা নিতে,

কেউ তার শ্রম, তার সময়, তার উপস্থিতি ব্যবহার করতে।

সে দিয়েছে।

কারণ সে জানত—

অসহায়ত্ব কাকে বলে।

কিন্তু যখন সে অসহায় হয়েছে,

তখন কেউ ছিল না।

মানুষ বলেছে—

“আকাশ খুব শক্ত।”

আসলে সে শুধু কান্না লুকাতে শিখেছিল।

তার হাসি ছিল প্রশস্ত, আত্মবিশ্বাসী।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে জমে থাকত হাজার না বলা কষ্ট।


দাদুর মৃত্যু ও আরও শূন্যতা#

দাদু বেঁচে থাকতে অন্তত একটি পরিচয়ের ছায়া ছিল।

দাদু চলে যাওয়ার পর সেই ছায়াটুকুও মুছে গেল।

পরিবারে সম্পর্ক বদলালো।

সম্মান বদলালো।

কিন্তু আকাশের অবহেলা বদলালো না।

সে বুঝল—

প্রভাবের সম্পর্ক স্থায়ী নয়।

রক্তের সম্পর্কও সবসময় আশ্রয় দেয় না।


অন্ধকার থেকে আলো#

এই দীর্ঘ অন্ধকার পথেই একদিন তার জীবনে এলো আলো।

একজন মানুষ—

যিনি তাকে ব্যবহার করতে নয়, বুঝতে এসেছিলেন।

তার জীবনসঙ্গী।

প্রথমবার আকাশ অনুভব করল—

কেউ তার চোখের ভাষা পড়ে।

কেউ তার নীরবতা শুনতে পারে।

কেউ তার শক্ত মুখের আড়ালে ক্লান্ত শিশুটাকে দেখতে পায়।

সে অবাক হয়েছিল—

“আমাকে কি সত্যিই কেউ ভালোবাসতে পারে, কোনো শর্ত ছাড়া?”

তার সঙ্গী তাকে আগলে রাখল।

তার ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে স্পর্শ করল মমতায়।

তার না বলা কষ্টগুলো শব্দ পেল।

তবু আকাশ পুরোপুরি খুলতে পারেনি।

কারণ ১৩ বছরের যে ছেলেটি একা রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল,

সে এখনো তার ভেতরে বেঁচে আছে।


নিরাপদ উত্তরাধিকার#

আজ আকাশের স্বপ্ন বদলে গেছে।

সে আর নিজের জন্য কিছু চায় না তেমন।

সে চায়—একটি নিরাপদ উত্তরাধিকার।

একটি সন্তান,

যে বাবার হাত ধরে হাঁটবে।

যে কাঁদলে বাবার কাঁধ পাবে।

যে কখনো ১৩ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবে না।

সে চায় তার সন্তান তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসুক—

যেমন ভালোবাসা সে পায়নি।

সে চায় তার সন্তান একদিন বলুক—

“বাবা, তুমি আমার নিরাপত্তা।”

সে চায় তার সন্তান তাকে আগলে রাখুক—

যেমন সে সারাজীবন অন্যদের আগলে রেখেছে।


হাসির আড়ালের মানুষ#

মানুষ আজও তাকে দেখে দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী, সফল।

সভায় সে হাসে।

মানুষের মাঝে সে প্রাণবন্ত।

কেউ বোঝে না—

রাতের নির্জনতায় সে এখনো ভেঙে পড়ে।

তার হাজার না বলা কষ্ট আছে—

বাবার মুখ না চিনতে পারার কষ্ট।

১৩ বছরে বাড়ি ছাড়ার কষ্ট।

অবহেলায় বড় হওয়ার কষ্ট।

ব্যবহৃত হওয়ার কষ্ট।

তবু সে হাসে।

কারণ সে শিখেছে—

কষ্ট প্রকাশ করলে মানুষ দুর্বল ভাবে।

আর সে আর দুর্বল হতে চায় না।


না ফেরা ঘর#

আজও তার বাড়ি ফেরা হয়নি।

বাড়ি আছে,

মানুষ আছে,

স্মৃতি আছে—

কিন্তু “ফেরা” নেই।

ফেরা মানে শুধু ফিরে যাওয়া নয়।

ফেরা মানে নিরাপত্তা।

ফেরা মানে নিঃশর্ত গ্রহণ।

সে এখন নিজের ঘর তৈরি করেছে।

নিজের পরিবার গড়েছে।

নিজের আলো জ্বালিয়েছে।

কিন্তু শৈশবের যে ঘর থেকে সে বেরিয়ে গিয়েছিল—

সেই ঘরে তার আর ফেরা হয়নি।


প্রত্যাশা আছে, প্রাপ্তি নেই—তবু আলো আছে#

আকাশের জীবনে অনেক প্রত্যাশা অপূর্ণ।

সে বাবার হাত পায়নি।

সে অবহেলাহীন শৈশব পায়নি।

সে নিঃশর্ত আগলানো পায়নি।

কিন্তু সে হেরে যায়নি।

কারণ সে অন্ধকারের ভেতর থেকেও আলো খুঁজে পেয়েছে।

সে একজন নিরাপদ জীবনসঙ্গী পেয়েছে।

সে পেয়েছে ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা।

সে পেয়েছে এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন—

যেখানে তার সন্তান কখনো তার মতো একা হবে না।

হাজার না বলা কষ্টের আড়ালেও

সে আজও হাসে।

কারণ সে জানে—

তার কষ্ট তার শক্তি।

তার অন্ধকার তার আলোকে মূল্য দিয়েছে।

প্রত্যাশা আছে—

প্রাপ্তি পুরোপুরি নেই—

তবু তার জীবন অপূর্ণ নয়।

কারণ সে নিজেই নিজের প্রদীপ।

আর যে মানুষ অন্ধকারে নিজে আলো জ্বালাতে পারে,

তার আকাশ কখনো সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকে না।


---সমাপ্ত---

৬টি মন্তব্য:

Tania Ahmed বলেছেন...

প্রাপ্তির খাতা শূন্য জেনেও ভালোবাসা যায়।
তাই যেটুকু প্রাপ্তি সৃষ্টিকর্তা রেখেছেন সেটাই স্বর্গ।
বাকি জীবনের সব প্রাপ্তি পূর্ণ হোক।❤️🥰

সালাম মালিতা বলেছেন...

সত্যিই স্যার আপনার মানসিক সক্ষমতা এবং ধৈর্যকে কুর্নিশ জানাই। একদিন পরিস্থিতি অনুকূলে চলে আসবে এবং সফলতার শেষ হাসি আপনিই হাসবেন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আগামী দিন অনেক ভালো কাটুক। 🌹🌹🌹🌹🌹

Kanti Ujjal Das বলেছেন...

পড়ে আকাশ আহমেদ এর প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা আরো বেড়ে গেল, প্রার্থনা করি আপনার বাকি জীবন ভালোবাসা ও প্রাপ্তিতে পরিপূর্ণ হোক🌹🌹

নামহীন বলেছেন...

বলার ভাষা নেই। লেখার কথা নেই তবে মা কে দেখো, খোঁজ রেখো তিনিও যে বড্ড অভাগী। ছোট্ট বয়স থেকে সব হারিয়েছে। জানি না তিনি তেমন আছেন?

নামহীন বলেছেন...

বুক চিরে লেখা। সামনের লম্বা পথে একদিন সব মলম পেয়ে যাবে। ভালো থাকুন। আশীর্বাদ দিলাম ম্যাম, আপনি সুখের স্বর্গ গড়বেন।

নামহীন বলেছেন...

ঠিক

জনপ্রিয় পোস্ট