গল্পধারা বুধবার 🔰
বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত -
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন
সম্পাদক - আকাশ আহমেদ
প্রকাশঃ ২৭শে ই মে ২০২৬ (বুধবার)
প্রচ্ছদ ডিজাইনঃ সর্বানী দাশ
------------------------------------------------------------------------------------
ধারাবাহিক গল্প:
রহস্যময় গল্প
লেখক : তামিম আদনান
পর্ব – ১
( কালো দরজার ওপাশে )
রাত তখন ঠিক বারোটা ছুঁইছুঁই। আকাশজুড়ে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। দূরের বাঁশবাগানের মাথায় ঝুলে থাকা আধখাওয়া চাঁদটাকে দেখে মনে হচ্ছিল কেউ যেন ছুরি দিয়ে তার শরীর কেটে নিয়েছে। বাতাসে শীতের গন্ধ, অথচ ক্যালেন্ডারে তখন ভরা আষাঢ়।
ঢাকার ব্যস্ত জীবন ছেড়ে সাংবাদিক আরিব হঠাৎ করেই চলে এসেছিল “মরিচাপুর” নামের ছোট্ট এক গ্রামে। জায়গাটা মানচিত্রে থাকলেও মানুষের স্মৃতিতে খুব একটা নেই। কারণ এখানে কেউ বেশিদিন থাকতে চায় না।
গ্রামে ঢোকার আগেই বাসের বৃদ্ধ হেলপারটি তাকে বলেছিল—
— “ভাই, রাত হইলে ওই গ্রামের মানুষ জানালা খোলে না।”
আরিব হেসেছিল।
— “চোর-ডাকাতের ভয়?”
বৃদ্ধ লোকটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল।
— “চোর মানুষ হয়। কিন্তু সবকিছু মানুষ না।”
কথাটা শুনে আরিব মুচকি হাসলেও ভেতরে কোথাও একফোঁটা শীতলতা নেমে এসেছিল। সে মূলত এসেছে একটি পুরোনো ঘটনার অনুসন্ধানে। প্রায় বিশ বছর আগে মরিচাপুর জমিদারবাড়িতে একই রাতে পাঁচজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল। কেউ তাদের লাশ খুঁজে পায়নি। পুলিশ কেস বন্ধ করে দেয়। গ্রামের মানুষ ঘটনাটিকে “কালো দরজার রাত” নামে ডাকে।
আরিবের সম্পাদক তাকে স্পষ্ট বলেছিল—
“যদি সত্যিটা বের করতে পারো, এটা হবে বছরের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিবেদন।”
কিন্তু আরিব জানত না, সে কেবল একটি গল্পের পেছনে নয়, বরং এমন এক অন্ধকারের দিকে হাঁটছে—যেখানে মানুষের চেয়ে স্মৃতিরা বেশি জীবিত।
গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। চারপাশে অদ্ভুত নীরবতা। কুকুরের ডাক নেই, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ নেই, এমনকি বাতাসও যেন নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে।
রাস্তার পাশে এক চায়ের দোকান খোলা ছিল। দোকানদার বৃদ্ধ লোকটি আরিবকে দেখেই চমকে উঠল।
— “আপনি বাইরের মানুষ ?”
— “জি। একটা রিপোর্টের কাজে এসেছি।”
— “জমিদারবাড়ির ব্যাপারে?”
আরিব অবাক হলো।
— “আপনি বুঝলেন কীভাবে ?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চায়ের কাপ নামিয়ে বলল—
— “যে বাইরের মানুষ রাতের বেলা মরিচাপুরে আসে, তারা দুই কারণে আসে। কেউ ভুল করে আসে… আর কেউ জমিদারবাড়ির জন্য।”
লোকটার চোখে অদ্ভুত আতঙ্ক ছিল।
— “ওই বাড়িতে কেউ থাকে?”
— “মানুষ না।”
আরিব এবার একটু বিরক্ত হলো।
— “আপনারা সবাই এমন রহস্য করে কথা বলেন কেন?”
বৃদ্ধ কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল—
— “কারণ এই গ্রামে সত্যি কথা জোরে বলতে নেই।”
ঠিক তখনই দোকানের পেছন থেকে একটা বিকট শব্দ এল। যেন কোনো ভারী জিনিস পড়ে গেল। বৃদ্ধ হঠাৎ কেঁপে উঠল।
— “আপনি যান। এখনই যান!”
— “কিন্তু—”
— “আজ রাত ভালো না।”
লোকটার আচরণে অদ্ভুত কিছু ছিল। আরিব আর কথা বাড়াল না। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এগিয়ে গেল গ্রামের একমাত্র অতিথিশালার দিকে।
অতিথিশালাটার নাম “নীলকমল ভিলা”। অথচ পুরো বাড়িটার রঙ ছিল ধূসর। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। বারান্দার বাতিগুলো বারবার জ্বলছে আর নিভছে।
দরজা খুললেন মাঝবয়সী এক মহিলা।
— “রুম লাগবে?”
— “জি।”
মহিলাটি কোনো কথা না বলে তাকে একটি চাবি দিলেন।
— “দ্বিতীয় তলা। কিন্তু একটা কথা…”
— “জি?”
— “রাত তিনটার পর দরজা খুলবেন না।”
আরিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আপনারাও শুরু করলেন?”
মহিলা শান্ত গলায় বললেন—
— “আমি মজা করছি না।”
তার চোখদুটো দেখে মনে হলো তিনি সত্যিই ভয় পাচ্ছেন।
রুমে ঢুকে আরিব জানালা খুলতেই ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে এক অদ্ভুত গন্ধ এলো। যেন পুরোনো ভেজা কাপড় আর পোড়া কাঠের মিশ্রণ।
দূরে অন্ধকারের মধ্যে জমিদারবাড়িটা দেখা যাচ্ছিল। বিশাল কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটার একটি জানালায় ক্ষীণ আলো জ্বলছিল।
আরিব থমকে গেল।
“ওখানে তো কেউ থাকে না!”
সে ক্যামেরা বের করে জুম করল। কিন্তু ঠিক তখনই আলোটা নিভে গেল।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
টক… টক… টক…
আরিব দরজা খুলে দেখল কেউ নেই। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি পুরোনো চিঠি।
চিঠির ওপর কাঁপা হাতে লেখা—
“কালো দরজাটা খুলো না।”
তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে দ্রুত করিডোরে তাকাল। কেউ নেই। শুধু লম্বা অন্ধকার পথ আর দেয়ালের পুরোনো ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
রুমে ফিরে এসে চিঠিটা খুলল।
ভেতরে মাত্র একটি লাইন—
“তারা এখনো বেঁচে আছে।”
রাত বাড়ছিল।
আরিব ঘুমাতে পারছিল না। সাংবাদিক হিসেবে সে বহু ভয়ংকর ঘটনা দেখেছে। কিন্তু আজকের পরিবেশটা অন্যরকম। যেন পুরো গ্রাম কোনো অদৃশ্য আতঙ্কের নিচে চাপা পড়ে আছে।
ঘড়িতে রাত ২:৪৭।
ঠিক তখনই নিচতলা থেকে ভেসে এলো পায়ের শব্দ।
ধুপ… ধুপ… ধুপ…
কেউ যেন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে।
আরিব দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।
শব্দটা থেমে গেল তার দরজার সামনে।
তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
এরপর খুব আস্তে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “দরজা খোলো…”
কণ্ঠটা মানুষের মতো, অথচ পুরোপুরি মানুষ না। যেন অনেকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে কথা বলছে।
আরিব কিছু বলল না।
আবার কণ্ঠটা শোনা গেল—
— “আমরা ফিরে এসেছি…”
তার হাত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু ঢুকতে শুরু করল।
আরিব আতঙ্কে পিছিয়ে গেল।
ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে মানুষের আকার নিতে লাগল।
সে দ্রুত লাইট জ্বালাতে গেল। কিন্তু লাইট জ্বলল না।
পুরো রুম অন্ধকার।
এরপর সে স্পষ্ট শুনতে পেল—
কেউ তার কানের কাছে ফিসফিস করছে—
— “কালো দরজাটা খুলে গেছে…”
ভোর হওয়ার আগেই আরিব অজ্ঞান হয়ে যায়।
সকালবেলা যখন তার ঘুম ভাঙল, তখন সূর্যের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছে। যেন রাতের সেই ভয়াবহতা কখনো ঘটেইনি।
কিন্তু মেঝেতে কালো পোড়া দাগ এখনো রয়েছে।
আরিব নিচে নেমে মহিলাকে জিজ্ঞেস করল—
— “গতরাতে কে আমার দরজায় এসেছিল?”
মহিলা চুপ।
— “আপনি শুনেছেন নিশ্চয়ই!”
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
— “আপনি দরজা খুলেননি, এটাই ভালো হয়েছে।”
— “কেন?”
মহিলার চোখ ভিজে উঠল।
— “তিন বছর আগে আমার ছেলে দরজা খুলেছিল।”
— “তারপর?”
— “সকালে শুধু তার জুতো পাওয়া গিয়েছিল।”
আরিবের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
সেদিন দুপুরে সে জমিদারবাড়ির দিকে রওনা দিল।
গ্রামের মানুষ তাকে থামানোর চেষ্টা করল। কেউ সরাসরি কথা বলছে না, কিন্তু সবার চোখে একই আতঙ্ক।
জমিদারবাড়ির সামনে পৌঁছে সে থমকে দাঁড়াল।
বিশাল লোহার গেট। তার ওপরে মরিচা ধরা অদ্ভুত প্রতীক আঁকা। মনে হচ্ছিল কারো বিকৃত মুখ।
বাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধ। পাখিরাও যেন এড়িয়ে চলে জায়গাটা।
গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে অনুভব করল তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেছে।
চারপাশে ধুলো, ভাঙা দেয়াল, শুকনো গাছ।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—বাড়ির মূল দরজাটা আধখোলা।
যেন কেউ একটু আগেই ভেতরে ঢুকেছে।
ভেতরে ঢুকতেই কড়া গন্ধ নাকে এলো। পুরোনো কাঠ, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর কোনো অচেনা কিছুর গন্ধ।
দেয়ালে ঝুলছে বিশাল সব ছবি। জমিদার পরিবারের সদস্যরা।
কিন্তু একটা ছবির সামনে গিয়ে আরিব থেমে গেল।
ছবিতে পাঁচজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির নিচে লেখা—
“শেষ রাত্রির অতিথিরা, ২০০৬”
এরা সেই পাঁচজন, যারা নিখোঁজ হয়েছিল।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো—
ছবির এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের মুখ ঠিক আরিবের মতো।
একদম হুবহু।
তার বুকের ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।
— “এটা কীভাবে সম্ভব?”
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে শব্দ এলো।
ধুপ…
ধুপ…
ধুপ…
কেউ হাঁটছে।
আরিব ক্যামেরা শক্ত করে ধরল। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
ওপরের করিডোরে পৌঁছে সে দেখল, শেষ প্রান্তে একটা কালো দরজা।
পুরো বাড়ির মধ্যে একমাত্র দরজাটা একদম নতুনের মতো।
কালো রঙ চকচক করছে।
দরজার সামনে মেঝেতে শুকনো রক্তের দাগ।
আর দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে খুব আস্তে ফিসফিস শব্দ—
— “ফিরে এসো…”
আরিবের হাত কাঁপছিল।
হঠাৎ তার পেছনে কারো নিঃশ্বাসের শব্দ।
সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল—
একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।
চোখদুটো সাদা। মুখ শুকনো। হাতে লণ্ঠন।
বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলল—
— “অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
— “আপনি কে?”
— “আমি এই বাড়ির শেষ দারোয়ান।”
— “এই দরজার ওপাশে কী আছে?”
বৃদ্ধের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
— “ওপাশে মানুষ যা হারায়… তা আর ফিরে পায় না।”
— “পাঁচজন মানুষ কোথায় গেল?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে কালো দরজার দিকে তাকাল।
তারপর বলল—
— “ওরা কোথাও যায়নি।”
ঠিক তখনই দরজার নিচ দিয়ে কালো ধোঁয়া বের হতে শুরু করল।
আরিব পেছাতে গেল।
কিন্তু বৃদ্ধ তার হাত শক্ত করে ধরে বলল—
— “আজ রাতেই দরজাটা আবার খুলবে…”
— “মানে?”
বৃদ্ধ আতঙ্কিত চোখে তাকাল—
— “আর এবার ওরা তোমাকে নিতে এসেছে।”
ঠিক তখনই কালো দরজার ভেতর থেকে ভেসে এলো এক বিকট শব্দ।
ধীরে ধীরে দরজাটা নিজে থেকেই খুলতে শুরু করল…
আরিব দেখল—
দরজার ওপাশে কোনো ঘর নেই।
শুধু অসীম অন্ধকার।
আর সেই অন্ধকারের ভেতর শত শত মানুষের চোখ জ্বলছে।
( চলবে…
---------------------------------------------
তামিম আদনান
🔹 বয়সঃ ৪৫
🔹 জেলা / বর্তমান ঠিকানাঃ আহাদিপুর, কলাতিয়া,
কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১৩।
🔹 মোবাইল নম্বরঃ ০১৮৩১৬৮১৫৯৯
🔹 ইমেইলঃ adnansir599@gmail.com
🔹 তামিম আদনান, জন্ম ৩০/১২/৮০ পুরান ঢাকার ভাগালপুর এলাকায়। যদিও শৈশব, কৌশোর,যৌবন পড়াশুনা, বিয়ে সবকিছু পার হয়েছে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায়। বর্তমানে প্রধান শিক্ষক হিসাবে কর্মরত নূর মোহাম্মদ মডেল স্কুল, কলাতিয়া, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।


1 টি মন্তব্য:
রহস্য, ভয় আর টানটান উত্তেজনার মিশেলে গল্পের প্রতিটি দৃশ্য যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
শেষের অন্ধকার আর জ্বলন্ত চোখের বর্ণনা পাঠকের মনে গভীর শিহরণ জাগিয়ে তোলে।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন