গল্পধারা বুধবার 🔰
বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত -
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন
সম্পাদক - আকাশ আহমেদ
প্রকাশঃ ০৩ জুন ২০২৬ (বুধবার)
প্রচ্ছদ ডিজাইনঃ সর্বানী দাশ
------------------------------------------------------------------------------------
ধারাবাহিক গল্প:
রহস্যময় গল্প
লেখক : তামিম আদনান
পর্ব – ২
( অন্ধকারের ভেতরের মানুষগুলো )
কালো দরজাটা ধীরে ধীরে খুলছিল।
ক্যাঁচ… ক্যাঁচ…
শব্দটা যেন পুরো জমিদারবাড়ির দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছিল। আরিব অনুভব করল, তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে গেছে। সামনে যে অন্ধকার দাঁড়িয়ে আছে, সেটা সাধারণ কোনো অন্ধকার নয়। যেন বহু শতাব্দীর জমে থাকা ভয় সেখানে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
দরজার ওপাশে অসংখ্য চোখ জ্বলছে।
লাল… নীল… ধূসর…
মানুষের চোখের মতো, অথচ মানুষের নয়।
বৃদ্ধ দারোয়ান কাঁপা গলায় বলল—
— “পিছিয়ে যাও… ওদের দিকে তাকিয়ো না!”
কিন্তু আরিব তাকিয়েই রইল।
হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা হাত বের হয়ে এলো।
হাতটা মানুষের, কিন্তু অস্বাভাবিক লম্বা। চামড়া পচে কালো হয়ে গেছে। আঙুলগুলো সরু আর ধারালো।
আরিব পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার পা যেন জমে গেছে।
তারপর সে শুনতে পেল—
— “আরিব…”
অন্ধকার তাকে নাম ধরে ডাকছে।
তার শরীরের রক্ত যেন বরফ হয়ে গেল।
— “কে?”
দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “তুমি ফিরে এসেছ…”
কণ্ঠটা এবার পরিষ্কার। আরিব নিশ্চিত—সে এই কণ্ঠ আগে কোথাও শুনেছে।
হঠাৎ তার মাথার ভেতর ঝড়ের মতো কিছু স্মৃতি ভেসে উঠল।
একটা ছোট্ট ছেলে…
বৃষ্টিভেজা রাত…
কারো চিৎকার…
আর সেই কালো দরজা।
সে দু’হাতে মাথা চেপে ধরল।
— “না… না… এটা অসম্ভব…”
বৃদ্ধ দারোয়ান আতঙ্কে বলল—
— “ওরা তোমার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে! চোখ বন্ধ করো!”
ঠিক তখনই কালো ধোঁয়ার মতো কিছু দরজার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে পুরো করিডোর ঢেকে ফেলল।
বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
দেয়ালের ছবিগুলো কাঁপতে লাগল।
আরিব দেখতে পেল—ছবির ভেতরের মানুষগুলো নড়ছে।
তারা ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাচ্ছে।
একজন নারী ছবির ভেতর থেকে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল—
— “বাঁচাও…”
আরেকজন হঠাৎ ছবির কাঁচে জোরে আঘাত করল।
ধাম!
কাঁচ ভেঙে গেল।
রক্তমাখা একটা হাত ছবির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।
আরিব আতঙ্কে পেছনে হোঁচট খেল।
বৃদ্ধ চিৎকার করে উঠল—
— “দৌড়াও!”
দু’জনে দৌড়ে করিডোর পার হতে লাগল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—করিডোরটা যেন লম্বা হতে লাগল। যতই তারা দৌড়াচ্ছে, সিঁড়ি কাছে আসছে না।
পেছন থেকে অসংখ্য পায়ের শব্দ।
ধুপ… ধুপ… ধুপ…
মনে হচ্ছিল শত শত মানুষ একসঙ্গে হাঁটছে।
আর তাদের ফিসফিসানি—
— “ফিরে এসো…”
— “দরজাটা খুলে দাও…”
— “তুমি আমাদেরই একজন…”
হঠাৎ সবকিছু থেমে গেল।
আরিব বুঝতে পারল সে জমিদারবাড়িতে নেই।
সে দাঁড়িয়ে আছে এক অচেনা জায়গায়।
চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা।
মাটিতে পানি জমে আছে।
দূরে একটা পুরোনো রেললাইন।
আকাশে চাঁদ নেই।
শুধু অদ্ভুত লাল আলো।
— “আমি এখানে কীভাবে এলাম?”
