রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

পতাকার আবেদন (গল্প) লেখক- বিমলশঙ্কর (ভৃগু)

পতাকার আবেদন (গল্প)
লেখক- বিমলশঙ্কর (ভৃগু)

২৬ শে জানুয়ারি আমাদের প্রজাতন্ত্র দিবস । খুব ভোর রাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, সকালে বৃষ্টি নেই কিন্তু ঠান্ডা হওয়ায় ঠান্ডা ঠান্ড আমেজে ঘুমটা ভাঙলো চারিদিকে দেশাত্মবোধক গান, দেশাত্মবোধক ভাষণ, পতাকা উত্তোলন, "বন্দেমাতরম" আর ডিজের কান ফাটানি হিন্দি গানের আওয়াজে আটায় উঠেও কান চাপা দিয়ে শুয়ে রইলাম কিন্তু দিলে কি হবে বুকের ভিতর ধপ ধপ শুরু হতেই ধড়ফড় করে উঠে বসলাম, জোড়ে চিৎকার করে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে বললাম "চা" দাও, কি জানি কি মনে করে সকালের চা দিয়ে গেলো গিন্নীকে বললাম বাজারের থলেটা দিও।

সকালের জলখাবার খেয়ে একটু বেলাতেই বেড়লাম বাজারের উদ্দেশ্যে, যেতে যেতে ভিজে রাস্তায় কোথাও কোথাও অল্প জল জমে আছে সেগুলো ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে চলতে চলতে একজায়গায় এসে পা'টা তুলেও আটকে গেলো, সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে এসে দাঁড়াই দেখি ঠিক পায়ের তলায় একটা কাক ভেজা কাগজের বাচ্চা জাতীয় পতাকা, তার উপর দিয়ে দু'চাকা থেঁতলে দিয়েছে, বেশ কিছু পায়ের চাপে ক্ষত বিক্ষত হয়ে আছে, মাথার উপর লম্বা দড়ি বাঁধা ভিজে যাওয়া পতাকার সারি কোনটা কোনটা ঝুলে আছে ‌পড়বো পড়বো করছে দেখলাম, ভাবছি "এভাবে জাতীয় পাতাকা নিয়ে কেনো ছেলে খেলা, পায়ের তলায় আমাদের "জাতীয় পতাকা, স্বাধীনতার ফল"! 

আমি পথের সেই কাক ভেজা পতাকাটা আস্তে আস্তে তুললাম যাতে ছিঁড়ে না যায়, দু'হাতে আলতো করে সামনের শান বাঁধানো বকুল গাছের বেদীতে শুইয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, মনে একটা প্রশ্ন, এই কি আমাদের স্বাধীনতার ফল ? কতো তাজা রক্ত ঝড়িয়ে.....কতো সিঁথির সিঁদুর মুছিয়ে.....কতো মায়ের কোল খালি করে...…কতো তাজা প্রাণের আত্মবলিদানে অর্জিত বহু আকাঙ্খিত আমাদের স্বাধীনতা ! 

আজ মানুষের পায়ের তলায় ! তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম । রাস্তার মোড়ে স্কুলের বাচ্চাদের লাইন, সেখানে ২৬ জানুয়ারির পতাকা উত্তোলন হচ্ছে, সেখানে গিয়ে এক স্কুলের আন্টিকে বললাম, "একটু শুনবেন, কথা ছিলো....." আন্টি এগিয়ে আসতে আমি বললাম, "এইভাবে আপনারা যে দড়ি দিয়ে ছোট ছোট জাতীয় পতাকা টাঙিয়েছেন তার থেকে পতাকাগুলো জলে ভিজে মাটিতে পড়ে আছে, কতো লোক বাইকের চাপে পায়ের চাপে থেঁতলে গেছে, সেটাকি দেখেছেন......
আরো কিছু বলতে চাইতে উনি বললেন, "আপনি বরং হেড দি কে বলুন" বলে উনি হেড দিদিমনিকে ডেকে বললেন, "উনি কিছু বলতে চাইছেন.....
হেডে দিদি বললেন, "বলুন...

আমি বলতে শুরু করলাম, "আজ প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে এই যে লম্বা দড়িতে কাগজের পতাকা টাঙিয়েছেন ভোরের বৃষ্টিতে সেগুলো খুলে মাটিতে পড়ছে তার উপর দিয়ে কতো বাইক কতো মানুষ পাড়িয়ে যাচ্ছে এতে জাতীয় পতাকার অপমান হচ্ছে না ! কতো রক্ত ঝড়িয়ে, কতো মায়ের চোখের জল ঝড়িয়ে, কতো সিঁদুর মুছিয়ে বহু আকাঙ্খিত স্বাধীনতা, এই আমাদের জাতীয় পতাকা জলে ভিজে আজ মানুষের পায়ের তলায়, সেই পতাকার এভাবে অসম্মান কি ঠিক ? সব শোনার পর উনি আমার হাত দুটো ধরে বললেন, "আপনি যথার্থ বলেছেন ......

আমি আরো বললাম, পতাকা একটাই থাক, যদি সাজাতে হয় তবে রঙিন কাগজে পতাকা বানিয়ে সাজান এতে দোষের নয় শুধু কাগজের পতাকা কেনো, উনি বললেন, "আমারা দেখছি ব্যাপারটা, যদি দয়া করে এ সম্পর্কে বাচ্চাদের সামনে কিছু বলেন খুব ভালো হয়, বলে আমাকে মাইকটা দিলেন।

আমি নির্ভিক ভাবে বলতে শুরু করলাম - 
দেশাত্মবোধক গান গান, দেশাত্মবোধক ভাষণ, পতাকা উত্তোলন করে প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে বন্দমাতরম ধ্বনি দিলেই সব শেষ, তাতো নয়, এই কি আমাদের শিক্ষা, যে শিক্ষা আমাদের জাতীয়তা বোধ শেখায় না, দেশাত্মবোধ শেখায় না, মননে মেধায় স্বাধীনতার চেতনা জাগায় না। 

সেই শিক্ষার নীট ফল পায়ের তলায় স্বাধীনতা, আজ এই যে কাগজের ছোট পতাকা জলে ভিজে কতো মানুষের পায়ের তলায় চাপা পড়েছে, বাইকের চাকায় পিষ্ট হয়েচ্ছে, এরপর হয়তো নর্দমায় বা ডাস্টবিনে চলে যাবে এইসব পতাকা, তাতে আমাদের জাতীয় পতাকার অপমান, আমারা নিশ্চয়ই সেটা চাইবো না, দরকার পরলে কগজের জাতীয় পতাকার পরিবর্তে রঙিন কাগজে পতাকা বানিয়ে সাজাতে পারি। 

জাতীয় পতাকা হোক একটাই, যেটা পত পত করে মাথা উঁচু করে উড়বে তবেই আমরা জাতীয় পতাকার সম্মান দিতে পারবো, আশেপাশে সকলের কাছে অনুরোধ এভাবে কাগুজে জাতীয় পতাকা ব্যাবহার না করে রঙিন কাগুজে পতাকা ব্যাবহার করে জাতীয় পতাকার মর্যাদা রাখুন...
"জয় হিন্দ, বন্দেমাতরম"

বলে মাইকটা এক দিদির হাতে দিয়ে আমি বেড়িয়ে পড়লাম গন্তব্য ।

কোন মন্তব্য নেই:

জনপ্রিয় পোস্ট