শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬

আগুনের আলো (ছোট গল্প) লেখক- তপন বৈদ্য

আগুনের আলো (ছোট গল্প)

লেখক- তপন বৈদ্য

কলেজের পুরোনো গ্রন্থাগারের কোণায় ধুলো-মাখা একটি বই হাতে নিয়ে বসেছিল আর্য। বইটির মলাটে বড় করে লেখা— সুভাষচন্দ্র বসু : জীবন ও আদর্শ। বাইরে তখন জানুয়ারির হালকা রোদ, ভেতরে যেন অন্য এক আগুন জ্বলছিল।

আর্য পড়তে পড়তে দেখল—কটকের এক সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা এক অসাধারণ মানুষ কীভাবে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশের জন্য। আরাম, চাকরি, নিরাপদ ভবিষ্যৎ—সব ত্যাগ করে তিনি বেছে নিয়েছিলেন কঠিন পথ। ব্রিটিশ শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল দৃঢ়, কিন্তু তা শুধু রাগ নয়—ছিল গভীর আত্মমর্যাদা ও জাতির প্রতি ভালোবাসা।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে আর্যের চোখে ভেসে উঠল স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলি। মিছিল, কারাবরণ, নির্বাসন—সবকিছুর মধ্যেও দেশপ্রেমের আলো নিভে যায়নি। নেতাজির কণ্ঠে তোমরা আমাকে রক্ত দাও… ডাকটি শুধু স্লোগান ছিল না, ছিল আত্মবলিদানের আহ্বান। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের মতো সাধারণ মানুষরাও বুঝে গিয়েছিল—স্বাধীনতা ভিক্ষায় নয়, সংগ্রামে অর্জিত হয়।

আর্য থামল এক জায়গায়। সেখানে লেখা বিপ্লব মানে ধ্বংস নয়, আত্মসম্মানের পুনর্জাগরণ। এই লাইনটি যেন তার ভেতরে কিছু নাড়া দিল। বিপ্লবী চেতনা মানে অস্ত্র তোলা নয়, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করা। নিজের পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি—সব কিছুর মর্যাদা রক্ষা করা। নেতাজির জীবন শেখায়, আত্মমর্যাদা ছাড়া কোনো জাতি সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারে না।

বই বন্ধ করে আর্য জানালার দিকে তাকাল। আজ দেশ স্বাধীন, তবু দুর্নীতি, বিভাজন, উদাসীনতা—সবই আছে। তখনই সে বুঝল নেতাজির প্রাসঙ্গিকতা। তিনি শুধু ইতিহাসের পাতায় বন্দি নন; তিনি আজও প্রেরণা। দেশকে ভালোবাসা মানে শুধু পতাকা ওড়ানো নয়—সৎ থাকা, দায়িত্ব নেওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

গ্রন্থাগার থেকে বেরিয়ে আর্য মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—সে তার নিজের জায়গা থেকে দেশকে কিছু দেবে। হয়তো বড় কিছু নয়, কিন্তু সৎ পরিশ্রম, সচেতনতা আর সাহস—এই তিনটি দিয়েই শুরু করবে।

পেছনে তাকিয়ে সে যেন শুনতে পেল এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর—

স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে প্রতিদিন লড়তে হয়।

আর্য হাঁটতে হাঁটতে হাসল। আগুন জ্বলে উঠেছে—নেতাজির আদর্শের আগুন, যা আজও পথ দেখায়।

কোন মন্তব্য নেই:

জনপ্রিয় পোস্ট