ধুলোমাখা সম্মান
লেখক- সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ
আজ ২৬শে জানুয়ারী। দিনটা অন্য দিনগুলোর থেকে আলাদা। কুয়াশার চাদর সরিয়ে সিঁদুরের টিপের মতো লাল সূর্যটা উঁকি দিচ্ছে আকাশে।সারা শহর সেজেছে গেরুয়া, সাদা আর সবুজের সমারোহে। মাইকে দেশের গান বাজছে। বড় বড় প্রাসাদের মাথায় উড়ছে জাতীয় পতাকা।
ফুটপাথের একপাশে দাঁড়িয়েছিল অয়ন। কোঁকড়া চুলের মিষ্টি চেহারার বছর দশেকের অয়নের হাতে একগুচ্ছ প্লাস্টিকের পতাকা। উদ্দেশ্য ছিল সবকটি পতাকা বিক্রি করা। সেই পয়সা দিয়ে সে তার মায়ের ওষুধ কিনবে।
সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পতাকা বিক্রি করতে করতে তার হঠাৎ নজরে পড়ল-ডাস্টবিনে পড়ে আছে একটা মলিন, ছেঁড়া জাতীয়পতাকা।
হঠাৎ তার মনে পড়ল বিদ্যালয়ে শিক্ষকমশাই বলেছিলেন-"পতাকা শুধু কাপড় নয়, এটি দেশের সম্মান। "ডাস্টবিনের দিকে এগিয়ে গেল সে।নিজের জল খাওয়ার বোতলের জল দিয়ে পতাকাটি ধুয়ে ফেলে তার ঝুড়িতে তুলে রাখল।
সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অবনীবাবু বিষয়টি লক্ষ্য করলেন। তিনি অয়নের কাছে গিয়ে তার সবকটি পতাকা কিনে নিতে চাইলেন। অয়ন মাস্টারমশাইকে পতাকাগুলো বেচে দিলেন। শুধু ছেঁড়া পরিস্কার করা পতাকাটা বাদে।
অবনীবাবু বললেন-"ঐ পতাকাটা দিলি না?"
অয়ন বলল, "না দাদু,ওটা ছেঁড়া। বিক্রির জন্য নয়।এটা আমি ঠিক করে আবার উড়াবো।"
তোকে দেখে আবার আমি নতুন করে দেশভক্তি শিখলাম।
না দাদু,দেশভক্তি জানিনা। তবু শিখেছি- এটার অসম্মান মানে দেশের অসম্মান।
পকেট থেকে অবনীবাবু অয়নের হাতে একটা একশো টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন-"ওই পুরনো ছেঁড়া পতাকাটাই আজ আমার কাছে সবচেয়ে দামি। ওটা আমায় দে।"
অবাক চোখে তাকিয়ে রইল অয়ন। সকালের কনকনে ঠাণ্ডাটা একনিমেষে ওধাও হয়ে গেছে।একটা অদ্ভূত উষ্ণতা তার সারা শরীরে।
অবনীবাবু অয়নকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন একটা বড় মাঠে। সেখানে তিনি প্রতিবছর এই দিনে পতাকা তোলেন। বড় প্যাণ্ডেল হয়েছে। চারদিক তেরঙা কাপড়ে মোড়া মাইকে বেজে চলেছে-"বন্দেমাতরম, সুজলাং, সুফলাং...।"
মাস্টারমশাই মঞ্চে উঠে মাইক ধরলেন। গুঞ্জন থেমে গেল। তিনি আবেগমথিত গলায় বলতে লাগলেন-"আজ আমার দেশকে ভালোবাসার দিন।দেশকে রক্ষার জন্য শপথের দিন...।"
অয়নকে কাছে ডাকলেন। কাঁপতে কাঁপতে অয়ন মঞ্চে উঠলো। মাষ্টারমশাই সবার সামনে অয়নের দেশভক্তির গল্পটা শোনালেন। সবার চোখে এক অদ্ভূত শ্রদ্ধা। অবনীবাবু অয়নকে কাছে ডেকে বললেন-"টান দে দাদুভাই,আজ ভারতের আত্মা তোর হাতেই জেগে উঠুক।"
এই বয়সে প্রথম পতাকা তুললো অয়ন। প্রথম স্যালুট। অনুভব করলো-মায়ের ওষুধের টাকা রোজগার নয়, সে এমন সম্মান পেয়েছে তা সে কল্পনাও করতে পারেনি।
এবার ফেরার পালা। অয়ন মাষ্টারমশাইয়ের চরণ ছুঁয়ে বলল-"পরের বছর আমি আর পতাকা বেচবো না। আমি স্কুলে যাবো। বড় হয়ে ঐ পতাকার মতো আকাশ ছোঁব।"
1 টি মন্তব্য:
বাহহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন