নদী তরঙ্গে ভাষার গান
লেখিকা- সর্বানী দাস
কুলকুল করে বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী নদী, হারুণ মাঝি জলে হাত দিলেই, নদী এসে আদর মেখে যেত। হারুণ মাঝির সঙ্গে নদীর অদ্ভুত সখ্যতা।
মাঝি বলতো যে ভাষায় কথা, নদী ও সেই ভাষায় মাঝিকে উত্তর দিত। যখন মাঝনদীর বুকে ঝড় উঠতো, নদী বারংবার আঘাত করে মাঝিকে ফিরে যেতে বলতো তীরে।
সে ভাষা বোঝা কি আমার-তোমার কম্য...
এইতো কিছু বছর আগে, এক বিশাল ঝড় এলো, ঘরের চাল গেল উড়ে। গাছগুলো দুমড়ে-মুচড়ে কেঁদে উঠলো। রফিক চাচার ধান গাছ গুলো মাটির বুকে নুইয়ে পড়েছিল, এই ঝড় আসার আগেই নাকি হারুণ মাঝি গাঁয়ে বলেছিল, নদী তাকে জানিয়েছে, জলে বিপদের আশঙ্কা আছে।
গাঁয়ের মোড়লসহ সবাই খুব হেসে উঠেছিল। মুখ্যু সুখ্যু মানুষ বড় লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু সে কাউকে বোঝাতে পারেনি, নদী ও কথা বলে, আর সে সত্যি কথা বলছে।
নদী তাকে নৌকা ভরে ভরে মাছ দিত। যেদিকে মাছ থাকতো সেদিকে নিয়ে যেত। সে একমাত্র হারুণ মাঝিই জানে। নদী তো তার মা। কতবার কত বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। মুষলধারে বৃষ্টিতে হারুণ মাঝির ভয় করেনি। যখন জল ফুলে ফেঁপে ফোঁসফোস করছিল, তখনো হারুন মাঝির মনে বিশ্বাস ছিল, ক্ষতি করবে না তার নদী মা।
কেউ কোনদিন নদী তরঙ্গের কান্না শোনেনি। কেবলমাত্র হারুণ মাঝি শুনতো, হারুণ মাঝি জানতো, হারুণ মাঝি বুঝতো। নদীর বুকে যে যন্ত্রণা জমছে, তার জন্য দায়ী তারই মত কিছু অকৃতজ্ঞ মানুষ।
হারুণের গ্যাঁট ফাঁকা। দাঁড়,পাল আর ছোট্ট ডিঙি ছাড়া, নদী তার একমাত্র সম্বল। বড়লোক শিক্ষিত লোকেরা যত নোংরা আবর্জনা পোঁটলা বেঁধে নদীর বুকে জমা করছে। পলিথিন গুলো না যাচ্ছে মাটিতে মিশে, না হচ্ছে নষ্ট। নদী মায়ের বুকে বড় কষ্ট। ক্রমশু তার গভীরতা কমছে।
একবার নাকি নদী মা হারুণ মাঝি কে বলেছিল, মাছেরা তার কাছে এসে ভীষণ কান্নাকাটি শুরু করেছে। পলিথিনের প্যাকেটের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভাসতে ভাসতে তাদের সন্তানরা পথ হারাচ্ছে। এসব দুঃখের কথা হারুণ মাঝি জানে।
সে গাঁয়ের মোড়ল কে বলেও ছিল, নদী তার কাছে কান্না করেছে। মোড়ল সভায় সবার সামনে ভীষণ ধমক দিয়ে বলেছিল...
"প্রতিবাদ হচ্ছে, জিহ্বার হাড় ভেঙে দেবো"
"বড্ড ভাষা ফুটেছে মুখে"
নদীর ভাষা হারুণ মাঝি বুঝলেও মানুষ বুঝবে কবে ?
1 টি মন্তব্য:
আপ্লুত ও কৃতজ্ঞ 🙏🏻
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন