শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

প্রত্যাশা আছে, প্রাপ্তি নেই (লেখক: আকাশ আহমেদ)

 


জন্মের ভেতরেই শূন্যতা#

আকাশের জন্ম হয়েছিল এক প্রভাবশালী পরিবারে।

তার দাদু ছিলেন জেলার এক বড় মাপের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে আসত তার কাছে। বাড়ির উঠোনে প্রতিদিন মানুষের ভিড়, সিদ্ধান্ত, প্রভাব, ক্ষমতার গন্ধ।

কিন্তু আকাশের বাবা রাজনীতি করতেন না।

তিনি ছিলেন বড় চাকরিজীবী—নিরিবিলি, ভদ্র, দায়িত্ববান একজন মানুষ।

তিনি চেয়েছিলেন সংসারকে রাজনীতির কোলাহল থেকে আলাদা রাখতে।

কিন্তু নিয়তি সেই সুযোগ দিল না।

আকাশ যখন মাত্র ২১ দিনের শিশু, তখনই তার বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

একটি নবজাতক শিশুর কপালে তখনই লেখা হয়ে গেল—

“অপূর্ণতা”।

দাদু তখনো জীবিত।

বাড়িতে শোক এলো, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যস্ততা থামল না।

মানুষ এলো, সমবেদনা জানাল, চলে গেল।

কিন্তু ২১ দিনের সেই শিশুর বুকের শূন্যতা কেউ দেখতে পেল না।


অবহেলার মধ্যে বড় হওয়া#

ছোট থেকেই আকাশ বুঝতে শিখেছিল—

তার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু তার অনুভূতির গুরুত্ব নেই।

সে পরিবারের একমাত্র ছেলে—

কিন্তু আদরের নয়, প্রত্যাশার।

দাদুর চোখে সে ছিল ভবিষ্যৎ।

আত্মীয়দের চোখে সে ছিল বংশের মান।

সমাজের চোখে সে ছিল পরিচয়।

কিন্তু কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে বলেনি—

“তুই শুধু তুই।”

তার মা ছিলেন নীরব যন্ত্রণা।

স্বামীহারা, দায়িত্বে জর্জরিত, সামাজিক চাপের ভেতরে আটকে থাকা এক নারী।

তিনি ভালোবাসতেন, কিন্তু ভাঙা মানুষ সবসময় প্রকাশ করতে পারে না।

আকাশ ছোট থেকেই শিখল—

কাঁদতে হলে চুপচাপ কাঁদতে হয়।


১৩ বছরের এক নির্বাসন#

বয়স যখন ১৩, তখন তার ভেতরের অন্ধকার অসহনীয় হয়ে উঠল।

প্রভাবশালী বাড়ির দেয়ালগুলো তার কাছে কারাগারের মতো লাগতে শুরু করল।

এক ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই,

সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

কেউ তাকে থামায়নি।

হয়তো ভেবেছিল—ছেলেমানুষি রাগ।

হয়তো কেউ খেয়ালই করেনি।

কিন্তু সে আর ফেরেনি।

স্টেশনের বেঞ্চ, অচেনা শহরের ভিড়, ক্ষুধার রাত—

১৩ বছরের কিশোর খুব দ্রুত বড় হয়ে গেল।

অনেক রাত সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছে—

“আমার নাম আকাশ, কিন্তু আমার জন্য কি কোনো আকাশ খোলা আছে?”


চাওয়ার ভিড়ে একা#

সময় তাকে শক্ত করল।

মানুষ তার কাছে এলো—

কেউ সাহায্য চাইতে,

কেউ পরিচয়ের সুবিধা নিতে,

কেউ তার শ্রম, তার সময়, তার উপস্থিতি ব্যবহার করতে।

সে দিয়েছে।

কারণ সে জানত—

অসহায়ত্ব কাকে বলে।

কিন্তু যখন সে অসহায় হয়েছে,

তখন কেউ ছিল না।

মানুষ বলেছে—

“আকাশ খুব শক্ত।”

আসলে সে শুধু কান্না লুকাতে শিখেছিল।

তার হাসি ছিল প্রশস্ত, আত্মবিশ্বাসী।

কিন্তু সেই হাসির আড়ালে জমে থাকত হাজার না বলা কষ্ট।


দাদুর মৃত্যু ও আরও শূন্যতা#

দাদু বেঁচে থাকতে অন্তত একটি পরিচয়ের ছায়া ছিল।

দাদু চলে যাওয়ার পর সেই ছায়াটুকুও মুছে গেল।

পরিবারে সম্পর্ক বদলালো।

সম্মান বদলালো।

কিন্তু আকাশের অবহেলা বদলালো না।

সে বুঝল—

প্রভাবের সম্পর্ক স্থায়ী নয়।

রক্তের সম্পর্কও সবসময় আশ্রয় দেয় না।


অন্ধকার থেকে আলো#

এই দীর্ঘ অন্ধকার পথেই একদিন তার জীবনে এলো আলো।

একজন মানুষ—

যিনি তাকে ব্যবহার করতে নয়, বুঝতে এসেছিলেন।

তার জীবনসঙ্গী।

প্রথমবার আকাশ অনুভব করল—

কেউ তার চোখের ভাষা পড়ে।

কেউ তার নীরবতা শুনতে পারে।

কেউ তার শক্ত মুখের আড়ালে ক্লান্ত শিশুটাকে দেখতে পায়।

সে অবাক হয়েছিল—

“আমাকে কি সত্যিই কেউ ভালোবাসতে পারে, কোনো শর্ত ছাড়া?”

তার সঙ্গী তাকে আগলে রাখল।

তার ক্ষতগুলো ধীরে ধীরে স্পর্শ করল মমতায়।

তার না বলা কষ্টগুলো শব্দ পেল।

তবু আকাশ পুরোপুরি খুলতে পারেনি।

কারণ ১৩ বছরের যে ছেলেটি একা রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল,

সে এখনো তার ভেতরে বেঁচে আছে।


নিরাপদ উত্তরাধিকার#

আজ আকাশের স্বপ্ন বদলে গেছে।

সে আর নিজের জন্য কিছু চায় না তেমন।

সে চায়—একটি নিরাপদ উত্তরাধিকার।

একটি সন্তান,

যে বাবার হাত ধরে হাঁটবে।

যে কাঁদলে বাবার কাঁধ পাবে।

যে কখনো ১৩ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবে না।

সে চায় তার সন্তান তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসুক—

যেমন ভালোবাসা সে পায়নি।

সে চায় তার সন্তান একদিন বলুক—

“বাবা, তুমি আমার নিরাপত্তা।”

সে চায় তার সন্তান তাকে আগলে রাখুক—

যেমন সে সারাজীবন অন্যদের আগলে রেখেছে।


হাসির আড়ালের মানুষ#

মানুষ আজও তাকে দেখে দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী, সফল।

সভায় সে হাসে।

মানুষের মাঝে সে প্রাণবন্ত।

কেউ বোঝে না—

রাতের নির্জনতায় সে এখনো ভেঙে পড়ে।

তার হাজার না বলা কষ্ট আছে—

বাবার মুখ না চিনতে পারার কষ্ট।

১৩ বছরে বাড়ি ছাড়ার কষ্ট।

অবহেলায় বড় হওয়ার কষ্ট।

ব্যবহৃত হওয়ার কষ্ট।

তবু সে হাসে।

কারণ সে শিখেছে—

কষ্ট প্রকাশ করলে মানুষ দুর্বল ভাবে।

আর সে আর দুর্বল হতে চায় না।


না ফেরা ঘর#

আজও তার বাড়ি ফেরা হয়নি।

বাড়ি আছে,

মানুষ আছে,

স্মৃতি আছে—

কিন্তু “ফেরা” নেই।

ফেরা মানে শুধু ফিরে যাওয়া নয়।

ফেরা মানে নিরাপত্তা।

ফেরা মানে নিঃশর্ত গ্রহণ।

সে এখন নিজের ঘর তৈরি করেছে।

নিজের পরিবার গড়েছে।

নিজের আলো জ্বালিয়েছে।

কিন্তু শৈশবের যে ঘর থেকে সে বেরিয়ে গিয়েছিল—

সেই ঘরে তার আর ফেরা হয়নি।


প্রত্যাশা আছে, প্রাপ্তি নেই—তবু আলো আছে#

আকাশের জীবনে অনেক প্রত্যাশা অপূর্ণ।

সে বাবার হাত পায়নি।

সে অবহেলাহীন শৈশব পায়নি।

সে নিঃশর্ত আগলানো পায়নি।

কিন্তু সে হেরে যায়নি।

কারণ সে অন্ধকারের ভেতর থেকেও আলো খুঁজে পেয়েছে।

সে একজন নিরাপদ জীবনসঙ্গী পেয়েছে।

সে পেয়েছে ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা।

সে পেয়েছে এমন এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন—

যেখানে তার সন্তান কখনো তার মতো একা হবে না।

হাজার না বলা কষ্টের আড়ালেও

সে আজও হাসে।

কারণ সে জানে—

তার কষ্ট তার শক্তি।

তার অন্ধকার তার আলোকে মূল্য দিয়েছে।

প্রত্যাশা আছে—

প্রাপ্তি পুরোপুরি নেই—

তবু তার জীবন অপূর্ণ নয়।

কারণ সে নিজেই নিজের প্রদীপ।

আর যে মানুষ অন্ধকারে নিজে আলো জ্বালাতে পারে,

তার আকাশ কখনো সম্পূর্ণ অন্ধকার থাকে না।


---সমাপ্ত---

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

"বইমেলা নয়কো শুধু উৎসব বা মেলা" (লেখক- মীরা চ্যাটার্জী)

"বইমেলা নয়কো শুধু উৎসব বা মেলা"          লেখক- মীরা চ্যাটার্জী 


বইমেলা নয়কো শুধুই উৎসব বা মেলা। বইমেলা হলো সাহিত্য মনের এক অনুভূতির জায়গা । সকল লেখক লেখিকার ভাবনা জগতের খোলা জায়গা। যে জানালা দিয়ে সাহিত্য প্রভা আলো পায়।

বাস্তব ও কল্পনা মিলে মিশে সৃষ্টি করে অন্তরে এক বিশেষ অনুভূতি। 


লেখক লেখিকার কলমে তা ভাষায় হয় প্রকাশিত। যেগুলো বইয়ের আকারে আমরা বইমেলাতে নুতন সংস্করণ রূপে পেয়ে থাকি। 


প্রতিদিন বইমেলা তে উপচে পরা জন মানবের ভিড়। অথচ বই বিক্রির বাজার ক্রমশ মন্দা। লেখক লেখিকারা উৎসাহ পায়না বই প্রকাশিতে।


মাল্টি মিডিয়ার যুগে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে ব্যস্ত। বই পড়ার ইচ্ছা বা নেশা কোনোটাই তাঁদের নেই। ফলস্বরূপ সাহিত্য জগতে ক্রমশ পড়ছে ভাটা। 


পূর্বে মানুষ সারাবছর লাইব্রেরীর সদস্য হয়ে লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়তো, কারন সব বই তো আর কেনা সম্ভব নয়। পূর্বে অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানেও বই উপহার হিসাবে দেওয়া হোতো। সেসব তো এখন বলা বাহুল্য।


আমি একজন নতুন লেখিকা। একাকিত্বের যন্ত্রনা ভুলতে বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদের হাত ধরে কিছু লেখার চেষ্টা করি মাত্র। জীবনের অতীত ও বর্তমানের অনুভূতি ও চিন্তাশক্তিকে ভাষায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। 


বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ হইতে প্রাপ্ত সনদ আমাকে লেখার প্রেরণা জুগিয়েছে। আমার লেখা কতটা যুক্তিপূর্ণ হচ্ছে তা মাননীয় বিচারক মন্ডলীর বিচারে আমি জানতে বা বুঝতে পারি। তাই বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।


বেশিরভাগ মানুষই বইমেলায় ঘুরতে যায়। বই কিনতে নয়। বই পাগলের সংখ্যা এখন খুবই কম। বই না পড়লে মনের পরিপূর্ণ বিকাশ কখনোই সম্ভব নয়। বই মানবের আত্মশুদ্ধি ঘটায় ও চিন্তাশক্তি বাড়ায়। উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।


তাই সকলে বই কিনুন ও বই পড়ুন এবং বই উপহার দিন। 


বইমেলা ও সাহিত্য জগত কে স্বমহিমায় টিকিয়ে রাখুন। সাহিত্যের অবনতি মানবজাতির লজ্জা ও অবমূল্যায়ন।


ভাষা জগতের ছন্দেই আমি জীবনে আনন্দ উপলব্ধি করি। প্রায় প্রতিদিনই কাজের অবসরে কিছু না কিছু লিখতে চেষ্টা করি। যেদিন সময়ের অভাবে লিখতে না পারি, সেদিন মনের মাঝে কোথাও যেনো এক সুপ্ত ব্যাথা অনুভব করি। আর যেদিন সনদ পাই সেদিন আমি আপ্লুত হই। নিজের সাহিত্য প্রভাকে মেলে ধরার ডানা যেনো বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ।


বই বিক্রির বাজার মন্দা ক্রমশ 

লেখক লেখিকা ভেবে মরে দুঃখে,

তাঁদের লেখা বুঝি প্রাণ পেলোনা 

আপামর দেশবাসীর জনসমক্ষে।

বই মেলা–২০২৬ : প্রাপ্তির দীপশিখা ও অপূর্ণতার ছায়াপথ (লেখক- তামিম আদনান)

বই মেলা–২০২৬ : প্রাপ্তির দীপশিখা ও অপূর্ণতার ছায়াপথ
লেখক- তামিম আদনান

বইমেলা—শব্দটি উচ্চারণ করলেই মনের অন্তঃপুরে এক অদৃশ্য রঙধনু জ্বলে ওঠে। এ যেন কেবল কাগজে মুদ্রিত অক্ষরের সমাবেশ নয়, বরং চিন্তার চন্দ্রযাত্রা, কল্পনার কুম্ভমেলা, আত্মার অনাবিল উত্সব। ২০২৬ সালের এই বইমেলায় পা রাখতেই অনুভব করলাম—আমি যেন কেবল একজন পাঠক নই, আমি এক অদম্য অনুসন্ধানী, যে শব্দের ভেতর দিয়ে নিজেরই অনাবিষ্কৃত ভূগোল খুঁজে ফিরছে।

প্রথম প্রাপ্তি—মানুষ। অজস্র মুখ, অজস্র উচ্চারণ, অজস্র দৃষ্টির দীপ্তি। তরুণ কবির কণ্ঠে স্বপ্নের কম্পন, প্রবীণ সাহিত্যিকের চোখে অভিজ্ঞতার গাম্ভীর্য, আর বই হাতে কিশোরীর উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এক বহুস্বরিক মানবসঙ্গীত। এখানে এসে বুঝেছি, সাহিত্য নিছক ব্যক্তিগত সাধনা নয়; এটি সমষ্টিগত চেতনার দীপাবলি। নতুন লেখকদের স্টলে দাঁড়িয়ে যখন তাঁদের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে নিজের বইয়ের কথা বলতে শুনেছি, তখন উপলব্ধি করেছি—সাহিত্য এখনো বেঁচে আছে, প্রতিকূলতার মাঝেও।

দ্বিতীয় প্রাপ্তি—বইয়ের গন্ধে মিশে থাকা অমোঘ সম্ভাবনা। নতুন মুদ্রণের তাজা কালি, কাগজের কোমল স্পর্শ—এ যেন ভবিষ্যতের প্রতি এক নীরব অঙ্গীকার। নানা ঘরানার বই, ইতিহাস থেকে কাব্য, উপন্যাস থেকে দর্শন—সবই সেখানে। কিছু বই আমাকে আলোড়িত করেছে, কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, কিছু আবার অন্তর্গত শূন্যতাকে স্পর্শ করে গেছে। বিশেষ করে নবীনদের সৃষ্টিতে যে নির্ভীক উচ্চারণ দেখেছি, তা আমাকে আশ্বস্ত করেছে—সাহিত্য এখনো প্রশ্ন করতে জানে, প্রতিবাদে দীপ্ত হতে জানে।

কিন্তু এই উজ্জ্বলতার অন্তরালে ছিল কিছু অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। বইমেলা কি কেবলই বাণিজ্যের বিশাল মঞ্চে পরিণত হচ্ছে? বড় বড় প্রকাশনা সংস্থার চাকচিক্য, চমকপ্রদ প্রচারণা আর বিপুল বিক্রির কোলাহলে অনেক সময় ক্ষুদ্র প্রকাশকের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যেতে দেখেছি। নতুন লেখকের বই পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগেই আলোহীন কোণে নিঃশব্দে পড়ে থাকে। সাহিত্যের গুণগত মানের চেয়ে কখনো কখনো প্রচারের ঝলকানিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—এ এক বেদনাময় বাস্তবতা।

পাঠক হিসেবে আমার আরেকটি না-পাওয়া—সংলাপের অভাব। আমি চেয়েছিলাম লেখক-পাঠকের গভীর মেলবন্ধন, মতবিনিময়ের অন্তরঙ্গ পরিসর। কিন্তু ভিড়ের অস্থিরতায় সেই শান্ত সংলাপ অনেক সময় অধরাই থেকে গেল। স্বাক্ষর নেওয়ার ক্ষণস্থায়ী উন্মাদনা আছে, কিন্তু ভাবের আদানপ্রদানের ধীরতা নেই। বইমেলা যদি জ্ঞানের মহোৎসব হয়, তবে সেখানে চিন্তার অবকাশও তো প্রয়োজন।

আরো এক হতাশা—বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি। অনেক বইয়ে নতুনত্বের বদলে পুরোনো বয়ানের পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখেছি। সাহিত্যে পরীক্ষানিরীক্ষার সাহস কিছুটা অনুপস্থিত বলেই মনে হয়েছে। যেখানে সময়ের প্রশ্ন জ্বলছে, সেখানে কিছু লেখনী নীরব; যেখানে সমাজের সংকট তীব্র, সেখানে কিছু পৃষ্ঠা অদ্ভুত নির্লিপ্ত।

তবু সব অপূর্ণতার মধ্যেও আমি আশাবাদী। কারণ বইমেলা কেবল প্রাপ্তি বা না-পাওয়ার হিসাব নয়; এটি এক চলমান প্রক্রিয়া। এখানে প্রতিবারই আমরা কিছু পাই, কিছু হারাই, কিছু শিখি। ২০২৬ সালের বইমেলা আমাকে শিখিয়েছে—সাহিত্যকে ভালোবাসতে হলে তার সাফল্যের পাশাপাশি তার সীমাবদ্ধতাকেও স্বীকার করতে হয়।

আমি পেয়েছি অনুপ্রেরণা, পেয়েছি মানুষের মুখ, পেয়েছি নতুন কণ্ঠের সাহসী উচ্চারণ। আর যা পাইনি—তা আমাকে ভাবিয়েছে, প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, পরবর্তী মেলার জন্য প্রত্যাশার নতুন তালিকা তৈরি করতে বাধ্য করেছে।

অতএব, বইমেলা–২০২৬ আমার কাছে এক দ্বৈত অভিজ্ঞতা—আলোক ও আঁধারের সহাবস্থান। প্রাপ্তির দীপশিখা যেমন জ্বলেছে অন্তরে, তেমনি অপূর্ণতার ছায়াও দীর্ঘ হয়েছে প্রান্তরে। কিন্তু এই আলো-আঁধারের দ্বন্দ্বই তো সাহিত্যকে জীবন্ত রাখে, আর আমাদের বারবার টেনে নিয়ে যায় অক্ষরের সেই অনির্বাণ অগ্নিশিখার দিকে।

ঘুরে দেখা বইমেলা ২০২৬ (লেখক- মেঘদূত)

ঘুরে দেখা বইমেলা ২০২৬
লেখক- মেঘদূত

আমি ৩০শে জানুয়ারি অনেক প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের রচনা সম্বলিত তিনটি সংকলন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে কোলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬ এ উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য প্রাপ্ত হয়েছিলাম। সারাদিন ও সন্ধ্যা কাটিয়েছিলাম বইমেলায়।

মনে হচ্ছিল, বইমেলার সুসজ্জিত প্রাঙ্গণটি যেন একটি সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ! নতুন বইয়ের গন্ধে পরিবেশ ম ম করছে। দেশ বিদেশের প্রকাশনীগুলোর স্টলে স্টলে নতুন নতুন পুস্তকের সম্ভার। সাহিত্যিক ও পুস্তক প্রেমীদের ভিড়ে বইমেলার প্রাঙ্গণ ছিল জমজমাট। প্রিয় লেখক কবিদের ঘিরে পাঠক পাঠিকাদের সরাসরি সংলাপ ও অটোগ্রাফ সংগ্রহ, সেলফি তোলার উৎসুকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। 

তবে আজকাল স্মার্ট ফোন ও নেটওয়ার্কের আধুনিক প্রযুক্তির কারনে বই সংগ্রহের প্রবনতা যথেষ্ট কম পরিলক্ষিত হলো।

বই কেনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিনোদন,  খাবারের স্টলগুলোতে কিছুটা সময় কাটালাম, দীর্ঘ ব্যবধানে সহপাঠী, বন্ধুদের সঙ্গে ওই মনোরম পরিবেশে আড্ডায় বইমেলা পরিসর লাগছিল এক উৎসবের কেন্দ্র। বিশেষত সন্ধ্যায় চারদিকে আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে বইমেলা ঠিক যেন এক স্বপ্নপুরীতে রূপান্তরিত হয়েছিল! অবর্ননীয়, অবিস্মরনীয়!

নতুন নতুন বইয়ের রকমারি আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ দেখা,প্রিয় সাহিত্যিকদের খোঁজ করা, ভিড়ের মধ্যেও কিছুটা সময় হঠাৎই খুঁজে পাওয়া মন পছন্দের কোন বইয়ের জগতে কিছুটা সময় ডুবে থাকা, মনকে অপার আনন্দ ও তৃপ্তি দিয়েছিল। স্মরণীয় মুহুর্তগুলো মনে দাগ কেটে স্মৃতির ভাণ্ডারে সঞ্চিত থেকে গেছে।

জ্ঞান পিপাসুদের জন্য বইমেলা সত্যিই এক তীর্থস্থান।

নিঃসন্দেহে বই মেলাকে সাহিত্যিক ও সাহিত্যানুরাগীদের এক কথায় "মিলনমেলা" বলা যায়।

প্রাপ্তি, অপূর্ণতা ও প্রত্যাশা (লেখকঃ তপন বৈদ্য)

প্রাপ্তি, অপূর্ণতা ও প্রত্যাশা।
লেখকঃ তপন বৈদ্য 

বইমেলা কেবল বই কেনার স্থান নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলা—চিন্তা, অনুভূতি ও সৃষ্টির উৎসব। বইমেলা ২০২৬-এ গিয়ে মনে হয়েছে, প্রযুক্তির ঝলমলে যুগেও মানুষ এখনো ছাপার অক্ষরের প্রেমে অটুট। রঙিন স্টল, নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, প্রিয় লেখকের সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে ছিল এক উচ্ছ্বাসময় পরিবেশ।

প্রথমেই পেলাম বৈচিত্র্যময় বইয়ের সমারোহ। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, অনুবাদ—সব ধারাতেই ছিল নতুনত্বের ছাপ। বিশেষ করে তরুণ লেখকদের লেখায় সময়ের বাস্তবতা ও সমাজচেতনা স্পষ্ট হয়েছে। পাঠকদের উৎসাহও ছিল চোখে পড়ার মতো। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ভিড় প্রমাণ করেছে, বই এখনো জ্ঞানের প্রধান আশ্রয়। আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বইমেলাকে করেছে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।

তবে কিছু অপূর্ণতাও চোখে পড়েছে। ছোট প্রকাশনা সংস্থার অনেক ভালো বই প্রচারের অভাবে আড়ালে থেকে গেছে। বইয়ের মূল্য অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ পাঠকের সাধ্যের বাইরে মনে হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য আরও ছাড় বা সহায়তা থাকলে ভালো হতো। এছাড়া ভিড় নিয়ন্ত্রণ, বসার জায়গা ও বিশ্রামের ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, যা একটি বৃহৎ আয়োজন হিসেবে আরও উন্নত হওয়া উচিত।

প্রান্তিক ও গ্রামীণ লেখকদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম থাকলে সাহিত্য আরও সমৃদ্ধ হতো। শিশু-কিশোরদের জন্য সৃজনশীল কর্মশালা বইমেলাকে শিক্ষণীয় করে তুলতে পারত। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ—প্লাস্টিক কমানো ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষা—আরও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। বইমেলা যেন কেবল কয়েক দিনের উৎসব না হয়ে সারা বছরের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার আন্দোলনে পরিণত হয়, সেই প্রত্যাশাও রইল।

সবশেষে বলতে চাই, বইমেলা ২০২৬ আমাকে দিয়েছে আনন্দ, অনুপ্রেরণা ও নতুন ভাবনার দিগন্ত। একই সঙ্গে শিখিয়েছে—উন্নতির সুযোগ সবসময় থাকে। প্রাপ্তি ও অপূর্ণতার এই মিশ্র অভিজ্ঞতাই বইমেলাকে করে তোলে জীবন্ত ও অর্থবহ।

প্রাপ্তির মাঝে (লেখক- রত্না রায়)

প্রাপ্তির মাঝে
লেখক- রত্না রায়

আন্তর্জাতিক বইমেলা মানেই কবি সাহিত্যিকদের আনন্দ নিকেতন । লেখক পাঠক ,প্রকাশকদের ভিড়। কলতানের মহা সমাবেশ উৎসব। 

তবুও ...
বইমেলায় বই প্রাঙ্গণে প্রকাশিত নতুন নতুন বইয়ের মোড়ক উম্মোচন করতে বেশ বেগ পেতে হয় শ্রদ্ধেয় গুণী কবিদের, প্রকাশকদেরও ।
কারণ মঞ্চ অভাব ভীষণ বেগ দেয় সকলকেই।জ্ঞানী গুণীর হাতে বই পাওয়া , নেওয়া সমস্যা হয় ভীষণ।....

নতুন কবিদের হাতে সম্মাননা তুলে দিতে ,কাব্য রত্ন সম্মাননা দিতে খুবই অসুবিধা সহ্য করতে হয়, সকল শ্রদ্ধেয় শ্রদ্ধেয়া গুণী জনদের এবং প্রাপকগণ কেও।

বিশাল জায়গা জুড়ে বই দোকানগুলো সুসজ্জিত থাকে । বিশ্ব জগৎ ভিড়ে  ওই সম্মাননা সম্পূর্ণ আনন্দ   দেয়না কারণ বিপুল সংখ্যক জনগণ বসার আসন পান না চেয়ার অভাবে।এখানেই উপদেষ্টা কমিটির ব্যর্থতা প্রকাশ পায়।

এই ব্যর্থতা বইমেলায় আনন্দ নষ্ট করে।
বইমেলায় সাহিত্যিক গণ নব জাগরণ সৃষ্টি করে নিঃসন্দেহে।তাই অনুষ্ঠান উপভোগ করতে আসেন আবাল বৃদ্ধবণিতা ।

স্বাভাবিক ভাবেই বসার আসন বিন্যাস চায় তাঁরা সকলেই। আসন থাকে দু একটি মঞ্চের আসে পাশে খোলা আকাশের নিচে ।রোদ্দুর ঝলমল করে জ্বালা ধরায়। । আনন্দের ঘাটতি তখনই দেখা যায়,অনুভব করে বিশ্ব বাসী।

ভিড় দেখা যায় ভীষণ বেশি খাওয়ার স্টলগুলিতে ।
সকাল সন্ধ্যা ধুলোবালি ......

মেখে বই মেলায় ঘুরে ক্ষুধার্থ হয়ে যা খুশি খেয়েই খুশি থাকে। তবে বইমেলা প্রাঙ্গণে প্রতিটি খাদ্য চড়া দামে বিক্রি হয় ।ফলে শিশু কিংবা ঘর পরিবার বেশ অসুবিধা ভোগ করেন। দুর্মূল্যের প্রাঙ্গণ দেখে বইঘরে আর মন বসেনা তাঁদের।
দূর দূরান্ত থেকে মানুষ জন  বইমেলায় এসে বিখ্যাত কবিদের বই কেনেন ।

.....বিকিকিনি পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বই বাণিজ্য মেলায় বিভিন্ন রকম আয়োজনের দ্বারা। জীবিকা নির্বাহ করার সুযোগ পান কিছু অভাবী মেধার মানুষজন দেখে ভালোলাগে।

মেলা চত্বরে সমাবেশ নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রচার চোখে পড়বেই।ভালো মন্দের নির্দেশ দেখে সাহিত্যিক গণ লেখার রসদ সরবরাহ করতে পারেন বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় । 

বইমেলায় বই স্টলে ভিড় বেশি হয় নতুন লেখক লেখিকার বই প্রকাশ ,উদ্বোধন ,নিজেদের বই বিক্রির কারণে।কেউ কেউ ভিড়ের চাপে ওই ছোট্ট স্থানে বই দেখার সুযোগও পান না।যা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

........ অনেক গুণীজনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়,শিক্ষার  আলোচনা, সভায় উঠে আসে সাহিত্য জগৎ নিয়ে সমালোচনা,যা ভালো মন্দ জ্ঞান বাড়ায়। উপকৃত হন বিশ্ব বাসী।

....... আন্তর্জাতিক বইমেলা উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট গুণী জনেরা। অত বিশাল জায়গা জুড়ে লোক সমাগম করার আয়োজন করেই ক্ষান্ত থাকেন উপদেষ্টা কমিটি। শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা দেন।কিন্তু জনসাধারণের বসার আসন সংখ্যা এতই নিম্ন মানের এবং অভাব সেটা দেখে কারোই বইমেলায় যেতে ইচ্ছা করবে না।

...... পরিশেষে বলা ভালো যতটা জায়গা জুড়ে বইঘর আছে বা বইমেলার আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় সেই পরিমাণ শৌচালয় নেই বা রাখা হয়না যা সকলকেই ভাবায়। 

তবুও মানুষ বিশেষ করে বই প্রেমীরা বইমেলায় যায় নিজের প্রিয় বই কিনতে ।কারণ বই এমনি এক বিশ্বস্ত বন্ধু যা যান্ত্রিক যুগকেও হার মানায় ।পুরোনো ঐতিহ্য কে খুঁজে পাওয়া যায় বইতেই । যার বিকল্প নেই। 

তবে বইমেলার আয়োজন আরও উন্নত মানের হওয়া উচিত সাধারণ মানুষ জনদের,বই প্রেমীদের কথা ভেবে ।।

শুধু ভালোবাসার জন্য (লেখিকা- সর্বানী দাস)

শুধু ভালোবাসার জন্য 
লেখিকা- সর্বানী দাস 

আমি ঘর ছেড়েছি বহু আগে 
আউল বাউল বলতে পারো,
একটু নীরব ভালোবাসার সিক্ত স্পর্শ চেয়ে
 অবহেলার রাজত্বে নির্বাসন অবশেষে।
আদর মাখা ছোট্ট প্রহর চেয়ে দীর্ঘ পথে হেঁটেছি....
হারানোর ভয়ই পেয়েছি শুধু,
জেতার প্রয়াস ছিল না কোনোদিন।
আর কিছু তো চাইনি, 
না অধিকার, না রাজ্যপাট
শুধু ভালোবাসা চেয়েছি এই কাঙাল বুকে।

রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ও আমার ভারত মাতা (লেখিকা- সর্বানী দাস)

ও আমার ভারত মাতা
লেখিকা- সর্বানী দাস 

দ্বিধাবিভক্ত ভারতভূমির উপর দাঁড়িয়ে,
ভাতের লড়াই করতে করতে 
কঙ্কালসার চেহারাটাই ভারতমায়ের প্রতীক..
যে কৃষক বলদের মতো লাঙ্গল টানছে,
বুভুক্ষুর প্রতিনিধিত্বে সে ব্যারিকেট ভাঙতে চায়।

নটার সাইরেন থেমে গিয়েছে কবে,
তবু ধর্মঘটে বসে থাকতে থাকতে 
শ্রমিকের চোখে জ্বলে মশাল।

কাঁখে-কোলে-পেটে সন্তান নিয়ে জননী জন্মভূমি, 
ইঁটের বোঝা মাথায় গাইছে ভাতের গান।

দুবেলা দু মুঠো ভাত যোগান দিতে ঘর ছেড়েছিল যে শিক্ষিত ছেলে,
ঘরে ফেরার তাড়ায় লাশের পাণ্ডুলিপিতে প্রথমেই তাকে দেখি।
  
হে পূণ্য  জন্মভূমি, 
ও আমার ক্রন্দনরত ভারতমাতা!

তোমার তিরঙ্গা আঁচলে বিদেশী ভাষার কাঁটা,
ভেঙে দিয়েছে মাজা
কেড়ে নিয়েছে খিদে
তবুও তুমি থাকবে চুপ?
গাইবে না ভাতের গান?

জাতির মেরুদন্ড ভেঙে পঙ্গু করতে চেয়েছে খিদের লড়াইকে।

ভাষা নয় খিদে নয় -
বুটের আঘাতে প্রমাণ করে দিয়েছে 
ভাতের লড়াই লড়তে এলে হতে হবে রক্তের তাল।

যে ভাষা প্রশ্ন জাগায়
ভাতের গান গাইতে শেখায় 
সেই ভাষার জিহ্বার হাড় ভেঙে 
কৃষকের অন্ন কেড়েছে,
কেড়েছে গর্ভবতীর খিদে বিশ্রাম,
শ্রমিকের হকের মজুরি -

তবু আমরা বেঁচে আছি!
হতাশার সাগরে  এক পেট খিদে নিয়ে।

হরিবোল প্রেম (লেখিকা- সমর্পিতা রাহা)

হরিবোল প্রেম
লেখিকা- সমর্পিতা রাহা

লাল গোলাপে প্রেম নিবেদন
কাকে করব ভাই, 
ছেলে মেয়ে সংসার নিয়ে
জীবন ভেসে যাই। 

রসিক প্রেমিক নয়কো আমি
দেবো  গোলাপ ফুল, 
আমার বৌয়ের দেখি না যে
খোলা লম্বা চুল। 

ফুলের পাপড়ি ঝরে গেছে
ধর্মে কর্মে মন, 
ভালোবাসা অভ্যাস এখন
চিন্তা প্রতি ক্ষণ। 

গোড়ের মালা পরে বিয়ে
আনন্দের'ই রব, 
যাবার বেলায় বলছ কি গো
এখন আমি শব। 

প্রেম দিবসে একত্রেতে
বাজে করুণ সুর, 
গোলাপ নিয়ে চলি স্বর্গে
যাচ্ছি বহু দূর। 

এসো প্রিয়ে কাছে এসো
প্রেম দিবসের মাস, 
গোলাপ ফুলের ছড়াছড়ি
লাগে কেন ত্রাস।

শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ডিজিট্যাল প্রেম (লেখিকা- সমর্পিতা রাহা)

ডিজিট্যাল প্রেম
লেখিকা- সমর্পিতা রাহা

একাকিত্বে তোমার আমার
ডিজিট্যাল প্রেম হলো, 
কথা হলো দুজনেতে
দেখা করি চলো।

টেলিফোনে যোগাযোগে
হৃদয় মেলে ধরি, 
মেসেঞ্জারে কত কথা
কাটে জীবন ঘড়ি। 

কত কথা গোপন ছিল
লুকিয়েছ তুমি, 
বেলাশেষে কাঁদে দেখো
প্রিয়তমা ভূমি। 

টাকা কড়ি সোনাদানা
চুরি করে নিলো, 
অবশেষে যোগাযোগটা
বন্ধ করে দিলো। 

ঠকবাজ জোচ্চর জানোয়ারের
মিষ্টি মিষ্টি কথা, 
ডিজিট্যাল প্রেম করে দেখি
দিল কত ব্যথা।

আগুন নিয়ে খেলা (লেখিকা- সর্বানী দাস)

আগুন নিয়ে খেলা 
লেখিকা- সর্বানী দাস 

আগুন নিয়ে খেলছে শিশু ডাইনি খিদের জ্বালা,
দড়ির উপর হাঁটলে তবে জুটবে ভাতের থালা।

আগুন নিয়ে মরণ কুয়োয় ঝাঁপ দিল যে নারী,
প্রতিমুহূর্ত পরীক্ষা তার শূণ্য ভাতের হাঁড়ি।

আগুন নিয়ে খেলা যে তার মশাল নিয়ে ভালে,
হাততালি দেয় সার্কাসে লোক জোকার  নাচে তালে।

আগুন নিয়ে খেলা হলো পুড়লো সাধের দেহ,
শুধু চিৎকার কানে এলো কারণ জানে কেহ?

আগুন নিয়ে খেললো চাষি  ঋণের দায়ে ঝুঁকে,
বিপ্লব আজও বেঁচে আছে এই রাজপথের বুকে।

আগুন নিয়ে খেললো যে জন অসি শক্ত করে,
প্রতিবাদের স্লোগান কাঁদে চিতাতে ছাই ওড়ে।
 
দুর্বল মনে আগুন ছুঁলে পুড়তে হবে জেনো,
আগুন জ্বালো বুকের খাঁচায় প্রশ্ন রেখো "কেনো"। 

পিপিলিকা ভয়ে মরে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে,
সত্যের পথে শিবকে রেখো আগুন প্রদীপ নিয়ে।

সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

নদী তরঙ্গে ভাষার গান (লেখিকা- সর্বানী দাস)

নদী তরঙ্গে ভাষার গান 
লেখিকা- সর্বানী দাস 

কুলকুল করে বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী নদী,  হারুণ মাঝি জলে হাত দিলেই, নদী এসে আদর মেখে যেত। হারুণ মাঝির সঙ্গে নদীর অদ্ভুত সখ্যতা।

মাঝি বলতো যে ভাষায় কথা, নদী ও সেই ভাষায় মাঝিকে উত্তর দিত। যখন মাঝনদীর বুকে ঝড় উঠতো, নদী বারংবার আঘাত করে মাঝিকে ফিরে যেতে বলতো তীরে। 

সে ভাষা বোঝা কি আমার-তোমার কম্য...

এইতো কিছু বছর আগে, এক বিশাল ঝড় এলো, ঘরের চাল গেল উড়ে। গাছগুলো দুমড়ে-মুচড়ে কেঁদে উঠলো। রফিক চাচার ধান গাছ গুলো মাটির বুকে নুইয়ে পড়েছিল, এই ঝড় আসার আগেই নাকি হারুণ মাঝি গাঁয়ে বলেছিল, নদী তাকে জানিয়েছে, জলে বিপদের আশঙ্কা আছে।

গাঁয়ের মোড়লসহ সবাই খুব হেসে উঠেছিল। মুখ্যু সুখ্যু মানুষ বড় লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু সে কাউকে বোঝাতে পারেনি, নদী ও কথা বলে, আর সে সত্যি কথা বলছে। 

নদী তাকে নৌকা ভরে ভরে মাছ দিত। যেদিকে মাছ থাকতো সেদিকে নিয়ে যেত। সে একমাত্র হারুণ মাঝিই জানে। নদী তো তার মা। কতবার কত বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। মুষলধারে বৃষ্টিতে হারুণ মাঝির ভয় করেনি। যখন জল ফুলে ফেঁপে ফোঁসফোস করছিল, তখনো হারুন মাঝির মনে বিশ্বাস ছিল, ক্ষতি করবে না তার নদী মা। 

কেউ কোনদিন নদী তরঙ্গের কান্না শোনেনি। কেবলমাত্র হারুণ মাঝি শুনতো, হারুণ মাঝি  জানতো, হারুণ মাঝি বুঝতো। নদীর বুকে যে যন্ত্রণা জমছে, তার জন্য দায়ী তারই মত কিছু অকৃতজ্ঞ মানুষ। 

হারুণের গ্যাঁট ফাঁকা। দাঁড়,পাল আর ছোট্ট ডিঙি ছাড়া, নদী তার একমাত্র সম্বল। বড়লোক শিক্ষিত লোকেরা যত নোংরা আবর্জনা পোঁটলা বেঁধে নদীর বুকে জমা করছে। পলিথিন গুলো না যাচ্ছে মাটিতে মিশে, না হচ্ছে নষ্ট। নদী মায়ের বুকে বড় কষ্ট। ক্রমশু তার গভীরতা কমছে। 

একবার নাকি নদী মা হারুণ মাঝি কে বলেছিল, মাছেরা তার কাছে এসে ভীষণ কান্নাকাটি শুরু করেছে। পলিথিনের প্যাকেটের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। ভাসতে ভাসতে তাদের সন্তানরা পথ হারাচ্ছে। এসব দুঃখের কথা হারুণ মাঝি জানে। 

সে গাঁয়ের মোড়ল কে বলেও ছিল, নদী তার কাছে কান্না করেছে। মোড়ল সভায় সবার সামনে ভীষণ ধমক দিয়ে বলেছিল...

"প্রতিবাদ হচ্ছে, জিহ্বার হাড় ভেঙে দেবো" 

"বড্ড ভাষা ফুটেছে মুখে"

নদীর ভাষা হারুণ মাঝি বুঝলেও মানুষ বুঝবে কবে ?

গুণাবলী (লেখিকা- সমর্পিতা রাহা)

গুণাবলী
লেখিকা- সমর্পিতা রাহা

ক্রোধ প্রতিশোধ খারাপ কিন্তু
  মনকে নষ্ট করে, 
হাস্যমুখে স্বীকার করা
  চলবে তুমি বরে। 

কথায় কথায় খুনসুটি টা
  সেটা বলি ভালো, 
প্র তিহিংসা ত্যক্ত করে
আলোর দীপক জ্বালো। 

গল্প গুজব করা ভালো
  নিজের ওজন বুঝে, 
বোবার কোনো শত্রু আছে
 পাবে কোথাও খুঁজে। 

ভাঙা গড়ার খেলা চলে
গড়তে কজন পারে, 
ভাঙার দলে সংখ্যা বেশি
ধ্বংস করেই ছাড়ে।

জনপ্রিয় পোস্ট