শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বই মেলা–২০২৬ : প্রাপ্তির দীপশিখা ও অপূর্ণতার ছায়াপথ (লেখক- তামিম আদনান)

বই মেলা–২০২৬ : প্রাপ্তির দীপশিখা ও অপূর্ণতার ছায়াপথ
লেখক- তামিম আদনান

বইমেলা—শব্দটি উচ্চারণ করলেই মনের অন্তঃপুরে এক অদৃশ্য রঙধনু জ্বলে ওঠে। এ যেন কেবল কাগজে মুদ্রিত অক্ষরের সমাবেশ নয়, বরং চিন্তার চন্দ্রযাত্রা, কল্পনার কুম্ভমেলা, আত্মার অনাবিল উত্সব। ২০২৬ সালের এই বইমেলায় পা রাখতেই অনুভব করলাম—আমি যেন কেবল একজন পাঠক নই, আমি এক অদম্য অনুসন্ধানী, যে শব্দের ভেতর দিয়ে নিজেরই অনাবিষ্কৃত ভূগোল খুঁজে ফিরছে।

প্রথম প্রাপ্তি—মানুষ। অজস্র মুখ, অজস্র উচ্চারণ, অজস্র দৃষ্টির দীপ্তি। তরুণ কবির কণ্ঠে স্বপ্নের কম্পন, প্রবীণ সাহিত্যিকের চোখে অভিজ্ঞতার গাম্ভীর্য, আর বই হাতে কিশোরীর উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এক বহুস্বরিক মানবসঙ্গীত। এখানে এসে বুঝেছি, সাহিত্য নিছক ব্যক্তিগত সাধনা নয়; এটি সমষ্টিগত চেতনার দীপাবলি। নতুন লেখকদের স্টলে দাঁড়িয়ে যখন তাঁদের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে নিজের বইয়ের কথা বলতে শুনেছি, তখন উপলব্ধি করেছি—সাহিত্য এখনো বেঁচে আছে, প্রতিকূলতার মাঝেও।

দ্বিতীয় প্রাপ্তি—বইয়ের গন্ধে মিশে থাকা অমোঘ সম্ভাবনা। নতুন মুদ্রণের তাজা কালি, কাগজের কোমল স্পর্শ—এ যেন ভবিষ্যতের প্রতি এক নীরব অঙ্গীকার। নানা ঘরানার বই, ইতিহাস থেকে কাব্য, উপন্যাস থেকে দর্শন—সবই সেখানে। কিছু বই আমাকে আলোড়িত করেছে, কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, কিছু আবার অন্তর্গত শূন্যতাকে স্পর্শ করে গেছে। বিশেষ করে নবীনদের সৃষ্টিতে যে নির্ভীক উচ্চারণ দেখেছি, তা আমাকে আশ্বস্ত করেছে—সাহিত্য এখনো প্রশ্ন করতে জানে, প্রতিবাদে দীপ্ত হতে জানে।

কিন্তু এই উজ্জ্বলতার অন্তরালে ছিল কিছু অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। বইমেলা কি কেবলই বাণিজ্যের বিশাল মঞ্চে পরিণত হচ্ছে? বড় বড় প্রকাশনা সংস্থার চাকচিক্য, চমকপ্রদ প্রচারণা আর বিপুল বিক্রির কোলাহলে অনেক সময় ক্ষুদ্র প্রকাশকের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যেতে দেখেছি। নতুন লেখকের বই পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগেই আলোহীন কোণে নিঃশব্দে পড়ে থাকে। সাহিত্যের গুণগত মানের চেয়ে কখনো কখনো প্রচারের ঝলকানিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—এ এক বেদনাময় বাস্তবতা।

পাঠক হিসেবে আমার আরেকটি না-পাওয়া—সংলাপের অভাব। আমি চেয়েছিলাম লেখক-পাঠকের গভীর মেলবন্ধন, মতবিনিময়ের অন্তরঙ্গ পরিসর। কিন্তু ভিড়ের অস্থিরতায় সেই শান্ত সংলাপ অনেক সময় অধরাই থেকে গেল। স্বাক্ষর নেওয়ার ক্ষণস্থায়ী উন্মাদনা আছে, কিন্তু ভাবের আদানপ্রদানের ধীরতা নেই। বইমেলা যদি জ্ঞানের মহোৎসব হয়, তবে সেখানে চিন্তার অবকাশও তো প্রয়োজন।

আরো এক হতাশা—বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি। অনেক বইয়ে নতুনত্বের বদলে পুরোনো বয়ানের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখেছি। সাহিত্যে পরীক্ষানিরীক্ষার সাহস কিছুটা অনুপস্থিত বলেই মনে হয়েছে। যেখানে সময়ের প্রশ্ন জ্বলছে, সেখানে কিছু লেখনী নীরব; যেখানে সমাজের সংকট তীব্র, সেখানে কিছু পৃষ্ঠা অদ্ভুত নির্লিপ্ত।

তবু সব অপূর্ণতার মধ্যেও আমি আশাবাদী। কারণ বইমেলা কেবল প্রাপ্তি বা না-পাওয়ার হিসাব নয়; এটি এক চলমান প্রক্রিয়া। এখানে প্রতিবারই আমরা কিছু পাই, কিছু হারাই, কিছু শিখি। ২০২৬ সালের বইমেলা আমাকে শিখিয়েছে—সাহিত্যকে ভালোবাসতে হলে তার সাফল্যের পাশাপাশি তার সীমাবদ্ধতাকেও স্বীকার করতে হয়।

আমি পেয়েছি অনুপ্রেরণা, পেয়েছি মানুষের মুখ, পেয়েছি নতুন কণ্ঠের সাহসী উচ্চারণ। আর যা পাইনি—তা আমাকে ভাবিয়েছে, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, পরবর্তী মেলার জন্য প্রত্যাশার নতুন তালিকা তৈরি করতে বাধ্য করেছে।

অতএব, বইমেলা–২০২৬ আমার কাছে এক দ্বৈত অভিজ্ঞতা—আলোক ও আঁধারের সহাবস্থান। প্রাপ্তির দীপশিখা যেমন জ্বলেছে অন্তরে, তেমনি অপূর্ণতার ছায়াও দীর্ঘ হয়েছে প্রান্তরে। কিন্তু এই আলো-আঁধারের দ্বন্দ্বই তো সাহিত্যকে জীবন্ত রাখে, আর আমাদের বারবার টেনে নিয়ে যায় অক্ষরের সেই অনির্বাণ অগ্নিশিখার দিকে।

1 টি মন্তব্য:

নামহীন বলেছেন...

অসাধারণ উপস্থাপনা!

জনপ্রিয় পোস্ট