তার পাশে বৃদ্ধ দারোয়ানও দাঁড়িয়ে।
বৃদ্ধের মুখ ফ্যাকাসে।
— “ওরা আমাদের ভেতরে টেনে এনেছে…”
— “কোথায়?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলল—
— “মধ্যরাত্রির স্তরে।”
— “মানে?”
— “দুই জগতের মাঝখানে একটা জায়গা। এখানে যারা আসে, তারা খুব কমই ফিরে যেতে পারে।”
ঠিক তখন দূরে একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
কিন্তু রেললাইনে কোনো ট্রেন নেই।
শুধু কুয়াশার ভেতর অদ্ভুত ছায়াগুলো হাঁটছে।
আরিব ভালো করে তাকিয়ে দেখল—
ওরা মানুষ।
কিন্তু সবার মুখ নেই।
শুধু কালো ফাঁকা জায়গা।
তারা ধীরে ধীরে হাঁটছে।
একই দিকে।
যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের ডাকছে।
হঠাৎ একজন থেমে গেল।
ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে আরিবের দিকে তাকাল।
তার মুখের জায়গায় অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর দুটি চোখ জ্বলছে।
তারপর সে বলল—
— “তুমি দেরি করে ফেলেছ…”
হঠাৎ চারপাশ কেঁপে উঠল।
মাটির নিচ থেকে যেন কেউ ধাক্কা দিচ্ছে।
বৃদ্ধ আতঙ্কে বলল—
— “ওরা জেগে উঠছে!”
— “কারা?”
বৃদ্ধ উত্তর দিল না।
ঠিক তখন কুয়াশার ভেতর থেকে একটা মেয়ে বেরিয়ে এলো।
বয়স কুড়ি-একুশ।
সাদা পোশাক।
চুল ভেজা।
তার চোখে ভয়।
— “আপনি এখানে কেন এসেছেন?”
আরিব অবাক হলো।
— “তুমি কে?”
— “আমার নাম মেহরিন।”
— “তুমি মানুষ?”
মেয়েটি তিক্ত হেসে বলল—
— “এই জায়গায় কেউ পুরোপুরি মানুষ না।”
বৃদ্ধ হঠাৎ পিছিয়ে গেল।
— “না… এটা হতে পারে না…”
— “আপনি ওকে চেনেন?”
বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে বলল—
— “এই মেয়েটা… বিশ বছর আগে মারা গেছে।”
আরিবের বুক ধক করে উঠল।
মেহরিন শান্ত গলায় বলল—
— “মৃতরা সবসময় মরে না।”
মেহরিন তাদের একটা ভাঙা স্টেশনের দিকে নিয়ে গেল।
স্টেশনের নামফলকে লেখা—
“মরিচাপুর মধ্যরাত্রি স্টেশন”
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—এই নামে কোনো স্টেশন বাংলাদেশে নেই।
স্টেশনের ঘড়িতে সময় আটকে আছে—৩:০৩।
মেহরিন ধীরে বলল—
— “প্রতি রাত তিনটা তিন মিনিটে দরজাটা খোলে।”
— “কেন?”
— “কারণ সেই সময়টাই ছিল অভিশাপের শুরু।”
আরিব জিজ্ঞেস করল—
— “কী হয়েছিল সেদিন?”
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
— “জমিদার রাশেদ চৌধুরী অমর হতে চেয়েছিল।”
বাতাস হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
— “সে এক কালো সাধকের কাছে যায়। সেই সাধক তাকে বলে—একটা দরজা আছে, যেটা জীবিত আর মৃতদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। যদি দরজাটা খোলা যায়, তবে মৃত্যু আর তাকে ছুঁতে পারবে না।”
— “তারপর?”
— “এক রাতে তারা দরজা খুলেছিল।”
দূরে কোথাও শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
মেহরিন থেমে গেল।
তার চোখ ভয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
— “ওরা আসছে…”
ঠিক তখন কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে কিছু মানুষ বেরিয়ে এলো।
না… মানুষ না।
তাদের শরীর মানুষের মতো, কিন্তু মুখগুলো গলে গেছে। কারো চোখ নেই। কারো মুখ ছেঁড়া। কারো বুক ফাঁকা।
তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলল—
— “হারিয়ে যাওয়া মানুষ…”
একটা বিকৃত মুখওয়ালা লোক সামনে এসে দাঁড়াল।
তার গলা থেকে গরগর শব্দ বের হচ্ছে।
সে আরিবের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “তুমি দরজা খুলেছিলে…”
— “আমি?”
— “তুমি ভুলে গেছ…”
আরিব চিৎকার করে উঠল—
— “আমি কখনো এখানে আসিনি!”
হঠাৎ তার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো।
তার চোখের সামনে স্মৃতি ভেসে উঠল।
সে দেখল—
একটি ছোট ছেলে জমিদারবাড়ির করিডোরে দাঁড়িয়ে।
তার সামনে কালো দরজা।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে একজন নারী কাঁদছে।
আর সেই ছেলেটা…
সে নিজেই।
আরিব হাঁপাতে লাগল।
— “না… এটা মিথ্যে…”
মেহরিন তার হাত ধরল।
— “তোমাকে সত্যিটা মনে করতে হবে।”
হঠাৎ স্টেশনের ওপরে থাকা লাইটগুলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল।
লাল আলো।
তারপর একটা ট্রেনের শব্দ শোনা গেল।
গর্জন করতে করতে কুয়াশা ভেদ করে একটা কালো ট্রেন এগিয়ে আসছে।
ট্রেনটার জানালায় অসংখ্য মুখ।
সবাই চিৎকার করছে।
কিন্তু কোনো শব্দ নেই।
শুধু নিঃশব্দ আতঙ্ক।
ট্রেনটা স্টেশনে থামতেই দরজাগুলো ধীরে ধীরে খুলল।
ভেতর থেকে ঠাণ্ডা বাতাস বেরিয়ে এলো।
মেহরিন আতঙ্কে বলল—
— “ওরা যাত্রী খুঁজছে!”
— “মানে?”
— “প্রতি রাতে ট্রেনটা নতুন আত্মা নিয়ে যায়।”
ঠিক তখন ট্রেনের ভেতর থেকে একটা লম্বা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এলো।
কালো কোট।
মাথায় টুপি।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
তার হাতে একটা পুরোনো ঘড়ি।
টিক… টিক… টিক…
সে ধীরে ধীরে বলল—
— “সময় শেষ…”
বৃদ্ধ দারোয়ান কাঁপতে লাগল।
— “টিকিট কালেক্টর…”
ছায়ামূর্তিটা আরিবের সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর পকেট থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করল।
সেখানে লেখা—
“আরিব চৌধুরী
যাত্রার সময় : ৩:০৩”
আরিব স্তব্ধ।
— “এটা কী?”
ছায়ামূর্তিটি ধীরে মাথা তুলল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে দুটো আগুনের মতো চোখ জ্বলে উঠল।
— “তুমি অনেক বছর আগে মারা গেছ।”
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আরিব অনুভব করল, তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে।
— “না… এটা অসম্ভব…”
ঠিক তখন তার পেছনে কেউ ফিসফিস করে বলল—
— “সত্যি সবসময় অসম্ভবের মতো শোনায়…”
সে ঘুরে দাঁড়াল।
দেখল—
তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন আরিব।
একই মুখ।
একই চোখ।
কিন্তু ঠোঁটে ভয়ংকর হাসি।
চলবে…
-----------------------------------------------------------------
----------------------------------------
------------------------
তামিম আদনান
🔹 বয়সঃ ৪৫
🔹 জেলা / বর্তমান ঠিকানাঃ আহাদিপুর, কলাতিয়া,
কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১৩।
🔹 মোবাইল নম্বরঃ ০১৮৩১৬৮১৫৯৯
🔹 ইমেইলঃ adnansir599@gmail.com
🔹 তামিম আদনান, জন্ম ৩০/১২/৮০ পুরান ঢাকার ভাগালপুর এলাকায়। যদিও শৈশব, কৌশোর,যৌবন পড়াশুনা, বিয়ে সবকিছু পার হয়েছে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায়। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত নূর মোহাম্মদ মডেল স্কুল, কলাতিয়া, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।


1 টি মন্তব্য:
শিহরণ জাগানো গল্প 🥰
পাঠে আনন্দ অনুভূতি প্ৰিয় গল্পকার 🙏🏻
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন