নেতাজীর প্রাসঙ্গিকতা ও অনুপ্রেরণা (প্রবন্ধ)লেখক- প্রদীপ কুমার চন্দ্র
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে সাধারণত ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অন্যতম জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু এই মূল্যায়নের আরো অগ্রগতি প্রয়োজন। কারণ তিনি শুধু ইতিহাসের নির্দিষ্ট পর্বে সীমাবদ্ধ থাকেন নি। তাঁর দর্শন, চিন্তা, কর্মপন্থা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাপিয়ে তিনি যেন একটি বিকল্প জাতীয় চেতনার রূপকার। আজকের প্রাসঙ্গিকতায় সমাজ-রাষ্ট্র, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংকটময় বাস্তবতায় নতুন করে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
নেতাজীর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল স্বাধীনতার সামগ্রিক ধারণা। তাঁর কাছে স্বাধীনতা কখনোই কেবল ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি নয় । এটি ছিল মানসিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির সমষ্টিগত প্রক্রিয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সমকালীন অনেক নেতার থেকে পৃথক করে।
আজকের বিশ্বায়িত অর্থনীতির যুগে, যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি ও সমাজ নানা ধরনের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আবদ্ধ, সেখানে নেতাজীর স্বাধীনতা-বোধ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
নেতাজীর চিন্তায় জাতীয়তাবাদ ছিল সংকীর্ণ বা বর্জনমূলক নয়। তাঁর জাতীয়তাবাদ ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক।
আজাদ হিন্দ ফৌজে ধর্ম, ভাষা ও অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন অতিক্রম করে যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা ছিল আধুনিক ভারতের সম্ভাব্য রাষ্ট্রচিন্তার এক বাস্তব অনুশীলন।
বর্তমান সময়ে, যখন পরিচয় রাজনীতি সমাজকে খণ্ডিত করছে, তখন নেতাজীর এই জাতীয় ঐক্যের মডেল বিশেষ গবেষণার দাবি রাখে।
শিক্ষা বিষয়ে নেতাজীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কার্যকর ও নৈতিকতাভিত্তিক। তিনি এমন এক শিক্ষার কথা ভেবেছিলেন, যা কেবল দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করবে না, বরং দায়িত্ববান নাগরিক গড়ে তুলবে। আজকের পরীক্ষামুখী ও বাজারনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দর্শন প্রায় অনুপস্থিত। আইসিএস ত্যাগ করার তাঁর সিদ্ধান্ত কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং একটি বিকল্প শিক্ষাদর্শনের ঘোষণা ।যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে জাতীয় দায়িত্ব অগ্রাধিকার পায়।
নেতাজীর অনুপ্রেরণার অন্যতম প্রধান দিক হলো তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের নৈতিক সাহস। তিনি আপসের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর জীবনে বারবার দেখা যায় ,নিরাপত্তা ও সুবিধার পথ পরিত্যাগ করে ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু নৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এই দৃষ্টান্ত আজকের যুবসমাজের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যারা চাকরি, সামাজিক স্থিতি ও আদর্শের দ্বন্দ্বে প্রায়ই বিভ্রান্ত।
দর্শনগতভাবে নেতাজী ছিলেন এক প্র্যাক্টিস-ভিত্তিক চিন্তাবিদ (praxis-oriented thinker)। তিনি কেবল তত্ত্ব নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকেননি; তাঁর চিন্তা কর্মে রূপ নিয়েছে। এই কারণেই তিনি কোনো প্রস্তুত উত্তর দিয়ে যাননি, বরং প্রশ্ন রেখে গেছেন। তাঁর রাজনীতি ছিল প্রশ্নমুখী, আত্মসমালোচনামূলক এবং গতিশীল ,যা আধুনিক গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
সবশেষে বলা যায়, নেতাজীর প্রাসঙ্গিকতা কেবল ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি আজও একটি চলমান বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া। যতদিন সমাজে অন্যায়, বৈষম্য ও ভয়ের রাজনীতি থাকবে, ততদিন নেতাজীর চিন্তা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখাবে?কী ধরনের স্বাধীনতা আমরা ভোগ করছি এবং কী ধরনের স্বাধীনতা আমরা চাই।
নেতাজী তাই শুধু অতীতের বিপ্লবী নন ,তিনি ভবিষ্যতের নৈতিক মানচিত্র হিসেবে যেন চিরভাস্বর।
--------++++++--------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন